আমি মোহাম্মদ জসীম উদ্দীন। ১৯৫৪সালে ২১জানুয়ারী ফৌজদার হাটের ঐতিহ্যবাহী পীর বাড়ীতে জন্ম গ্রহন করি। আমার পিতার নাম সূলতান আহাং, এবং মাতার নাম নূর জাহান বেগম। আমার শিক্ষাজীবনের শুরু ফৌজদার হাট প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে। তারপর ১৯৭২ সালে ফৌজদার হাট কে এম হাই স্কুল থেকে এস এস সি পাশ করি। ১৯৭৫ সালে চট্টগ্রাম সিটি কলেজ থেকে এইচ এস সি পাশ করে একিই কলেজ থেকে ১৯৭৮ সালে স্নাতক ডিগ্রী , ১৯৮২ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্র বিজ্ঞানের উপর স্নাতকোত্তর ডিগ্রী লাভ করি।
Pages
বুধবার, ৩১ আগস্ট, ২০২২
শনিবার, ২৭ আগস্ট, ২০২২
১০ পর্ব পাকিস্থান থেকে বাংলাদেশ “চোখে দেখা রাজনীতি”র ১০ম পর্বে আছে জিয়া ক্ষমতায় এসে মোস্তাকের ধারাবাহিকতা বজায় রাখেন
জিয়ার শাসন :-বাংলা দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে জিয়া একটি বহুল আলোচিত এবং সমালোচিত নাম। ১৯৭৫ সালে অভ্যুত্থান পাল্টা অভ্যূত্থানে মেঃ জেঃ খালেদ মোশাররফের হত্যার মধ্য দিয়ে তার উত্থান ঘটে এবং রাজনীতির কেন্দ্র বিন্দুতে চলে আসেন।
"জিয়া ক্ষমতায় এসে মোশতাকের ধারাবাহিতা অক্ষুন্ন রেখে স্বাধীনতার চেতনায় বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে তিরিশ লক্ষ শহীদের প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত রাষ্টীয় চার মূলনীতিতে কুঠারাঘাত করেন।
ক্ষমতা দখল করার পর প্রথমে আঘাত করেন রাষ্ট্রিয় মূলনীতির প্রথম স্তম্ভ গনতন্ত্রকে। সামরিক শাসনের পর জিয়া যে তথাকথিত বহুদলীয় গণতন্ত্রে ফিরে এসেছেন বলে দাবী করা হয় তা ছিল সত্যিকার অর্থে একজন স্বৈরশাসকের শাসন। কারন নির্বাচনের পর যে সংসদ গঠিত হয়েছিল তা ছিল রাবারষ্টাম্পরূপী অকার্যকর সংসদ। এ সংসদ ছিল ফৌজি শাসকের মর্জির উপর নির্ভরশীল। সংসদের কার্যকরী কোন ক্ষমতা ছিল না। পার্লামেন্ট কোন আইন পাশ করলে তিনি তা মেনে নিতে বাধ্য ছিলেন না। যে কোন আইনে তার ভেটো দেয়ার ক্ষমতা ছিল। সেই ভেটোর বিরুদ্ধে নতুন আইন প্রনয়ন করলে তাও মানতে বাধ্য নন তিনি। তাকে এই আইন মানাতে হলে দিতে হবে গণভোট, গণভোটে জনগণ সে আইনের পক্ষে রায় দিলেই তবে তিনি মেনে নেবেন সেই আইন। তাছাড়া তিনি বিধান রাখলেন মন্ত্রী সভার একতৃত্বীয়াংশ তিনি তার ইচ্ছানুযায়ী নিয়োগ দিতে পারবেন। তার নিয়োগকৃত মন্ত্রীদের সংসদ সদস্য হবার কোন প্রয়োজন হবে না। জাতীয় স্বার্থে তিনি সংসদকে না জানিয়ে যে কোন চুক্তি সই করতে পারবেন, পারবেন ইচ্ছামত জাতিয় সংসদ ডাকতে, স্থগিত করতে, এমনকি বাতিলও করতে। এভাবে তিনি জাতীয় সংসদকে ক্ষমতাহীন বিতর্ক সভায় পরিনত করে ক্ষান্ত হলেন তা নয়, এরপরও তিনি নিজের হাতে রেখে দিলেন অনেকগুলো মন্ত্রনালয়।"(সহায়ক সূত্র-এন্টনিঃ বাংলাদেশ, এ লিগেসি অব ব্লাড) (মুক্তিযুদ্ধ ও তারপর,গোলাম মুরশীদ)(ডিক্টেটর মেজর জিয়া,৭১থেকে ৮১ knowledge )
যেহেতু জিয়ার ক্ষমতার উৎস ছিল কেন্টনমেন্ট, সেহেতু সেনাবাহিনীকে ঢেলে সাজিয়ে পাঁচটি ডিভিসনে ভাগ করেছিলেন। যে বার দফাকে কেন্দ্র করে কর্ণেল তাহের ফাঁসীর আসামী হন সে বার দফার কিছু পুরন করে তিনি নীচু তলার সৈন্যদের সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করেন। ফলে উন্নয়ন বাজেট কাটছাট করে প্রতিরক্ষা বাজেট প্রায় দ্বিগুন করা করতে হয় তাকে।
জিয়ার দ্বিতীয় হস্তক্ষেপ আসে রাষ্ট্রীয় চার মূল নীতির দ্বিতীয় স্তম্ভ ধর্মনিরপেক্ষতার উপর। মুক্তিযুদ্ধা জিয়া জানতেন মুক্তিযুদ্ধে মুসলমান অমুসলমান সবাই নির্বিশেষে অংশ গ্রহন করেছিল। হিন্দু সম্প্রদায় যে রূপ অত্যাচারিত হয়েছিল তা ছিল অবর্ননীয়। মুক্তিযুদ্ধে যে গণহত্যা ও অত্যাচার হয়েছিল তাতে হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনের ছিল বেশী ক্ষতিগ্রস্ত। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তারাও সম মর্যাদায় ধর্ম কর্ম সহ সকল বিষয়ে তাদের সম মর্যাদা ভোগ করার অধিকার ছিল। বঙ্গবন্ধু রাষ্ট্রকে ধর্ম নিরপেক্ষ করে সে লক্ষে অগ্রসরও হয়েছিলেন। জিয়া কলমের এক খোঁছায় সংবিধানের রাষ্ট্রীয় মূল নীতি ধর্মনিরপেক্ষতাকে বিষর্জন দিয়ে, সংবিধানে 'আল্লার উপর পূর্ণ বিশ্বাস রেখে' স্থাপন করে একটি ধর্মের প্রতি বিশেষ প্রাধান্য দিয়েছেন। যা সাংবিধানের মূলনীতির প্রতি বিরুদ্ধাচারন। এতে অন্য ধর্মীয় সম্প্রদায়ের লোকজন দ্বিতীয় শ্রেনীর নাগরিকে পরিনত হয়ে যায়। তিনি জানতেন সংবিধানে বিছমিল্লাহ লিখলে ধর্ম কায়েম হয়ে যাবেনা। তবে এটা লিখে সাধারণ মানুষকে ধোঁকা দিয়ে জনপ্রিয় হওয়া যাবে। সত্যিকারের ধর্ম মানুষের প্রদর্শনের বিষয় নয়, ধর্ম টিকে থাকে কর্মে। ধর্মের প্রতি নিষ্টাবান হলে জিয়ার আমলে বঙ্গবন্ধু কতৃক নিষিদ্ধ ইসলাম বিরুধী ঘোড় দৌড় প্রতিযোগিতা, রাষ্ট্রীয়ভাবে মদের লাইসেন্স প্রদান যা বঙ্গবন্ধু নিষিদ্ধ করেছিলেন তা তিনি কোন দিনই পুনঃ প্রবর্তন করতেন না।
তারপর জিয়া হাত দেন জাতীয়তাবাদে। তিনি বাঙ্গালীকে বাংলাদেশীতে পরিনত করে ধংষ করেন সংবিধানের তৃতীয় স্তম্ভ জাতীয়তাবাদকে। বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল। এ জাতীয়তাবাদ বাঙ্গালীর বাংলা ভাষা ভিত্তিক। জিয়াউর রহমান সাপ্তাহিক বিচিত্রা পত্রিকায় লিখেছিলেন, 'পাকিস্থান সৃষ্টির পর পরই ঐতিহাসিক ঢাকা নগরীতে মিঃ জিন্নাহ নিজেই ঘোষনা করেছিলেন, উর্দূ, একমাত্র উর্দূই হবে পাকিস্থানের রাষ্ট্রভাষা। আমার মতে ঠিক সেদিনই বাঙালীর হৃদয়ে অংকুরিত হয়েছিল বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদ,জন্ম হয়েছিল বাঙালী জাতির।' এ বিশ্বাস লালন করে আসা সেই জিয়াউর রহমান সতের মাস পরে ক্ষমতা লাভ করে তার লালিত বিশ্বাসকে হত্যা করে প্রবর্তন করেন বাংলাদশী জাতীয়তাবাদ। এতে জাতি সুসংহত না হয়ে বিভক্ত হয়ে পড়ে। জিয়ার প্রধানমন্ত্রী পাকিস্তানী দালাল শাহ আজিজুর রহমান বাংলা ভাষাকে বাংলাদশী ভাষা বলে উল্লেখ করেন। শুধু তাই নয় মুক্তি যুদ্ধা জিয়া ১৯৭৮ সালের ডিসেম্বর মাসে বাংলাদেশের পতাকা পরিবর্তন করে লাল বৃত্তের জায়গায় কমলা বৃত্তের প্রবর্তন করতে চেয়েছিলেন। বাংলাদেশ টিভির এক অনুষ্টানে তা প্রচারও করাও হয়। পরে প্রতিবাদের মুখে শাহ আজিজের বাংলাদেশী ভাষা আর জিয়ার কমলা রং বর্জিত হয়। স্বাধীনতা বিরুধীদের চাপে মুক্তিযুদ্ধা জিয়া 'হিন্দুর রচিত গান' ধূয়া তুলে জাতীয় সঙ্গীতও পরিবর্তন করতে চেয়েছিলেন। তিনি ১৬ই ডিসেম্বরকে স্বাধীনতা দিবস ২৬শে মার্চকে জাতীয় দিবস হিসাবে পালনের চেষ্টাও করেছিলেন। (সহায়ক সূত্র- ডিক্টেটর জিয়া৭১-৮১,knowledge )
'তারপর আসা যাক রাষ্ট্রের চার মূল স্তম্ভের সর্বশেষ স্তম্ভের দিকে। বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রীরা তাদের ঘাড়ে পিঠে চড়িয়ে তাকে ক্ষমতায় বাসলেও সমাজতন্ত্রের দিকে তিনি এক পাও নড়েন নি। বরং তাদের কাউকে ফাঁসী, কাউকে দেন দীর্ঘমেয়াদী কারাদন্ড । আর বঙ্গবন্ধু আমলে জাতীয়করণকৃত অনেক ব্যঙ্ক বীমা ও শিল্প প্রতিষ্টানকে বিরাষ্টিকরন করে সংবিধানের শেষ স্তম্ভটিও ধংষ করে দেন তিনি। '(সূত্র-ডিক্টেটর জিয়া ৭১-৮১)
এবার আসি প্রান্তের কাছে, প্রান্ত অনেক বৈরী পরিবেশ অতিক্রম করে ঢাকা বিশ্বালয় থেকে সর্বোচ্ছ ডিগ্রী গ্রহন করেন। এরপর অনেক ইন্টারভিউ, অনেক পরীক্ষা দেওয়ার পর অবশেষে একটা বেসরকারী কলেজে প্রভাষক হিসাবে যোগদান করেন। সেখানও তিনি মুক্তিযুদ্ধার পরিচয় গোপন রেখেছেন পাছে আবার কোন ঝামেলায় পড়ে। যেখানে একজন মুক্তিযুদ্ধা রাষ্টীয় ক্ষমতায়, সেখানে মুক্তিযুদ্ধারা রাষ্ট্রীয় পৃষ্টপোষকতা পাওয়াটা ছিল প্রত্যাশিত বিষয়। কিন্তু প্রান্তরা দেখতে লাগল উল্টো চিত্র। গ্রামে গঞ্জে অনেক মুক্তি যুদ্ধা অভাব অনটনে মানবেতর জীবন যাপন করছে ক্ষিধের জ্বালায় আত্মহত্ম্যা করছে। অন্যদিকে পুরানো মুসলিম লীগার, জামাত, এন ডি পি সহ ডান পন্তী স্বাধীনতা বিরুধী শক্তি সমূহ জিয়া সৃষ্ট বি এন পি নামক নতুন রাজনৈতিক দলে ভিড়ে স্বাধীনতার স্বপক্ষ শক্তিকে একেবারে কোণঠাসা করে ফেলেছে। ব্যবসা বানিজ্য, ব্যঙ্ক বীমাসহ বিভিন্ন বিভিন্ন প্রতিষ্টানের মালিক হয়ে শৈন্য শৈন উন্নতি করতে লাগল তারা।
দেশের স্বাধারণ মানুষ এত রাজনীতি বুঝেনা, গনতন্ত্র সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, জাতীয়তাবাদ বুঝে না তারা যখন দেখল মুক্তিযুদ্ধা জিয়া সংবিধানে বিসমিল্লাহ সংযোজন করেছে, জিন্দাবাদ উচ্ছারন করছে, তারা স্বস্তি পেল এই ভেবে যে অন্তঃত ইসলাম ধর্ম প্রতিষ্টিত হয়েছে।
জিয়ার রাজাকার পুনর্বাসন :-
যদিও জিয়াউর রহমান মুক্তিযুদ্ধা ছিলেন স্বাধীনতা বিরুধীদের রাজনীতিতে পুনর্বাসনের কাজটি সূচারুভাবে করেন জিয়া উর রহমান। তার ধূর্ত রাজনৈতিক দূর্বৃত্যায়নের জন্য তাকে রাজনীতি বিজ্ঞানের ভাষায় বাংলাদেশের মেকিয়াভেলী রাজনীিতর জনক বললে যথাযথ বলা হবে। তিনি মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শক্তি, মুক্তযুদ্ধও স্বাধীনতা বিরুধী শক্তি, পাকিস্থান পন্তী, ভারত বিরুধী, বঙ্গবন্ধু বিদ্বেষী ও আদর্শচ্যূত চাটুকারদের নিয়ে বি এন পি নামক দলটি গঠন করেন। যে দালালরা ৭১ এ তার সহযুদ্ধা মুক্তিযুদ্ধাদের হত্যা করেছিল তিনি তার সেই মুক্তিযুদ্ধাদের রক্তের সাথে বেইমানী করে ১৯৭৫ সালে ৩১শে ডিসেম্বর (প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক এবং পরবর্তীতে রাষ্ট্রপতি হয়ে) দালাল আইন ১৯৭২ বাতিল করেন। ফলে যুদ্ধাপরাধের বিচারের জন্য গঠিত সারাদেশের ৬৩টি ট্রাইবুন্যাল বিলুপ্ত হয়ে যায়। দালাল আইন বাতিলের ফলে ট্রাইবুন্যালে বিচারাধীন সকল মামলা বাতিল হয়ে যায়। এ সকল মামলায় বিচারাধীন প্রায় ১১ হাজার অভিয়ুক্ত দালাল রাজাকার আল বদর আল সমস মুক্তি পেয়ে যায়। এর মধ্যে ২০ মৃত্যুদন্ড প্রাপ্ত, ৬২ জন জাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত সহ বিভিন্ন মেয়াদে সাজা প্রাপ্ত ৭৫২ জন যুদ্ধাপরাধী মুক্তি পেয়ে বীর দর্পে বেরিয়ে আসে। আর মুক্তিযুদ্ধা এবং স্বাধীনতার স্বপক্ষ শক্তি কারান্তরীণ হতে থাকে। এসব বেরিয়ে আসা যুদ্ধাপরাধীদের মুক্তিযুদ্ধা জিয়া তার আমলে কাউকে মন্ত্রী কাউকে প্রধান মন্ত্রী বানিয়ে তাদের গাড়ীতে তিরিশ লক্ষ শহীদের রক্তে অর্জিত জাতীয় পতাকা তুলে দিয়েছেন, জাতীয় স্মৃতি সৌধে ফুল দেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছেন।
জিয়ার মন্ত্রী সভায় ছয়জন রাজাকারকে ঠাঁয় দিয়েছিলেন, তারা হলেন,
১) শাহ আজিজুর রহমান, তিনি একাত্তর সালে পাকিস্তানের পক্ষে জাতি সংঘে গিয়ে বলেছিলেন- "পাকিস্তানী সৈন্যরা পূর্ব পাকিস্থানে গিয়ে হামলা চালিয়ে অন্যায় কিছু করেনি। স্বাধীনতার নামে সেখানে যা চলছে সেটা হচ্ছে ভারতের মদদ পুষ্ট বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন। বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্রের উচিৎ সেটাকে পাকিস্থানের ঘরোয়া ব্যপার হিসাবে গ্রহন করা।" আর এ কুলাঙ্গারকে মুক্তিযূদ্ধা জিয়া করেছিলেন প্রধান মন্ত্রী।
২)মশিয়ুর রহমান ছিলেন পাক সরকারের ঠিকাদার।প্রথমে মুক্তি যুদ্ধে যান, আবার ফিরে এসে পাকিস্তানীদের কাছে আত্মসমর্পণ করেন।
৩) সামশুল হুদা ছিলেন পাকিস্তান বেতারের একজন প্রযোজক। সে সময় তিনি পাক বেতার থেকে মুক্তি যুদ্ধের বিরুধীতা করে বিভিন্ন অনুষ্টান প্রচার করতেন।
৪)মীর্জা গোলাম হাফিজ, তিনি পাকিস্থান চীন মৈত্রী সমিতির সভাপতি। তিনি বুদ্ধিজীবিদের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধ বিরুধী প্রচারনা চালাতেন। তিনি এক বিবৃতিতে বলেছিলেন "এ তথাকথিত মুক্তিযুদ্ধ আসলে একটি ভারতীয় ষড়যন্ত্র।"
৫)অাব্দুল আলিম মুসলীম লীগের নেতা হিসাবে ৭১ সালে জয়দেবপুর হাটে রাজাকার বাহিনীকে নিয়ে ব্যাপক নিধন যজ্ঞ চালান, উল্লেখ্য মানবতা বিরুধী অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এ অপরাধের জন্য তাকে ৮৩বৎসর বয়সে আমৃত্যু কারাদন্ড দিয়েছে। (bdnews24.com,date-09/10/13)
৬) মওলানা মান্নান, ১৯৭১ সালে তিনি শান্তি কমিটির একজন অন্যতম নেতা ছিলেন।, তিনি ৭১সালের ২৭শে এপ্রিল সংবাদ পত্রে এক বিবৃতিতে বলেছেন, পূর্ব পাকিস্থানের দেশ প্রেমিক জনগণ শসস্ত্র বিদ্রোহীদের উপড়ে ফেলতে ধর্মীয় চেতনা নিয়ে সামনে এগিয়ে এসেছে। জনগনের সক্রিয় সহযোগিতা নিয়ে দেশ প্রেমিক সেনা বাহিনী দেশের সমস্ত এলাকার নিয়ন্ত্রন গ্রহন করেছে। (killers and colobraters of 1971' An account of therewhereabout.page-77)এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, স্বাধীনতার পর শাহ আজিজুর রহমান, আব্দুল আলিম, মুশিয়ুর রহমানকে দালাল আইনে জেলে পাঠানো হয়েছিল।
মুক্তিযূদ্ধা জিয়া যখন সারা দেশে রাজাকারদের পৃষ্টপোষকতা করছেন জিয়ার আস্কারা পেয়ে বিদেশে পালিয়ে যাওয়া রাজাকাররাও দেশে ফিরে আসতে শুরু করল, ১৯৭৮ সালে ১১ই জুলাই তথাকথিত পূর্ব পাকিস্থান পুনরুদ্ধার আন্দোলনের নেতা রাজাকার শিরোমনি গোলাম আজম (পূর্ব পাকিস্থান পূনরুদ্ধার কমিটির নেতা)তার সে পূর্ব পাকিস্থান পুনরুদ্ধার আন্োলন বাতিল না করার পরও তিন মাসের ভিসা দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয় । তিন মাসের ভিসার মেয়াদ শেষ হলে তিনি বাংলাদেশ তো ত্যাগ করেননি বরং সরকারের আশ্রয় প্রশ্রয় পেয়ে তিনি ভিতরে ভিতরে জামাত পুর্নগঠন কাজ চালিয়ে যেতে থাকেন। এক সময় জামাত তাকে আমির হিসাবে ঘোষনা দেয়। {( সহায়ক সূত্র -আমার ব্লগ, জিয়াউর রহমান,দালাল আইন (বিশেষ ট্রাইব্যুনাল) যুদ্ধাপরাধের বিচার, রাজাকার পুর্নবাসন।)}
১৯৯১ এর ২৯শে ডিসেম্বর জামাতে ইসলামী পকিস্থানী নাগরিক মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম প্রধান যুদ্ধাপরাধী গোলাম আজমকে জামাতের আমীর ঘোষনা করলে সারা দেশে এর তীব্র বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। এর ধারাবাহিতায় ১৯৯২ সালে ১০১ সদস্য বিশিষ্ট একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি গঠন করা হয়। শহীদ জননী জাহানারা ইমাম এর আহ্বায়ক নির্বাচিত হন।
১৯৯২ সালের ২৬শে মার্চ তৎকালীন বিএনপি সরকারের শত বাঁধা অতিক্রম করে তাঁর নেতৃত্বে ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জাহানারা ইমামকে চ্যেয়ারম্যান করে ১২ সদস্যের গনআদালত গঠন করা হয়। সেখানে যুদ্ধাপরাধী গোলামকে ১৩টি অপরাধের জন্য প্রতীকী বিচার সম্পন্ন করে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়। এই রায় বাস্তবায়নের জন্য তিনি সরকারের নিকট আহ্বান জানান। কিন্তু সরকার উল্টো এই গণআাদালতে সাথে জড়িত জাহানারা ইমাম সহ ২৪জন বিশিষ্ট নাগরিকের বিরুদ্ধে রাষ্ট্টদ্রোহিতার অজামিনযোগ্য মামলা দায়ের করেন। পরে হাই কোর্ট তাদের জামিন মঞ্জুর করেন। ১৯৯২ সালে জাহানারা ইমাম লাখো জনতার পদযাত্রার মাধ্যমে তৎকালীন প্রধান মন্ত্রী, বিরুধী দলীয় নেত্রী এবং স্পিকরের নিকট স্বারক লিপি পেশ করেন। দেশ বিদেশে তার আন্দোলন ব্যাপক সমর্থন পায়। তার এ আন্দোলন ইউরোপীয় পর্লামেন্ট ৭১ র যুদ্ধাপরাধের বিচারকে ব্যাপক সমর্থন দেয়। (সূত্র-জাহানার ইমাম দেশ যাকে মা বলে ডাকে, মীর মাসরুর জামান,৪ঠা মে২০১৭, চেনেল আই, অন লাইন,২৭শে নভেম্বর ২০১৭)
৯ম পর্বে পাকিস্থান থেকে বাংলাদেশ “চোখে দেখা রাজনীতি”র ৯ম পর্বে আছে জিয়ার রাজনীতিতে পদার্পন
তারপর শুরু হয় জিয়ার রাজনীতিতে পদার্পন। প্রথমে তিনি দুই জন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এবং একজন অধ্যাপককে তার উপদেষ্টা পদে নিয়োগ দেন, এরপর রাজনীতিবিদদের সাথে যোগাযোগ শুরু করেন। তাদের মধ্যে প্রথম ছিলেন ভাসানী ন্যাপের মুশিউর রহমান যাদুমিয়া। '
'জিয়া রাজনৈতিক দল গঠনের আগে সমমনাদের নিয়ে একটি রাজনৈতিক ফ্রন্ট গঠনের চিন্তা করেন। যাতে ক্ষমতাচ্যূত রাজনৈতিকদল আওয়ামীলীগের বিপরীতে একটি বড়সড় রাজনৈতিক মঞ্চ তৈরী করা যায়। এরপর তিনি দেখলেন জোটের মধ্যে তার নিজস্ব রাজনৈতিক দল না থাকলে জোটকে নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হবেনা। সে লক্ষে তিনি নিজেকে নেপথ্যে রেখে গঠন করলেন জাগদল। জাগদল রাজনীতিতে তেমন ঢেউ তুলতে পারেনি। পরে জিয়া ১৯৭৮ সালে নিজেকে নিজে পদোন্নতি দিয়ে লেঃ জেনারেল বনে গেলেন। ১৯৭৮ সালে ১লা মে সেনাবাহিনীর প্রধান থাকা অবস্থায় জেঃ জিয়া নিজেকে আহ্বায়ক করে জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট ঘোষনা করেন। সেনাবাহিনীর উর্দীপরা অবস্থায় জিয়া পুরাদস্তুর রাজনীতিবিদ বনে গেলেন।' যদিও তিনি বলে ছিলেন " I will make politics difficult for politician. জিয়া নানা বিধি নিষেধের জালে পলিটিক্সকে অনেক পলিটিশিয়ানের জন্য ডিফিক্যাল্ট করলেও তিনি
রাজনীতিতে নিজের উত্তোরন ঘটান সহজেই।
গবেষক মহিউদ্দিন আহাম্মদ তাঁর বইতে বি এন পি নামক দলটির সম্পর্কে লিখেছেন এভাবে, -" বি এন পি এমন একটি দল যার জন্ম স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় হয়নি। এ অঞ্চলের সব দলের জন্ম হয়েছে ক্ষমতার বৃত্তের বাইরে। রাজপথে বা আলোচনার টেবিলে। বি এন পি সেদিক থেকে ব্যতিক্রম। বি এন পি দলটি তৈরী হলো ক্ষমতার শীর্ষে থাকা একজন অরাজনৈতিক ব্যক্তি দ্বারা। "
জিয়া হলেন সমর নায়ক থেকে সদ্যাগত রাজনীতিবিদ, রাজনীতিবিদদের তৃণমূল পর্যন্ত সম্পর্ক রাখতে হয়। মাঠে ঘাঠে পথে বক্তৃতা দিয়ে বেড়াতে হয়, জিয়া ছিলেন সে ব্যপারে একেবার আনকোরা, রাজনীতিতে পারঙ্গম হতে হলে তাকে জনগনের কাছে যতে হবে জনগনের সাথে মিশে যেতে হবে।
লেখক গবেষক মহিউদ্দীন আহমেদ 'মশিউর রহমান যাদু মিয়া'র ভাই মুখলেসুর রহমানের একটি সাক্ষাতকারের উদ্ধৃতি দিয়ে লিখেছেন, -"জিয়া বাংলা লিখতে পড়তে জানতেননা, প্রথমে তিনি বাংলায় যে বক্তৃতা দিতেন তা উর্দূতে লিখতেন। সেটি দেখে বক্তৃতা দিতেন। তিনি বক্তৃতাই দিতে জানতেন না, দিতে গেলে খালি হাত পা ছুঁড়তেন।"
মুখলেসুর রহমানের সাক্ষাৎকারের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি আরও লিখেন, ''এ রকম দেখে টেকে যাদু মিয়া আমাকে একদিন বললেন এরকম হলে আমি কিভাবে তাকে চালিয়ে নেব? আমি বললাম জিয়া বক্তিতা দিতে পারেনা ঠিক আছে, তিনি সবচেয়ে ভাল কি করতে পারেন সেটা খুঁজে বের করো। জবাবে যাদু বললেন তিনি হাঁটতে পারেন এক নাগারে ২০ থেকে ৩০ মাইল পর্যন্ত। আমি বললাম এইতো পাওয়া গেল ভাল একটা উপায়। তুমি তাকে নিয়ে পাড়া গাঁয়ে হাঁটাও, গাঁও গেরামের রাস্তা দিয়ে যাবে আর মানুষকে জিজ্ঞেস করবে কেমন আছেন? প্রেসিডেন্ট দেশের মিলিটারী লিডার, তিনি গ্রামের আনাচ কানাচ দিয়ে ঘোরাঘুরি করছেন আর লোকজনের ভাল মন্দের খুঁজ খবর করছেন তাতেই তিনি জনপ্রিয় হয়ে উঠবেন।"
'মুখলেছুর রহমানের ভাষ্য মতে 'এভাবে দেখতে দেখতে জিয়া উর রহমান বক্তৃতা দেওয়াটাও রপ্ত করে ফেললেন। আর যেখানে কোনদিন ইউনিয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান যাননি সেখানে খোদ দেশের প্রসিডেন্ট যাচ্ছেন, সেটা সাধারন মানুষের নিকট এক বিশাল ব্যপার, এভাবে জিয়াকে তারা সাধারন মানুষের কাছে জনপ্রিয় করে তুলেন।''
হাঁ না ভোটে প্রেসিডেন্ট হওয়ার আরো এক বৎসর পর প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী (সেনা বাহিনীর সর্বাধিনায়ক) থাকা অবস্থায় তিনি নিজের অবস্থান সংহত ও সুনিশ্চিত করার জন্য নিজ কতৃক পুনর্বাহাল করা শেখ মুজিবের চতুর্থ সংশোধনীর অধীনে ১৯৭৮ সালে ৩রা জুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করেন। সে নির্বাচনে তিনি ৭৬.৩৩%ভোট পেয়ে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। যেখানে জেঃ ওসমানী সহ দশজন প্রার্থী ছিলেন। (এখানে উল্লেখ্য যে, তিনি যেহেতু প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী ছিলেন, তার নির্বাচনে অংশগ্রহন ছিল সম্পূর্ণ অবৈধ, আর এই অবৈধ কাজটিকে বৈধ করার জন্য আর একটি অবৈধ ও অনৈতিক কাজ করে করে বসেন তাহল ১৯৭৯সালে ২৮এপ্রিল back date দিয়ে ১৯৭৮ সালের ২৯শে এপ্রিল থেকে নিজেকে অবসর দেখিয়ে একটি অধ্যাদেশ জারী করেন।) (মুক্তিযুদ্ধ ও তারপর, গোলাম মুরশীদ) ১৯৭৯ সালে তিনি রাষ্ট্রপতি থাকা অবস্থায় ২য় সংসদ নির্বাচন আয়োজন করেন। এ নির্বাচনে তাঁর নব গঠিত বি এন পি ২৯৮টি আসনের মধ্যে ২০৭টি আসনে জয় লাভ করে। নির্বাচনে অংশ নিয়ে আব্দুল মালেকের নেতৃত্বে আওয়ামীলীগ ৩৯টি আসনে, মিজানুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামীলীগ ২টি আসনে জয় লাভ করে। এছাড়া জাতীয় সমাজ তান্ত্রিক দল ৮টি, ন্যশনাল আওয়ামী পার্টি ১টি, মুসলীম ডেমক্রেটিক লীগ ২০টি আসনে জয়লাভ করে। এ মুসলিম ডেমক্রেটিভ লীগ মানে সদ্য গঠিত জামাতসহ রাজাকার আর স্বাধীনতা বিরুধীরদের সংগঠন।
১৯৭৬ সালের কর্নেল তাহেরকে ফাঁসীতে ঝুলিয়ে হত্যার দু সাপ্তাহ পর জুলায়ের শেষে আগষ্টের প্রথম সাপ্তাহে রাজনৈতিক দলবিধি জারী করে রাজনৈতিক তৎপরতা চালু করেন জিয়া। মোট ৫৭টি দল আবেদন করে, আওয়ামীলীগও ৩রা সেপ্টেম্বর ১৯৭৬ সালে সরকারী অনুমোদনের জন্য আবেদন করে, সামরিক সরকার আওয়ামীলীগকে ঠেকানোর জন্য রাজনৈতিক দলবিধি সংশোধন করে ১০নং উপধারা জারী করে বলা হয় যে, "কোন জীবিত বা মৃত ব্যক্তির প্রতি শ্রদ্ধাবোধ সৃষ্টি বা পরিকল্পিত হয় বা উৎসাহিত করিবার সম্ভাবনা থাকে এমন কোন শব্দ ব্যবহার করলে ঐ রাজনৈতিক দল অনুমোদের যোগ্য হবে না।" এটা করা হয়েছিল মূলতঃ বঙ্গবন্ধু শব্দটি বাদ দিতে। পরে আওয়ামীলীগ তাদের ঘোষনা পত্র থেকে বঙ্গবন্ধু শব্দটি বাদ দিয়ে আবার আবেদন করলে ৪ঠা নভেম্বর ১৯৭৬ সালে অনুমোদন পায়। এভাবে রাজনৈতিক দল বিধির অধীনে ২৩টি দলকে রাজনীতি করার অনুমোদন দেয় জিয়ার সামরিক সরকার।
এর প্রায় দুই বৎসর পর ১৯৭৮ সালের পহেলা মে রাজনৈতিক দলবিধি উঠিয়ে দিয়ে সবাইকে রাজনীতি করার সুযোগ দেন জিয়া। এখানে লক্ষনীয় ব্যপার হলো যেখানে বঙ্গবন্ধু বাকশাল করে রাজনীতি করার সুযোগ সীমিত রাখতে পেরেছিলেন নয় মাস, (২৫শে জানুয়ারী ১৯৭৫- ১৫আগষ্ট ১৯৭৫)আর জিয়া রেখেছিলেন প্রায় আড়ায় বৎসর। (৮ই নভেম্বর,১৯৭৫-১মে১৯৭৮)
এবার আসি প্রান্তের কাছে, ৩রা ও ৭ই নভেম্বর খালেদ মোশাররফ জিয়াউর রহমানের ক্ষমতা দখলের পালাবাদলের সময়েও কয়মাস দেশের অস্তির রাজনৈতিক পরিস্তিতির জন্য প্রান্ত গ্রামে অবস্থান করছিল। মাঝে মাঝে গোপনে ঢাকায় গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘুরে আসত তবে হলে অবস্থাব করত না, কারন তখনো আওয়ামী পন্তী ছাত্র তথা স্বাধীনতার পক্ষের শক্তির প্রতি জিয়ার সামরিক সরকার ছিল খড়ক হস্ত।
প্রান্ত যদিও বিশ্ববিদ্যালয়ে অবস্থান করত না তবু সে শুনেছে মুশতাক চক্রকে হটিয়ে খালেদ মুশাররফের ৩রা নভেম্বর পাল্টা অভ্যূত্থানের পর ৪ঠা নভেম্বর ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয়ের হাজার হাজার ছাত্র প্রতিবাদ মিছিল নিয়ে বঙ্গবন্ধুর ৩২ নম্বর বাড়ীর দিকে যায়,। সেখানে বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের নিহত সদস্যদের জন্য গায়েবানা জানাজা পড়ানো হয়। করা হয় প্রতিবাদ সভা। আবার ৩রা নভেম্বর রাতে ঢাকা কেন্দীয় কারাগারে বন্দী জাতীয় চার নেতাকে মুশতাক রশীদ ডালিম চক্র কতৃক খুন করার খবর শুনে শোকে ও ক্ষোভে ফেটে পড়ে ছাত্ররা। মধূর কেন্টিনে তারা সমাবেশ করে। এ চার নেতা হত্যার প্রতিবাদে ঢাকায় আধবেলা হরতালও ডাকা হয় এবং হরতাল শেষে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে গিয়ে তারা গায়বানা জানাজা পড়ে।
প্রান্ত বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের পর সেনা বাহিনীর মধ্যে যে রক্তারক্তি ঘটছে তা দেশের জন্য যে এক ভয়াবহ অভিশাপ বয়ে এনেছে তা দেখে সে খুবই চিন্তিত হয়ে পড়ল। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর যে অসংবিধানিক পথে রাষ্ট্র ক্ষমতা পরিবর্তনের ধারা শুরু হয়েছে তাতে এপর্যন্ত জাতীয় চার নেতাসহ, কর্ণেল শাফায়াত জামিল, খালেদ মোশাররফ, হায়দার, নূর সহ আরো কত মুক্তিযুদ্ধা প্রাণ বলি দিয়েছে আর সামনে আরো কত প্রান বলি হবে কে জানে!!
বুধবার, ২৪ আগস্ট, ২০২২
৮ম পর্ব পাকিস্থান থেকে বাংলাদেশ “চোখে দেখা রাজনীতি”
জিয়ার উত্থান ও সামরিক স্বৈরাচার :-
স্বাধীনতার পর থেকে দেশে স্বাধীনতা বিরুধী ও কিছু অতি বাম রাজনৈতিক দল ভারত বিরুধীতা জনগনের মাঝে উস্কে দিয়ে ঘোলা পানিতে রাজনীতি করার চেষ্টা করেছিল, সে ধারাবাহিতায় ৭ই নভেম্বরের পাল্টা অভ্যূত্থানেও সুচতুরভাবে ভারত বিরুধীতাকে কাজে লাগায়ে গুজব ছড়ানো হয়। ভারত বিরুধীতার এ গুজবে যখন জনগন দেখল ভারতের তথাকথিত (যা আদতে সত্যি নয়) দালাল খালেদ মোশাররফের অভ্যূত্থান প্রচেষ্টা দেশ প্রেমিক সৈনিকেরা ব্যর্থ করে দিয়ে জিয়াকে তাদের বন্দীদশা থেকে মুক্ত করে এনেছে। তাই সবাই জিয়ার উত্থানকে স্বাগত জানাল। কিন্তু সিপাহীবিদ্রোহের নায়ক কর্নেল তাহের চলে গেলেন পর্দার অন্তরালে। বন্দী করে রাষ্টদ্রোহিতার অভিযোগে অভিযুক্ত করে মার্শাল ল কোর্টে বিচার করে তাকে ফাঁসীতে ঝুলিয়ে হত্যা করা হয়। এর কোন প্রতিক্রিয়া হল না সারা দেশে।
আবার প্রান্তের কাছে আসা যাক প্রান্তও দেশে তথা সেনা বাহিনীর মধ্যে কি ঘটছে, পরিস্তিতি কোন দিকে মোড় নিচ্ছে, কে ক্ষমতার কেন্দ্র বিন্দুতে আছে সারা দেশবাসীর মত সেও বুঝে উঠতে পারছিল না। সারা দেশের আপামর জনসাধারণ অন্ধকারে গুজবে গুজবে আতঙ্কিত হয়ে দিন অতিবাহিত করছিল। সেই প্রক্ষাপটে ১৯৭৫ সালের ১১ই নভেম্বর এক বেতার ও টেলিভিশন ভাষণে মেঃ জেঃ জিয়া উর রহমান বলেছিলেন "আমি রাজনীতিবিদ নই আমি একজন সৈনিক, রাজনীতির সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই আমার সরকার সম্পূর্ণ নির্দলীয় ও অরাজনৈতিক। মানুষ একটু আস্বস্থ হলেন, তিনি রাজনীতি করবেন না অচিরেই ক্ষমতা জনগনের নিকট ফিরিয়ে দেবেন।
১৯৭৬ সালে সরওয়ার্দী উদ্যানে এক জনসভায় তিনি এবার বললেন "আমি এক জন শ্রমিক" এবার জনগণ সন্দেহ করতে লাগল জেনারেল জিয়া একবার 'সাধারন সৈনিক' একবার 'শ্রমিক' সাজার কারন কি ? বুঝা গেল তিনি একবার শ্রমিক, একবার সৈনিক সেজে জনসাধারনের মাঝে জায়গা করে নিতে চাচ্ছেন। তিনি১৯৭১সালের ২৮শে মার্চ চট্টগ্রামের কালুর ঘাট বেতারে ইচ্ছাকৃতভাবে উচ্ছাকাঙ্খাকী হয়ে যে ২য় ঘোষনা দিয়ে নিজেকে Provincial Head head of the shadin Bangla liveration government ঘোষনার করেছিলেন তখন তার মনের ভিতর যে Head of the government হওয়ার সাধ জেগেছিল এখন একের পর এক বাঁধার সিঁড়ি ডিঙ্গিয়ে তিনি সেই লক্ষের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। জেঃ জিয়া এই Head of the government হবার ছক আঁটতে গিয়ে তার পূর্ব সূরী সামরিক শাসক আয়ুর খানের চিত্রনাঠ্য ধরে এগুতে থাকেন এবং শেষ পর্যন্ত সত্যি সত্যি গন্তব্যে পৌঁছে যান।
আগেই উল্লেখ করেছি জিয়া ছিলেন ধীর স্তির ঠান্ডা মাথার কুটবুদ্ধি সম্পন্ন বিচক্ষন মানুষ। তিনি তাড়াহুরা না করে এক পা দু পা করে এগুতে থাকেন। ধীরে ধীরে তিনি সেনাবাহিনীর মধ্যে তার অবস্থান দৃড় করেন। এক সময় সেনাবাহিনীর মধ্যে তাকে চেলেঞ্জ করার আর কেউ থাকল না। এরপর তিনি চিন্তা করলেন, যেহেতু প্রেসিডেন্ট সায়েম তার পূর্ব প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ৭৭সালের ফেব্রুয়ারী মাসে নিরপেক্ষ নির্বাচন দিয়ে জনগনের হাতে ক্ষমতা ফিরিয়ে দিতে কাজ করছেন, সেহেতু তিনি(জিয়া) যে উচ্ছাভিলাসী রাজনৈতিক পরিকল্পনা নিয়ে তিনি এগুছেন তাতে তার মূলে কুঠরাঘাতের মত হবে। তাই তিনি সায়েমকে ফেব্রুয়ারী মাসের সংসদ নির্বাচন স্তগিত করতে বাধ্য করেন। তিনি তার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সায়েমকে পথের কাঁটা ভাবতে থাকেন, তাই তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন সায়েমের কাছ থেকে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের পথটি কেড়ে নিবেন। সে লক্ষে একদিন তিনি বঙ্গ ভবনে গিয়ে প্রেসিডেন্ট সায়েমকে জেঃ এরশাদ, শওকত আলী, জেঃ মঞ্জু ও প্রসিডেন্টের বিশেষ সহকারী বিচারপতি সাত্তার ও তিন বাহিনীর প্রধানদের উপস্তিতিতে তার প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের পদটি ছেড়ে দিতে বাধ্য করেন। তিনি তার অন্যায় আবদার প্রত্যাখ্যান করে বলেন, "আমি দেশে গনতন্ত্র ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব নিয়েছি, আমাকে গনতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্টা করার কাজ শেষ করতে হবে।" এর পর জিয়ার সাথে অনেক তর্কাতর্কি চলে, এক সময় রাত একটার দিকে প্রসিডেন্ট সায়েমকে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের পদটি হস্তান্তরের কাগজে বাধ্য করে সই করিয়ে নেন জেঃ জিয়া। ১৯৭৬ সালের ২৯শে নভেম্বর তিনি প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের পদটি দখল করে নেন। এরপর সায়েমের কাছ থেকে প্রেসিডেন্টের পদটি ছিনিয়ে নেয়া ছিল সময়ের ব্যপার মাত্র। অবশেষে ১৯৭৭সালের একুশে এপ্রিল বিচারপতি সায়েম জিয়ার নিকট প্রসিডেন্টের পদ ছেড়ে দেবার ঘোষনা দিতে বাধ্য হন। তিনি এক ভাষনে বলেন, " আমি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম শাররীক অসুস্ততার কারনে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালনে অক্ষম হয়ে পড়েছি। সুতরাং আমি মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে দেশের প্রেসিডেন্ট মনোনীত করছি আর তার কাছে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব অর্পন করছি।" জিয়া ষখন প্রেসিডেন্ট হিসাবে দায়িত্ব গ্রহন করেন তখন মার্শাল ল আইনে দেশ সম্পূর্ণ তার কজ্বায়। দেশের মানুষের রাজনৈতিক তথা মৌলিক অধিকার সামরিক শাসনের বুটের তলায় পিষ্ট।
এ পরিস্তিতিতে দেশের রাজনৈতিক দলগুলো বিশেষ করে আওয়ামীলীগ, জাসদ, কমিউনিষ্ট পার্টি সহ বিরুধী শক্তি সমূহ দ্বিধাবিভক্ত, বিচ্ছিন্ন, ছত্রভঙ্গ ও দিশেহারা। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে জিয়া প্রমান করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন তিনি বন্দুকের নল দিয়ে নয় জন সমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় এসেছেন। সে জন্য তিনি দেশের উন্নয়নের কথা বলে ১৯ দফা কর্মসূচি ঘোষনা করেন। এ ১৯ দফা কর্মসূচীরর প্রতি জনগনের আস্থা আছে কিনা জনপ্রিয়তা যাছায়ের জন্য ৩০মে তিনি একক প্রার্থী হয়ে হাঁ না ভোটের আয়োজন করেন। এ ভোটে জন সম্পৃক্ততা না থাকলেও ভোটের ফলাফল ছিল ৯৮.৯% হাঁ, মোট ভোট সংগৃহীত হয়েছিল ৮৮.১%,। এ হাস্যস্কর নির্বাচনের কোন গ্রহন যোগ্যতা না থাকলেও গনভোটের মাধ্যমে তিনি রাজনৈতিক বৈধতার একটি ছাড়পত্র তৈরী করে নিলেন। (সহায়ক সূত্র-৭৫ ও তারপর বঙ্গবন্ধুর খুনীদের উস্ফালন কাল।,আমার বন্ধু ব্লগ, স্বাধীন বাংলাদেশে বৃটিশ দ্বিজাতি তত্ত্ব, মুশতাক জিয়া সায়েম, আমার ব্লগ সাইম হাসান খান,২৫/০২/১৩) (বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডে জিয়াউর রহমানের দায়, রাজেশ পাল)
সোমবার, ২২ আগস্ট, ২০২২
৬ষ্ট পর্ব /পাকিস্থান থেকে বাংলাদেশ “চোখে দেখা রাজনীতি”র ৬ষ্ট পর্বে বঙ্গবন্ধু হত্যায় দেশীয় ও আন্তর্জাতিক তথা পাকিস্থান আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা
বঙ্গবন্ধু হত্যার ষড়যন্ত্রকারী আরেক কুশিলব বঙ্গবন্ধুর বন্ধুবেশী ঘাতক খন্দকার মুশতাক। এবার দেখুন তার নাটকের মঞ্চয়ন, একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের মূহূর্তে বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে নস্যাৎ করতে যে কয় জন দেশী বিদেশী ষড়যন্ত্রকারী ষড়যন্ত্র করেছিল সেই ষড়যন্ত্রকারীরাই ছিল পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের মূল কুশিলব। যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালিন পররাষ্ট্র মন্ত্রী যিনি তার কুট বুদ্ধির জন্য বাঙ্গালীদের কাছে তখন থেকে আজ পর্যন্ত ঘৃনিত, বাঙ্গালীরা এখনো কুট বুদ্ধি বুঝাতে তার 'কিসিঞ্জার' নামটি ব্যবহার করে, সেই কুটবুদ্ধির কিসিঞ্জার, পাকিস্থানের মেকিয়াভেলী রাজনীতিবিদ জুলফিকার আলী ভূট্টো, আর বাংলাদেশের মিরজাফর খ্যাত খন্দকার মুশতাক আহম্মদ, মাহবুবুল আলম চাষী, তাহের উদ্দীন ঠাকুরাই, ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যার নেতৃত্ব দিয়েছে। যে মুশতাক বঙ্গবন্ধু প্রেমে মশগোল হয়ে ১৯৭১সালে পাকিস্থানীদের হাত থেকে বঙ্গবন্ধুকে বাঁচাতে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিনিময়ে পাকিস্থানীদের সাথে সমঝোতা করতে চেয়েছিলেন, বঙ্গবন্ধুকে বাঁচাতে না পারার শংকায় কেঁদে বুক ভাসিয়েছেন। বঙ্গবন্ধুর মায়ের মৃত্যুতে বঙ্গবন্ধুর চেয়ে বেশী কেঁদেছেন সে কুশলী অভিনেতা, আবার বন্ধুবেশী ঘাতক হয়ে ষড়যন্ত্র করে ১৫ই আগষ্ট বত্রিশ নম্বরের বাস ভবনে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার জন্য টেঙ্ক পাঠিয়ে নিজের আগামসী লেনের বাসার দোতলায় বসে প্রেসিডেন্ট হবার স্বপ্নে বিভোর হয়ে অপেক্ষা করছিলেন। শেখ মুজিবকে হত্যার পর তার লাশ বত্রিশ নম্বরের বাড়ীর সিঁড়িতে পড়ে থাকা অবস্থায় সেনা বাহিনীর পাক মার্কিন চরদের সহায়তায় গদী দখল করে প্রেসিডেন্টের শপথ নিয়েছিলেন। এই বিশ্বসঘাতক ষড়যন্ত্রকারী পাকিস্থানী চর মোশতাক স্বাধীনতার পর প্রচারনা চালিয়ে বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের সাথে তাজউদ্দিনের ফাটল সৃষ্টি করেন এই বলে যে, তাজউদ্দীন বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্থানের কারাগারে মৃত্যু ঘটিয়ে দেশের ভাগ্য বিধাতা হতে চেয়েছিলেন। তার এ প্রচারনায় মুক্তিযুদ্ধাদের মধ্যেও তাজুদ্দিন সম্পর্কে ব্যাপক বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়। তাজউদ্দীনকে বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের প্রতি বৈরী বানিয়ে তিনি তাদের ঘাতকরূপী বন্ধু ও আপনজন সেজেছিলেন। আবার সেই আপনজন তাদের হত্যা করে শুধু উল্লাসই প্রকাশ করেননি, হত্যাকারীদের সূর্যসন্তান হিসাবেও আখ্যা দিয়েছিলেন। এই ঘৃন্যতম বর্বরতাকে ঐতিহাসিক প্রয়োজন মনে করেছিলেন।
কিন্তু বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য সহকর্মী তাজুদ্দীনকে বঙ্গবন্ধু থেকে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে বিচ্ছিন্ন করে মন্ত্রী সভা থেকে বরখাস্ত করতে সফল হয়েছিল সত্য, কিন্তু তাজুদ্দিন জীবন দিয়ে প্রমান করে গেছেন বঙ্গবন্ধুর প্রতি তার শ্রদ্ধা, ভালবাসা আর আনুগত্যে এতটুকু খাদ ছিলনা। কলামিষ্ট স্বদেশ রায় দৈনিক জণকন্ঠে ২০০৪ সালে ২৩শে এপ্রিল লিখেছেন, "সত্যিকার অর্থে বাংলাদেশের ইতিহাস নিয়ে যতই গবেষনা হউকনা কেন, বারবার দেখা যাবে মুজিব তাজুদ্দিন এ জুটি যেন হয়েছিল একটি নির্যাতিত জাতির ঐতিহাসিক প্রয়োজনে। শেখ মুজিবুর রহমানের মত বিশাল নেতার সাথে তাজুদ্দিন আহাম্মদের মত প্রজ্ঞাবান নেতৃত্ব ছিল প্রকৃতির অমোঘ আশির্বাদ।"
যাই হউক যে কথা বলতে চেয়েছিলাম। ৭১এর বঙ্গবন্ধু প্রেমী মুশতাক আর ৭৫ এর বঙ্গবন্ধুর খুনী মুশতাকের মধ্যে হিসাব মিলান। হিসাব মিলালে দেখবেন আরো একটি বিষয় বেরিয়ে আসবে, মুজিব হত্যার অল্প কিছুক্ষনের মধ্যে পাকিস্থান এ খুনী মুশতাক সরকারকে স্বিকৃতি দেয়। মুজিব হত্যায় উল্লাসিত ভূট্টো বাংলাদেশের জন্য পঞ্চাশ হাজার টন চাল তার সাথে দেড় কৌটি গজ কাপড় পাঠানোরও ঘোষনা দেন। দেখুন থলের বিড়াল কিভাবে বের হয়ে আসছে।
এখানে হিসাব আরো আছে, বাংলার শত্রু ভুট্টো কিসিঞ্জার এ সকল বিদেশী প্রভূরা বাংলাদেশের কুলাঙ্গার মোশতাক জিয়াদের দিয়ে এ হত্যাকান্ড ঘটায়। তারা শুধু বঙ্গবন্ধুকে নয়, তারা ফারুক-রশীদ-ডালিম-নূর চক্রকে লেলিয়ে দিয়ে বঙ্গবন্ধু পরিবার ও তার স্বজনদেরও নির্মম ভাবে হত্যা করে। বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ড নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষনা করা সাংবাদিক 'লিফশুলজের' মতে ''জিয়ার সুস্পষ্ট সমর্থন ছাড়া কোন দিনই মুজিব হত্যা কান্ড সফল হতো না। তাই জিয়া এ হত্যাকান্ডের ছায়া মানুষ।"
এ হত্যাকান্ডে পাকিস্থান জড়িত থাকার আরো সুস্পষ্ট প্রমান হল, বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের পর ঢাকা বেতার কেন্দ্রে অবস্থান কারী মেজর শাহরিয়ার তৎকালীন ঢাকা বেতার কেন্দ্রের আঞ্চলিক পরিচালক আশফাকুর রহমানকে ১৫ই আগষ্ট হত্যা কান্ডের পর বাসা থেকে ধরে এনে বন্দুকের নল ঠেকিয়ে রেডিওতে প্রচারের জন্য যে যে নির্দেশ দিয়েছিলেন তা বঙ্গবন্ধু হত্যা কান্ডের বিচারের সময় আদালতে সাক্ষী হিসাবে তিনি যে জবান বন্দী দিয়েছিলেন তাকে থেকে বুঝা যায় পাকিস্থানের প্রতি তাদের কত দরদ। আশফাকুর রহমান বলেন "মেজর শাহরিয়ার তাকে ডেকে নিয়ে তদের(ক্যূ সংগঠনকারীদের) পলিসি কি জানিয়ে সে মত কাজ করার নির্দেশ দেন। তার নির্দেশের মধ্যে ছিল, "এখন থেকে বেতারের নাম বাংলাদেশ রেডিও হবে, বঙ্গবন্ধু, জয়বাংলা, পাকিস্থানী হানাদার বাহিনী, রাজাকার ইত্যাদী শব্দগুলা উচ্ছারন করা যাবেনা, তাছাড়া শেখ মুজিব সংক্রান্ত কোন তথ্য উচ্চারন করা যাবেনা।----" এখন হিসাব মিলালে দেখবেন তারাও পাকিস্থানীদের মত জয়বাংলা শ্লোগানে ভীত, পাকিস্তানী হানাদার আর রাজাকারদের কুকীর্তি ধাপাচাপা দিতে উৎগ্রীব, সে লক্ষেই তারা এসব উচ্ছারন নিষিদ্ধ করেছিলেন । উল্লখ্য জিয়াও হেঁটেছিলেন সে পথে। তাহলে এ ষড়যন্ত্রকারীরা কি পাকিস্থানী প্রেতাত্মা ছিল না?
গর্ত খুঁড়লে আরো কত সাপ আর কেঁচু বের হয় তা একটু জাতিকে জানানো দরকার। আমরা জানি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে "মোর একটি ফুলকে বাঁচাব বলে যুদ্ধ করি" কালজয়ী গানের গায়ক আপেল মাহমুদ, ৭৫ সালে তিনি বাংলাদেশ বেতারের আধিকারিক ছিলেন। তিনি বঙ্গবন্ধু হত্যার বিষয়টি আগে থেকে অবহিত ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর হত্যার পর পর তিনি বেতার কেন্দ্রে এসে মেজর ডালিমকে হাসি মুখে অভিনন্দন জানান। বেতার কেন্দ্র চালু করতে সর্বিক সহযোগিতা করেন। আপেল মাহমুদ নিজে ডালিমকে স্কিপ্ট লিখে দেন যা ডালিমের কন্ঠে রেকর্ড করে বার বার বেতারে প্রচার করা হয়।
এখন শুনুন আর এক তথাকথিত স্বনামধন্য ব্যক্তি সূরকার গীতিকার, চলচ্চিত্র পরিচালক'ওরা এগার জন খ্যাত' খান আতাউর রহমানের কথা, বাংলাদেশ বেতারের সাবেক স্কিপ্ট লেখক জয়নুদ্দীনের লিখা থেকে জানা যায়, পূর্বালোচনা মোতাবেক সকাল দশটার দিকে বেতার কেন্দ্রে ছুটে আসেন মুক্তিযুদ্ধের প্রচন্ড বিরুধীতাকারী খান আতাউর রহমান। তিনি দুটি গান নিয়ে আসেন, যা মেজর ডালিমের সাথে সলাপরামর্শ করে আগেই লেখা। আপেল মাহমুদের রুমে বসে নিজের লেখা এ গান দুটির সূর করেন তিনি। গান দুটি শাহরিয়ার, মেজর ডালিম, মেজর রশীদকে সূর্য সন্তান আখ্যা দিয়ে লেখা। গান দুটি তড়ীঘড়ি রেকর্ড করে বার বার বাজনো হয়। ( সহায়ক সূত্র -বাংলাদেশ বেতারে বঙ্গবন্ধুর খুনীদের অপারেশন, খালেদ বিন জয়েন উদ্দীন, সাবেক স্কিপ্ট রাইটার, সহ সম্পাদক বেতার বাংলা ১১ই আগষ্ট ২০১৪, দৈনিক জনকন্ঠ)
খন্দকার মুশতাকের বিরাশি দিন:- পৃথিবীতে যেমন কিছু মহা মানবের আবির্ভাব ঘটে, সমাজ রাষ্ট্রে বিপ্লব ঘটিয়ে পৃথিবীকে উন্নতির পথে কল্যানের পথে নিয়ে যেতে, আবার কিছু কিছু বিশ্বাসঘাতক খল নায়কের সৃষ্টি হয় যারা নিজ স্বার্থে জাতীর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে প্রগতির চাকাকে পিছিয়ে দিয়ে সমাজকে নিমজ্জিত করে এক অরাজক নারকীয় পরিস্তিতিতে। তাদের বিশ্বসঘাতকতায় ক্ষতিগ্রস্ত হয় সমাজ জাতি ও রাষ্ট্র। মীর জাফরের পর বাংলার ইতিহাসে বিশ্বাসঘাতক দ্বিতীয় খল নায়ক হচ্ছে খন্দকার মুশতাক আহমদ। এই খন্দকার মুশতাক ক্ষমতায় লোভে তার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সুহৃদ, ঘনিষ্ট বন্ধু আন্দোলন সংগ্রামের গুরু বঙ্গবন্ধুকে ষড়যন্ত্রে মাধ্যমে হত্যা করে তাঁর তাজা রক্ত মাড়িয়ে রাষ্ট্রপতির পদ দখল করেন। ক্ষমতা দখল করে বেতার ভাষনে বলেন তিনি ঐতিহাসিক প্রয়োজনে ক্ষমতা দখল করেছেন।
উল্লেখ্য যে সংবিধান অনুযায়ী প্রেসিডেন্ট নিহত হলে দায়িত্ব পাওয়ার কথা ভাইস প্রসিডেন্ট। আর তিনি অপারগ হলে দায়িত্ব বর্তায় জাতীয় সংসদের স্পীকারের উপর। কিন্তু সবকিছু উপেক্ষা করে খুনী চক্রের সাথে হাত মিলিয়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসীন হন মোশতাক।
ক্ষমতায় এসে তিনি প্রথমে বাংলাদেশ বেতারের নাম বদলিয়ে করে দেন রেডিও বাংলাদেশ। মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনাকারী চার নেতাকে বন্দী করে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসেন চরম ডান পন্তীদের। যারা সকলেই প্রবলভাবে পাকিস্থানী রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় বিশ্বাসী। ফলে বাস্তবায়িত হতে থাকে পাকিস্থানী আদর্শ। জয়বাংলার জায়গায় চলে আসে জিন্দাবাদ। প্রচেষ্টা চলে বাংলাদেশকে সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র বানানোর। পাকিস্থানের সাথে শক্তিশালী সম্পর্ক স্থাপন, সম্ভব হলে কনফেরাশন গঠনের সম্ভাবনাও দেখা দেয়। ৭৫এর ২৬শে সেপ্টেম্বর মুশতাক এই মর্মে একটি অধ্যাদেশ বা দায়মুক্তি আদেশ জারী করেন যাতে স্বপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যার সাথে জড়িতদের কোন বিচার করা না যায়। মুস্তাকের ক্ষমতার অন্তিম সময়ে তারি নির্দেশে কারাঅভ্যন্তরে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় তার এক সময়ের আন্দোলন সংগ্রামের সাথী, রাজনৈতিক সহচর জাতীয় চার নেতাকে।
১৯৭৫সালের ৩রা নভেম্বর মুক্তিযুদ্ধা খালেদ মুশারফের নেতৃত্বে যে পাল্টা অভ্যূত্থান সংঘঠিত হয় তাতে ক্ষমতাচ্যূত হন মেজর ফারুক,রশীদ এবং মোশতাকের গড়া বিরাশি দিনের বঙ্গবন্ধুর রক্তে রঞ্জিত সরকার।
৫ম পর্ব /পাকিস্থান থেকে বাংলাদেশ “চোখে দেখা রাজনীতি”র ৫ম পর্বে বাকশাল কি ও ১৫ই আগষ্ট অভ্যূত্থানের কুশিলবরা
বাকশাল(বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ):- ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে হত্যার পর থেকেই অবিরাম চলে আসছে যে বঙ্গবন্ধু আজীবন গনতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম করে একদলীয় শাসন বাকশাল কায়েম করে গণতন্ত্রকে হত্যা করেছেন। কিন্তু কি সেই বাকশাল? বাকশাল এমন এক পদ্ধতি বঙ্গবন্ধু বাকশাল প্রতিষ্টার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে কৃষক শ্রমিক মেহনতি মানুষের প্রতিনিধিত্ব সৃষ্টি করে শোষিতের গনতন্ত্র কায়েম করতে চেয়েছিলেন। বাকশাল সৃষ্টির মধ্য দিয়ে তিনি করতে চেয়েছিলেন বাংলাদেশের ৮০% মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন। তার এই উদ্যোগ পুঁজিবাদী স্বার্থে আঘাত লাগার কারনে তাঁর বিরুদ্ধে(এমনকি তাঁর দলের ভিতরেও) পুঁজিবাদী শক্তি ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। পরিনতিতে স্বপরিবারে করুনভাবে প্রাণ দিতে হয় বঙ্গবন্ধুকে।
বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর থেকে আজ পর্য়ন্ত আমরা যে প্রচলিত গনতন্ত্র দেখছি সে গণতন্ত্রে কি সাধারণ মানুষের কোন প্রতিনিধিত্ব দেখছি? বিশাল সম্পদ এবং কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা যার আছে তিনিই শুধু নির্বাচনে অংশ গ্রহন করতে পারেন। তারাই স্থান করে নিয়েছে জাতীয় সংসদে। তারা কিন্তু কেউ এদেশের স্বাধারন মেহনতি মানুষ নয়। তারা হলেন সমাজের ধনিক শ্রেনী। যার ফলে অর্থ বিত্তশালীরা এ দেশের রাজনীতির কর্ণধার। উপরিউক্ত সিষ্টেমকে পরিবর্তন করার জন্যই বঙ্গবন্ধু বাকশাল গঠন করেছিলেন। এই পদ্ধতিতে সমবায়ের আওতায় কৃষি জমি চাষবাস এবং সকল নির্বাচনী ব্যয় রাষ্ট্রের উপর নিয়ে আসার সিদ্ধান্ত গ্রহন করা হয়।
বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, এ সিষ্টেম আমি বেশীদিন রাখবনা মেহনতি মানুষের প্রতিনিধিত্ব আসলেই আমি আবার বহুদলীয় গণতন্ত্রে ফিরে যাব। সব চেয়ে দুঃখের বিষয় হল আজ আমরা কেউ বাকশাল সম্পর্কে ভালভাবে না জেনে বঙ্গবন্ধুকে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য উঠে পরে লেগে থাকা সেই ৭১ আর ৭৫ সালের খুনিদের সাথে একিই সূরে বলি বঙ্গবন্ধু গণতন্ত্র হত্যা করেছেন। তার বিরুদ্ধে এ অপপ্রচার করাটা কি আমাদের যুক্তিসংগত? আক্ষেপ ! বাংলাদেশের মেহনতি মানুষ আজো বুঝতে পারেনি এ বাকশালই ছিল তাদের মুক্তির সনদ।
যুব সমাজের নৈতিক অবক্ষয় :- তখনো তখনো শোকাবহ ১৫ আগষ্ট আসেনি। প্রান্ত বিয়োগান্ত এক ট্রেজেডির মাধ্যমে তার বোন রুশনীকে হারানোর পর খুবই শোকাহত হয়ে পড়ে। গ্রামের সব ফেলে চলে আসে ঢাকায়। সেখানে এসে সে ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়। @#%$#@%$#@বিশ্ব বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে দেখে সমাজের সব জায়গায় যে মূল্যবোধের ধষ নেমেছে এখানেও তার কোন ব্যতিক্রম নেই। যে ছাত্র সমাজ এক সময় আদর্শের জন্য জীবন দিয়েছে সেই ছাত্র সমাজের বিরাট একটি অংশ আজ ভোগ বিলাসে গা ভাসিয়ে দিয়ে চুরি ডাকতি রাহাজানী, ব্যাঙ্ক ডাকাতির মত ঘৃন্য কার্য কলাপে লিপ্ত হচ্ছে। মদ গাঁজা ভাং চরশ সহ বিভিন্ন নেশা জাতিয় দ্রব্যে আসক্ত হয়ে সোনালী ভবিষ্যতকে নষ্ট করে দিচ্ছে। অনেক ছাত্র হাই কোর্টের মাজারের পাশে অবস্তানরত নেশাগ্রস্ত তথাকথিত দরবেশ নূরা পাগলার আস্তানায় ঠাঁই গাঁড়ে। সেখানে তারা নূরা পাগলাকে নিয়ে রাতভর গাঁজার নেশায় বুদ হয়ে বাদ্য যন্ত্র বাজিয়ে নানা রকম মারফতি গান করে মাজারের আশে পাশে ঘুমিয়ে পরে। প্রান্তও বন্ধুদের পাল্লায় পরে তার শোকাবহ হতাসাগ্রস্ত জীবনকে ভূলে থাকতে বেশ কয়েকবার সেই নূরা পাগলার আস্তানায় গিয়েছিল। পরে নিজের হিত চিন্তা করে নিজেকে সেসব থেকে দূরে সরিয়ে আনে। শুধু প্রান্ত নয় স্বাধীনতার পর যুব সমাজ ভেবেছিল দেশ স্বাধীন হবার পর সব কিছু দিনে দিনে বদলে যাবে। তারা যা চাইবে তাই হাতেট মুঠোয় চলে আসবে। যেহেতু তারা দেশের জন্য অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছে, যুদ্ধ করছে, রক্ত দিয়েছে প্রাণ দিয়েছে, এখন দেশের তাদেরকে দেয়ার পালা, এমনি এক অবাস্তব স্বপ্নীলতা তাদেরকে এমনভাবে আশ্চন্ন করে ফেলেছিল যে, তারা বলতে শুরু করে,
"লক্ষ লক্ষ প্রানের দাম,
অনেক দিয়েছি উজার গ্রাম
সুদ আসলে আজকে তাই
যুদ্ধ শেষের প্রাপ্য চাই।"
স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়ের তাদের যে দেশ প্রেম ছিল তা দিনে দিনে তিরুহিত হয়ে কেউ ভোগবাদে, কেউ কেউ হতাসায়, কেউ কেউ উশৃঙ্খল আধ্যাত্ববাদে মশগোল হয়ে নৈতিকতাকে বিসর্জন দিয়ে ধংষের দোড় গোড়ায় পৌছে যাচ্ছিল। কলেজ বিশ্ব বিদ্যালয়ের হলে হলে নেশা মহামারীর মত ছড়িয়ে যায়। নেশা করা যেন একটা ফ্যাসন হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ছাত্র রাজনীতিতে শুরু হয় অস্ত্রের ঝনঝনানী। দলীয় কোন্দলের জের ধরে বিশ্ববিদ্যালয় হতে থাকে রক্তাক্ত। একদিনে একসাথে সাতজন ছাত্রকে গুলি করে ছাত্রলীগের বিরুধী গ্রুপ। নেতৃত্ব দেয় তৎকালীন ছাত্রলীগ নেতা আজকের জাগপা প্রধান সদ্য প্রয়াত শফিউল আলম প্রধান। এইসব নেশাগ্রস্ত অধঃপতিত উশৃঙ্খল তরুন সমাজকে নিয়ে, আতঙ্কিত হয়ে উঠল দেশের সরকার, অভিবাবক এবং সচেতন মহল। তাদের শুধরানোর জন্য নির্মিত হয় 'আবার তোরা মানুষ হ' এর মত চলচ্ছিত্র।
এই রকম এক উদ্বেগজনক পরিস্থিতি থেকে যুব তথা ছাত্র সমাজকে উত্তরনের পথ দেখতে ১৫ আগষ্ট ১৯৭৫ সালের সকালে বঙ্গবন্ধু আসবেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্টানে। ছাত্র ছাত্রীদের মধ্যে সাজ সাজ রব। বঙ্গবন্ধুকে অভ্যর্থনা জানাতে সবাই উন্মুখ। প্রান্তরাও মহান নেতাকে সম্বর্ধনা দিতে মুখিয়ে আছে।
বঙ্গবন্ধুকে প্রান্ত প্রথম চাক্ষুস দেখেছিল নির্বাচনের সময় তাদের বাড়ীর পাশে বোন রুশনী সহ শৈকত পাড়ে। তাঁকে আবার দেখবে বিশ্ববিদ্যালয়ে, কিন্তু তার বোন রুশনী আজ ইহ জগতে নাই। এ স্মৃতি জাগানীয়া কথা মনে আসতেই প্রান্তের দু চোখ বেয়ে অশ্রু ঝরে পড়ল। বোনের সেই নিস্পাপ চেহেরাটা ভেসে উঠল তার সামনে। বিছানায় শোয়ে শোয়ে এসব চিন্তা করতে করতে এক সময় সে ঘুমিয়ে পড়ল।
রাত ভেদ করে ভোরের ফর্সা আভা তখনো দেখা দেয়নি মুয়াজ্জিন হয়ত আযান দেয়ার জন্য অজু করছেন। প্রান্তদের হলের বেশ কিছু ছাত্রলীগ কর্মী এই সাঁঝ সকলে উঠে গেছেন কারন কয়েক ঘন্টা পর বঙ্গবন্ধু আসছেন তাদের চল্লিশতম সমাবর্তনে যোগ দিতে। সে জন্য তারা প্রস্তুতি নিতে। হঠাৎ পাশের রুমের নাফিস এসে প্রান্তদের দরজা ধাক্কা দিচ্ছে। প্রান্ত ঘুম জড়ানো বিরক্তিকর কন্ঠে বলতে লাগল, এত বিরক্ত করছ কেন? সে অপর পাশ থেকে বলতে লাগল,
"সর্বনাশ হয়ে গেছে, তাড়াতাড়ি রেডিও অন কর।"
কি হয়েছে বলবে তো বলে সে বিছানা থেকে উঠে দরজা খুলে দেয়। তারপর রেডিওটি অন করে। রেডিওতে তখন মেজর ডালিমের ঘোষনা, "স্বৈরাচারী শেখ মুজিকে হত্যা করা হয়েছে--- ঢাকা শহরে কার্ফিও জারী করা হয়েছে" এ ঘোষনা শুনে প্রান্তর বিশ্বাসই হচ্ছিলনা, এ অপ্রত্যাশিত ঘোষনাকে তার দুঃস্বপ্নের মত মনে হল। তীরের মত সেল যেন তার হৃদয়কে বেদনায় বিদ্ধ করে দিল। একটি প্রশ্ন বার বার মনে আসতে থাকে কার এত সাহস বাঙালী জাতির এ মহান নেতাকে হত্যা করে?
এদিকে অভ্যুত্থানের কুশিলবরা ধীরে ধীরে সক্রিয় হয়ে উঠে। ছক আঁটা পরিকল্পনা মত তারা তাদের কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ে। এ হত্যার ষড়যন্ত্রে জড়িত কুশিলবদের ভূমিকা পুনঃ মঞ্চস্ত করে দেখা যাক কে কি ভূমিকায় অবতীর্ন হয়েছে।
অভ্যূত্থানে জড়িত সেনা অফিসার কর্নেল রশীদ বঙ্গবন্ধু হত্যার অব্যবহিত পরে ৪৬তম ব্রিগেডের কমান্ডার শাফায়াত জামিলের বাসার দিকে রওনা দেয়, বাসায় গিয়ে সে সেনাবাহিনী কতৃক বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করার কথাটি জামিলকে অভিহিত করে। কথাটি শুনে তিনি খুবই রোগে যান এবং তাকে কোর্ট মার্শালের ভয় দেখান। সে সময় সেনা প্রধান শফিউল্লার ফোন পেয়ে শাফায়াত জামিল আরো দুই সেনা কর্মকর্তাকে নিয়ে দ্রুত চলে গেলেন উপপ্রধান সেনা কর্মকর্তা জিয়ার বাসায়। তাদের সাথে রশীদও যায়। জিয়া তখনও অন্যান্য স্বাভাবিক দিনের মত দাঁড়ী কামানোতে ব্যস্ত ছিলেন, শাফায়াত জামিল জিয়ার সাথে দেখা করে তাকে সেনা বাহিনীর কতৃক বঙ্গবন্ধুর বাসা ঘেরাও করে প্রসিডেন্টকে হত্যার বিষটি অভিহিত করেন।" তিনি এমন একটি ঘোরতর কথা শুনে বিচলিত হলেন না, তেমন কোন ক্ষুদ্ধ প্রতিক্রিয়াও দেখালেন না, তিনি স্বাভাবিক ভাবে বললেন, "Presiden is dead, so what? Vice president is there. You should uphold the constitution. Get your troops ready" জিয়ার এই প্রতিক্রিয়া দেখে সাফায়াত জামিলেরও বুঝতে কষ্ট হয়নি জিয়া এ ব্যপারে আগে থেকে অবহিত আছেন। তা নাহলে দেশের প্রেসিডেন্ট সেনা বাহিনীর কিছু উশৃঙ্খল সেনা অফিসার দ্বারা নিহত হলেন তিনি সেনা বাহিনীর উপপ্রধান হয়ে এরকম একটি বিষয় জেনেও কি ভাবে একেবারে অবিচল রইলেন।
বঙ্গবন্ধু হত্যায় জিয়া শুধু অবিচল নয়, কি রকম উল্লাসিত হয়েছিলেন তার আর একটি নজির এখানে উল্লেখ করছি, অধ্যাপক আবু সায়িদের লেখা গ্রন্থ "বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ড, ফ্যাক্টস এন্ড ডকুমেন্টস" গ্রন্থে তিনি একজন সেনা অফিসারের উদ্ধৃতি দিয়ে লিখেছেন,-- "সেনা সদরে (১৫ই আগষ্ট) শফিউল্লার সাথে অন্যান্য অফিসাররাও যখন সেনা প্রধানের রুম থেকে বেরিয়ে আসেন, তখন জিয়াউর রহমান একটু এগিয়ে এসে ডালিমকে বলেন, Come, তারপর জিয়া আবেগের কন্ঠে তাকে বলল You have done such a great job. Kiss me, kiss me. এই বলে তিনি ডালিমকে পরম উষ্ণতায় জড়িয়ে ধরল । এরপর জিয়া আবার বলল-"You come in my car", সে উত্তর দিল " No sir, thank you very much. You are the Majour Ganral, I am a simple major. Otherwise you are the hero of entire show. Please allow me to my Jeep". পাঠক লক্ষ্য করুন সেই ১৯৭১ এর ২৮শে মার্চ স্বাধীনতার ঘোষনা পত্রের পাঠক(২য় বার) সেই উচ্ছাভিলাসী মেজর জিয়া যিনি নিজেকে সেইদিন Provincial head of the Shadin Bangla liberation government বলে ঘোষনা দিয়েছিলেন। তার সাথে ১৯৭৫এর পনেরই আগষ্টের (ডালিমের কথায় Entire show'র hero) মেঃ জেঃ জিয়াউর রহমানকে মেলান যিনি মেজর ডালিমকে 'Great job' সম্পাদন কারার জন্য আনন্দিত হয়ে তাকে Kiss করতে বলেছিলেন, কারন তিনি তখন বুঝে গেছেন ১৯৭১ সালের ২৮ এ মার্চ provincial head of the shadin Bangla liveration government হওয়ার যে স্বপ্ন তিনি মনের ভিতর লালন করেছিলেন সেই লালিত স্বপ্নের সিঁড়ি বেয়ে কাঙ্খিত লক্ষ্যে এগিয়ে যাবার পথ অনেকটা সুগম করে দিয়েছে ফারুক-রশীদ-ডালিমরা।
জিয়া ছিলেন খুবিই চালাক, কুঠবুদ্ধি সম্পন্ন, ধীর স্তির, নিষ্টুর প্রকৃতির ধূরন্ধর মানুষ, তিনি কম কথা বলতেন, রহস্যময় চোখ দুটি সব সময় ঢেকে রাখতেন সান গ্লাসের কালো রঙের আবরনে, বিদেশী সাংবাদিকের চোখে "জিয়া ছিলেন ঠান্ডা মাথার খুনী।" নিজের লক্ষ হাসিলের জন্য পরম উপকারীকেও নির্দয়ভাবে খতম করে দিতে দ্বিধা করতেন না" (বাংলাদেশ, এ লেগাসী অব ব্লাড /মুক্তিযুদ্ধ ও তারপর,গোলাম মুরশীদ ) জিয়া একদিকে বাকশালের সদস্য হবার জন্য আবেদন করেছিলেন, অন্যদিকে আবার জাসদ এবং তাহেরের সাথে সম্পর্ক রেখেছেন। মুশতাক সরকারের সেনা প্রধান হয়েছেন আবার ফারুক রশীদের বিরুদ্ধে শাফায়াত জামিলকে উস্কে দিয়েছেন। তাহেরের সামনে সমাজ তন্ত্রের মূলা ঝুলিয়ে তাহেরকে ব্যবহার করছেন। কাজ হাসিলের পর তার সাথে প্রথারনা করে তাকে নিষ্টুরভাবে ফাঁসীতে ঝুলিয়েছেন। সত্যিই জিয়া ছিলেন অতি চালাক 'ধরি মাছ নাছুঁই পানি' ধরনের বক ধার্মিক মানুষ। তবে একথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, কর্ণেল তাহের ও জাসদের অদূরদর্শী সীপাহী জনতার অভ্যূত্থানের নামে বিপ্লবের তথাকথিত বালখিল্য রাজনীতি জিয়াকে নেতা হিসাবে প্রতিষ্টিত হতে সবচেয়ে বেশী অবদান রেখেছে। জিয়ার উচ্চাঙ্খার ভূরি ভূরি প্রমান আছে। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ও তার উচ্ছাঙ্খার আরো প্রমান পাওয়া যায়, এ উচ্ছাভিলাসের কারনে কর্নেল ওসমানীর সাথেও সম্পর্কের অবনতি ঘটে তার, "১৯৭১ সালের ১১ই আগষ্ট কলিকাতার ৮নং থিয়েটার রোডে প্রবাসী সরকারের প্রধান মন্ত্রী তাজুদ্দিনের সভাপতিত্বে সেক্টর কমান্ডারদের এক বৈঠক অনুষ্টিত হয়, যুদ্ধের সার্বিক রণ কৌশল নির্ধারন করায় এ বৈঠকের উদ্দেশ্য। মেজর জিয়া সে সময় একটা প্রস্তাব পেশ করেন, প্রস্তাবটা ছিল অবিলম্বে একটা যুদ্ধ কাউন্সিল গঠন করতে হবে। এ প্রস্তাবে কর্ণেল ওসমানীকে প্রধান সেনসাপতির দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিয়ে প্রতিরক্ষা মন্ত্রীর দায়িত্ব দেয়ার প্রস্তাব করেন জিয়া। সুস্পষ্টই এটা ছিল যুদ্ধ পরিচালনায় সামরিক কতৃপক্ষের কতৃত্ব প্রতিষ্ঠার সুস্পষ্ট প্রয়াস। মেজর শফিউল্লাহ এবং খালেদ মোশাররফ এ প্রস্তাবের বিরুধীতা করেন। তারা বুঝতে পেরেছিলেন এটা জিয়ার কুট কৌশল। কারন ওসমানী অপসারিত হলে জৈষ্টতা অনুযায়ী জিয়াই হবেন সেনাপতি। এ সকল কারনে মুক্তিযুদ্ধ কালীন সময় ওসমানীকে তাজউদ্দীন তিন তিনবার জিয়াকে গ্রেফতার করার নির্দেশ দিতেও বলেছিলেন।" ( মুক্তি যুদ্ধে প্রবাসী সরকার, মেজর রফিকুল ইসলাম পি এস সি।) উচ্ছাঙ্খা তাড়িত জিয়া বঙ্গবন্ধু হত্যার ষড়যন্ত্র করে ক্ষমতা দখলের আর একটি প্রমান পাওয়া যায় ভারতীয় সাংবাদিক আনন্দ বাজার পত্রিকার তৎকালিন ব্যুরো চীফ সুখরঞ্জন দাশগুপ্তের সাথে তাজুদ্দিনের সাক্ষাৎকারে, (১৯৭৫ সালের এপ্রিল মাস)সুখ রঞ্জনের কথায় বলা যাক "আমাকে দেখেই তাজুদ্দীন বললেন বসুন, তারপর সেখানে উপস্তিত অন্যান্যদের চলে যেতে বললেন, তারপর কুশলাদির পর বলেন, ----এ চার পাঁচ মাস আমি ঘর থেকে এক পা বেরুইনি একটি ভয়ঙ্খর ষড়যন্ত্র দানা বেঁধে উঠছে, জানতে চাইলাম কি ধরনের ষড়যন্ত্র? তিনি বললেন হত্যা, হত্যার ষড়যন্ত্র। আমি শিউরে উঠি, প্রশ্ন করি কারা এষড়যন্ত্র করছে নাম জানতে পারি? তাজুদ্দীন গম্ভীরভাবে বললেন কি হবে আর নাম শুনে ! তারা সব শেখ সাহেবের বিশ্বস্থ লোক। সুখ রঞ্জন প্রশ্ন করলেন, শেখ সাহেব তা জানেন? তাজউদ্দীন বললেন, জানার তো কথা। তাজউদ্দীন গোড়া থেকে ব্যপারটা বলতে থাকেন, 'কদিন আগে একরাতে মেজর জেনারেল জিয়া দেখা করতে এসে সে প্রস্তাব দিল সামরিক অভ্যূত্থানের মাধ্যমে শেখ মুজিবকে ক্ষমতাচ্যূত করা হবে। তারপরে তাকে আটক রাখা হবে ঢাকা কেন্টনমেন্টে। এ ব্যপারে সে তাজুদ্দীনের সমর্থন চাই। জিয়া নিজে থেকে আমার কাছে আসেনি তাকে পাঠানো হয়েছিল তা বেশ বুঝলাম। এ রকম একটা প্রস্তাবে আমার কি প্রতিক্রিয়া হয় বুঝতে। আমি অবশ্যই সঙ্গে সঙ্গে জিয়ার কথা মুজিবকে জানিয়ে দিই। মুজিব কি বললেন? বুঝতে পারলামনা মুজিব আমাকে বিশ্বাস করলেন কিনা।" বঙ্গবন্ধুকে হত্যা ষড়যন্ত্রের জিয়ার জড়িত থাকার আর একটি প্রমান হল বঙ্গবন্ধুর স্বঘষিত খুনী স্বয়ং ফারুক রহমানের এন্টনি ম্যাসকার্নহাসকে দেয়া সাক্ষাৎকার। তাতে তিনি বলেছেন তার কথারউদৃতি দিয়ে বলি "আমাদের লীড করার জন্য জিয়াই ছিল মতাদর্শগতভাবে যোগ্যতম ও বিশ্বস্থ ব্যক্তি। তার সাথে দেখা করলাম ২০শে মার্চ(৭৫সাল)।জেঃ জিয়া বললেন, একজন সিনিয়র অফিসার হিসাবে আমি তোমাদের এই টীমে সক্রিয় হতে পারি না। তোমরা জুনিয়ার অফিসাররা ব্যপারটা চালিয়ে যাও। লনে হাঁটতে হাঁটতে ফারুক তখন বলল, স্যার আমরা প্রফেসনাল সোলজার, আমরা প্রফেসনাল কিলারের মত কোন একক ব্যক্তিকে সার্ভ করবনা। আমরা আপনার আর আপনার মতাদর্শের বিজয় দেখতে চাই। এ মিশনে আপনার সমর্থন ও নেতৃত্ব অনিবার্য "(Interview with it ccls Farooq and Rashid broatcast by ITV on 2 august,1976, বাংলা অনুবাদ) এথেকে বুঝা যায় যাতে ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হলে বা ধরা পড়লে যেন তার গায়ে কোন আঁচড় না লাগে আর সফল হলে তিনি যেন এর বেনিফিসিয়ারী হতে পারেন। জিয়া বঙ্গবঙ্গবন্ধু হত্যায় জড়িত থাকার আরো প্রমান আছে যা জাতির জানা উচিত, শুধু জিয়া নয় জিয়ার সাথে আরো অবাক করা কুশিলবরাও জড়িত ছিল। অশোক রায়ানার বই, "ইন সাইড দ্য হিষ্টিরী অব ইন্ডিয়ান সিক্রেট সার্ভিস এ উল্লেখ আছে, "বেগম জিয়ার বাড়ীর ট্রেস থেকে উদ্ধার করা হয় তিন ঘন্টা মিটিং এর পরে মুজিবের বিরুদ্ধে ক্যূ এর একটা স্ক্রাপ পেপার, কাগজটি যত্নসহকারে গার্ভেজ করা হলে একজন গুপ্তচর(Raw) গৃহ ভৃত্যের মাধ্যমে তা সংগ্রহ করে পরীক্ষা নীরিক্ষা করার জন্য দিল্লীতে পাঠিয়ে দিলে বঙ্গবন্ধুকে সতর্ক করে দেয়ার জন্য 'র' পরিচালক 'কাউ' পান বিক্রেতার ছদ্মবেশে বাংলাদেশে আসেন। বঙ্গবন্ধুকে বিষয়টা অভিহিত করা হলে তিনি সেটাকে যথারীতি উড়িয়ে দিয়ে বলেন ওরা আমার সন্তানের মত।" এই চিরকুটে যাদের নাম ছিল তারা হচ্ছেন জিয়াউর রহমান, মেজর রশীদ, মেজর ফারুক, জেনারেল ওসমানীও মেজর শাহরিয়ার। ( সহায়ক সূত্র-বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডে জেঃ জিয়ার দায়, এর উপর দেয়া মতামত চেনেল আই অন লাইন(৩০/১১/২০১৭,রাজেশ পাল)। বঙ্গবন্ধু হত্যায় জিয়ার এত প্রমান দেওয়ার পর কি বলা যাবে কোন প্রমান নেই? যাই হউক বঙ্গবন্ধু হত্যায় সবচেয়ে বেশী বনিফিশিয়ারী হয়েছেন জিয়া নামের কুটবুদ্ধি সম্পন্ন এ কুশলী মানুষটি। এত কিছুর পরও ইতিহাসের চরম শিক্ষা মেনে নিয়ে তাকেও মঞ্চ থেকে প্রস্থান করতে হয়েছে তারই বিশ্বস্ত একদল সেনা সদস্যের হাতে নৃশংস বেদনাদায়ক করুন মৃত্যুর মধ্য দিয়ে।বৃহস্পতিবার, ১৮ আগস্ট, ২০২২
৪র্থ পর্ব/ পাকিস্থান থেকে বাংলাদেশ “চোখে দেখা রাজনীতি”র ৪র্থ পর্বে বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন থেকে ১৫ই আগষ্ট পর্যন্ত
স্বাধীন বাংলাদেশ পর্ব
১৯৭১ সালের ১৬ ই ডিসেম্বর। বাংলা দেশ আজ থেকে একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশ, এখন আর কোন বিদেশীকে শাসক মেনে ভৃত্যের মত নত শিরে চলতে হবেনা। নিজেদের দেশ নিজেরা গড়ে তুলবে নিজেদের নেতা নিজেরা নির্বাচিত করবে, নিজেদের ভাগ্য নিজেরাই পরিবর্তন করবে।
১৬ই ডিসেম্বর সেই মাহেন্দ্রক্ষণ এই ১৬ ই ডিসেম্বর মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় বাহিনীর যৌথ কামান্ডের নিকট ঢাকায় আত্ম সমর্পন করেছিল নিয়াজীর নেতৃত্বে পাক বাহিনী। তারপর ২২শে ডিসেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে পর্যায়ক্রমে পািকস্থানী সৈন্যরা আত্ম সমর্পন করতে থাকে।
এদিকে ১৯৭১ সলের ২২শে ডিসেম্বর বাংলাদেশ সরকার স্তানান্তরিত হয়ে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজ উদ্দীন সহ সকল মন্ত্রী এক যোগে ঢাকায় ফিরে আসেন। ২৩শে ডিসেম্বর বাংলাদেশের প্রথম মন্ত্রীসভার বৈঠক অনুষ্টিত হয়।
ঢাকায় এসে মন্ত্রী পরিষদের প্রদান কাজ হল আইন শৃঙ্খলা পরিস্তিতির উন্নতি, বেসামরিক প্রশাসন পুনঃপ্রতিষ্টা এবং পাকিস্তানী কারাগার থেকে বঙ্গবন্ধুকে মুক্ত করে আনা।
নয় মাস যুদ্ধের পর এখন মুক্তি যুদ্ধের শেষ, প্রত্যাশা ছিল উদ্বাস্তু হয়ে যে এক কৌটি শরনার্থী ভারতে যেতে বাধ্য হয়েছিল তারা আবার দেশে ফিরে আসবে, যে কৃষকেরা মুক্তি যুদ্ধে অংশগ্রহন করেছিল তারা আবার তাদের কৃষি কাজে ফিরে যাবে। যে শ্রমিকেরা মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহন করেছিল তারা কলকারখানায় কাজে যোগদান করবে, যে ছাত্র-শিক্ষক মুক্তি যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল তারা তাদের লেখা পড়া আর শিক্ষকতার কাজে নিয়োজিত হবে।
তেমনি মুক্তিযুদ্ধা প্রান্ত ও তার বন্ধু বান্ধব যারা মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহন করেছিল তাদেরও প্রত্যাশা ছিল তাদের অস্ত্র জমা দিয়ে আবার লেখা পড়ায় ফিরে গিয়ে পাঠে মনযোগী হবে।
কিন্তু দীর্ঘ নয় মাসের যুদ্ধে সারা দেশ আজ বিরান ভূমিতে পরিনত হয়েছে। ঘর বাড়ী, কল কারখানা, দোকান পাট, রাস্তাঘাট সব বিধ্বস্ত। চারিদিকে ধংষস্তুপ আর ধংষস্তুপ। কি করে তারা স্ব স্ব কাজে ফিরে যাবে? কি করে এক কৌটি স্বরনার্থী তাদের জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ধংষ করে দেওয়া বসত বাড়ীতে আশ্রয় নেবে? সঙ্কট আর সঙ্কট। দেশের অর্থনীতি পুরোপুরি ধংষ। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পুরোপুরি শূন্য। খাদ্য গুদাম গুলো একেবারেই খালি। এত সব পর্ব্বত প্রমান সমস্যা আর সঙ্কট মাথায় নিয়ে বাংলাদেশের নতুন সরকারের যাত্রা শুরু। তার উপর সদ্য প্রসূত বাংলাদেশকে নিয়ে দেশীয় পরাজিত শত্রু আর পাক-মার্কিন আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র। যা দেশের স্তিতিশীলতার প্রতি হুমকী হয়ে দাঁড়ায়।
এ রকম এক পরিস্তিতির মধ্যে ১০ই জানুয়ারী ১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধু পাকিস্থান থেকে মুক্তি পেয়ে বাংলাদেশে ফিরে আসল। বাংলা মা আবার ফিরে পেল তার হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ সন্তানকে।
বঙ্গবন্ধু দেশে ফিরে এসে সম্পূর্ণভাবে দেশ পূর্নগঠন কাজে আত্ম নিয়োগ করলেন। তিনি স্বল্প সময়ে বিধ্বস্ত যোগাযোগ ব্যবস্থা সহ চট্টগ্রাম ও চালনা বন্দরের কার্যক্রম পুনরুদ্ধার করেন। এক কৌটি স্বরনার্থীকে পুনর্বাসিত করেন। শহীদ পরিবারকে আর্থিক সহায়তা, তিন লক্ষ বীরঙ্গনা নারীর পুনর্বাসন, পঙ্গু মুক্তিযুদ্ধাদের বিদেশে চিকিৎসা, তিন মাসের মধ্য ভারতীয় বাহিনীর প্রত্যাবর্তন, দশ মাসের মধ্যে জাতিকে একটি সংবিধান এবং ১৯৭৩ সালে একটি সাধারন নির্বাচন দেন। কিন্তু এতসব সফলতার মধ্যেও অদক্ষ ও দূর্নীতিগ্রস্ত প্রশাসন, চারিদিকে চুরি ডাকাতি হত্যা রাহাজানি, আইন শৃঙ্ক্খলার অবনতি, ইত্যাদী বঙ্গবন্ধুর জনপ্রিয়তাকে অনেকটা ম্লান করে দেয়। তার সাথে যোগ হয় বন্যায় ফসলহানি। ফলে দেখা দেয় খাদ্য ঘাটতি, হু হু করে বাড়তে থাকে চালের দাম। সে সময় বাংলাদেশের মত নতুন রাষ্টের ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামোয় এত সব মোকাবেলা করে বাজার ব্যবস্থা নিয়ন্তন করা ছিল এক দূঃসাধ্য ব্যপার। এ জন্য মোটেই প্রস্তুত ছিল না নব্য নিয়োগপ্রাপ্ত সরকারী কর্মকর্তারা। তার উপর ছিল পুরানো দূর্নীতিগ্রস্ত প্রশাসন। ফলে দেখা দিতে থাকে দুর্ভিক্ষ। একসময় এ দুর্ভিক্ষ চরম আকার ধারন করে হাজার হাজার মানুষ নাখেয়ে মরতে থাকে। সারাদেশে খোলা হয় লঙ্গর খানা। এর ফলে তাঁর অর্জিত সব সফলতা ম্লান হয়ে য়ায়। পাক মার্কিন ষড়যন্ত্র চলতে তাকে বঙ্গবন্ধুকে উৎখাতের জন্য। তার সাথে যোগ দেয় দলীয় ষড়যন্ত্রকারীরাও। এ ষড়য়ন্ত্রকারীদের নেতা ছিলেন খোন্দকার মুশতাক আহমেদ। মুশতাকের সাথে শেখ সাহেবের নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব সেই পাকিস্থান আমল থেকে। কিন্তু শেখ সাহেবের বিশাল ব্যক্তিত্বের কাছে তাকে বার বার হার মানতে হয়েছে। মুক্তি যুদ্ধের সময় শেখ সাহেবের অনুপস্তিতিতে মুশতাক এবং তার চরম ডান পন্তীরা তাজ উদ্দীনের নেতৃত্ব সহজে মেনে নিতে পারেন নি। তিনি নিজে এবং শেখ মনিকে দিয়ে বার বার তাজউদ্দীনকে অপদস্ত করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধু জানতেন তাজুদ্দিনের মত লিবারেল ঘরনার নেতৃত্বই পারবেন তাঁর অবর্তমানে স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতৃত্ব দিতে। সেজন্য তিনি তার উপরই আস্থা রেখেছিলেন। সে কারনে মুশতাক বঙ্গবন্ধুর উপর ভিতরে ভিতরে রুষ্ট ছিলেন। কিন্তু তিনি তা কোন দিনই বাইরে প্রকাশ করেন নি। তবে সারা মুক্তিযুদ্ধ ব্যাপী তিনি তাজ উদ্দীনের উৎখাতেই লেগে ছিলেন। '১৯৭১ সালে বিশ্ব জনমত গঠনের উদ্দ্যেশ্যে ইন্দিরা গান্ধী যখন যুক্তরাষ্ট্র সফরে গিয়েছিলেন তখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নিক্সন তাকে নাকি জানিয়েছিলেন মুজিবকে বাঁচাতে চাইলে বাঙ্গালীদের স্বাধীনতার দাবী ছাড়তে হবে। এরকম একটা গুজব চারিদিকে ছড়িয়েছিল। উল্লেখ্য তিনি বিভিন্ন দেশ ঘুরে দেশে ফিরে এলে ভারতে অবস্থানরত প্রবাসী সরকারের প্রধান মন্ত্রী তাজ উদ্দীন সহ (মোশতাক ছাড়া) আওয়ামী লীগের নেতৃস্থানীয়দের দিল্লীতে ডেকে পাঠান। ফলে এ গুজব আরো ডালপালা মেলে।(পরে জানা যায় এ গুজবের জনক ছিল আওয়ামীলীগ নেতা নুরুল ইসলাম ও ওসমানী সাহেবের পিআরও নজরুল ইসলাম) মোশতাক যখন এ খবর শুনেন (মুশতাকও এ গুজবে জড়িত ছিল কিনা কে জানে) তিনি তখন হু হু করে কাঁদতে শুরু করলেন। --------এর পর পুরা সিনেমা ষ্টাইলে চিৎকার করে বলতে থাকেন, "না না এটা কিছুতেই হতে দিতে পারিনা আমরা।" ( অর্থাৎ মুজিবের জীবন রক্ষার জন্য স্বাধীনতার ব্যপারে তিনি আপোষ করতেও রাজি) তার এ অভিনয় দেখে মনে হয়েছিল তিনি মুজিব প্রেমে উছলে পড়ছেন। কিন্তু বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। এর আড়ালে ছিল এক ভয়াবহ চক্রান্ত। মোশতাজ তার কর্মকান্ড ও চক্রান্তকে জাস্টিফাইড করার জন্য এ সব ব্যবহার করছিলেন মাত্র।' এখানে উল্লেখ্য যে এর কিছুদিন পর মুশতাক তার পররাষ্ট্র সচীব মাহ্বুবল আলম চাষীকে দিল্লীর মার্কিন দূতাবাসে পাঠান। সেখানে তার যুক্তরাষ্ট্রে গমনের ইচ্ছা এবং ভিষা সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। পরে মাসের শেষের দিকে কুমিল্লার সংসদ সদস্য জহিরুল কাইয়ুম মোশতাকের প্রতিনিধি হিসাবে কলকাতায় মার্কীন দুতাবাসে যোগাযোগ করে ইংগীত দেয় যে প্রবাসী সরকার মুজিবের মুক্তির বিনিময়ে প্রয়োজনে স্বাধীনতার প্রশ্নে ছাড় দিতে রাজী আছে। এটা ছিল স্বাধীনতা অর্জনের পথে চরম কুঠারাঘাত। কিন্তু প্রধান মন্ত্রী তাজ উদ্দীনের চরম দৃড়তায় তার এদূরভিসন্ধি ভন্ডুল হয়ে যায়। তিনি শিলি গুড়িতে আওয়ামীলীগের কনফারেন্সে দৃড় কন্ঠ বলেন " আমার স্তির বিশ্বাস বাঙ্গালী জাতির গলায় গোলামীর জিঞ্জির পরিয়ে দেবার পরিবর্তে তিনি(বঙ্গবন্ধু) বরং ফাঁসীর রজ্জু গলায় তুলে নেবেন হাসি মুখে। এই মূহুুর্তে আমাদের স্বাধীনতা ছাড়া আর কোন বিকল্প নাই। বাঙ্গালীকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য বঙ্গবন্ধুকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য আমরা স্বাধীনতা চাই। স্বাধীনতা ছাড়া বঙ্গবন্ধুর আর কোন অস্তিত্ব নেই। আর পরিচয় নেই। স্বাধীন বাংলাদেশ মানে বঙ্গবন্ধু, গোলামীর পরিচয় নিয়ে বঙ্গবন্ধু কোন দিন পরাধীন পূর্ব পাকিস্থানে ফিরে আসাবেনা। ( মুক্তি যুদ্ধের অন্তর্ঘাত পর্ব, জন্ম যুদ্ধ-৭১) স্বাধীনতার পর তাজ উদ্দীন এবং বঙ্গবন্ধু তাকে ক্ষমা করে দিলেও তার ষড়যন্ত্র থেমে থাকেনি। বরং চলতেই থাকে সেই মাহাবুব উল আলম চাষী এবং তাহের উদ্দীন ঠাকুরদের নিয়েই। অন্যদিকে মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতিকালীন সময়ে ছাত্রলীগের বাঙালীরাষ্ট্র প্রতিষ্টার অগ্রগামী চিন্তার ধারক একটি গ্রুপ এবং ছাত্রলীগের অভ্যন্তরে সমাজতন্ত্রের আদর্শে অনুপ্রানিত আর একটি গ্রুপ মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী বাংলাদেশে ১৯৭২ সালে ছাত্রলীগের কাউন্সিলকে কেন্দ্র করে দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়ে। এরপর সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী ছাত্রলীগের অনুশারীরা ১৯৭২ সালের ৩১ অক্টোবর জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জাসদ গঠন করে। ৯নং সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার মুক্তিযুদ্ধা মেজর জলিলকে সভাপতি এবং ডাকসূর সাবেক ভিপি ও ছাত্র নেতা আ স ম আব্দুর রবকে সাধারন সম্পাদক করে দলটির প্রথম কমিটি গঠন করা হয়।এ রকম এক জটিল রাজনৈতিক আবর্ত, তার উপর বিধ্বস্ত অর্থনীতি, স্বাধীনতা বিরুধীদের তৎপরতা, সিরাজ শিকদারদের মত অতি বিপ্লবীদের অন্তর্ঘাত মূলক কার্যকলাপ। তাজ উদ্দীনের সাথে বঙ্গবন্ধুর ভূল বুঝাবুঝি। তাছাড়া উচ্ছাঙ্খাকী জিয়াউর রহমানের পরিবর্তে শফিউল্লাকে সেনা প্রধাণ হিসাবে নিয়োগ দেয়ায় অসন্তুষ্ট জিয়া ষড়যন্ত্রকারী ফারুক রশীদের সাথে হাত মিলিয়ে প্রাসাদ ষড়যন্ত্রে মেতে উঠে নেপথ্যে থেকে কলকাঠি নাড়ানো। এত সব জঠিল পরিস্তিতিতে কে শত্রু কে মিত্র তা বুঝে উঠতে সক্ষম হননি বঙ্গবন্ধু, এরকম ঘোলাটে অবস্থায় তিনি তার নিজের দলের মধ্যে ঘাপটি মেরে থাকা শর্শের ভূত দেরও চিহ্নিত করে তাড়াতে অবহেলা করেছেন। বুঝে উঠতে পারেননি তার চরম শত্রুদের। তাহার সরলতার সুযোগে তার একান্ত ঘনিষ্ট জনেরা পাকিয়েছেন ষড়যন্ত্র।
তার সাথে যুক্ত হয়েছে দেশে তখন হঠাৎ গজিয়ে উঠা অতি বিপ্লবী কিছু সংবাদ পত্রের সরকার বিরোধী গোয়েবেলসীয় প্রচারনা। এ সকল সংবাদ পত্রে তারা প্রচার করতে থাকে বিদেশ থেকে আসা সব সাহায্য আওয়ামীলীগের লোকেরা খেয়ে ফেলছে, রিলিফের সব মাল ভারতে পাচার হচ্ছে, আওয়ামীলীগের ছেলেরা ছিনতাই ডাকাতি করে সম্পদের পাহাড় করছে। শেখ মুজিবের ছেলে ব্যাঙ্ক ডাকাতি করে পালানোর সময় আহত হয়েছে, সেনা বাহিনীকে ধংষ করা করার জন্য রক্ষী বাহিনী সৃষ্টি করা হয়েছে, সেখানে প্রচুর ভারতীয়কে নিয়োগ দয়া হয়েছে, ৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর যে সকল হিন্দুরা চলে গিয়েছিল তারা অচিরেই ফিরে আসবে আর বাড়ী ঘর দখল করে নেবে। আশ্চর্য মনে হলেও সত্য যে এসকল তথ্য জাসদের মুখপত্র 'গণকন্ঠ', ভাসানী ন্যাপের 'হক কথা' চীন পন্তীদের মুখপাত্র এনায়েত উল্লা খানের 'হলি ডে' পত্রিকাতে প্রকাশ হতে থাকে। তৎকালীন সি আই এর এজেন্ট বারিষ্টার মইনুল হোসেনও একিই প্রচারনায় অবতীর্ণ হয়েছিল।
এই সকল কারনে আওয়ামীলীগ তথা শেখ মুজিবের জন প্রিয়তায় চরম ধষ নামে, মানুষের সকল দূর্গতির জন্য আওয়ামীলীগই দায়ী বলে ভাবতে থাকে মানুষ। অনেকে এমন সিদ্ধান্তেও পৌছে যায় যে এর চেয়ে পাকিস্তানই ভাল ছিল। কেউ কেউ এও ভাবতে লাগল পাকিস্থান নামক শক্তিশালী মুসলীম দেশটিকে ভারতই বিছিন্ন করে দিল। এ সকল বিরূপ প্রচরনার মধ্যে বঙ্গবন্ধুর জন প্রিয়তা খুবই নিম্নগামী, সেই সময়ে ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারী বঙ্গবন্ধু দ্বিতীয় বিপ্লব তথা বাকশালের কথা বলেন। এবং চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে সংসদীয় পদ্ধতির পরিবর্তে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার পদ্ধতি চালু ও বহুদলীয় রাজনীতির পরিবর্তে এক দলীয় রাজনীতি তথা বাকশাল প্রবর্তন করেন। তখন দেশের কৃষক শ্রমিক মেহনতি মানুষকে বাঁচাতে, দেশকে এক প্লেট ফর্মে ঐক্যবদ্ধ করে সামনে এগিয়ে চলা ছাড়া তার কাছে আর কোন বিকল্প পথ ছিলনা। তাই রাজনীতিতে মেহনতি মানুষের প্রকৃত প্রতিনিধিত্ব করার জন্য সমাজতান্ত্রিক ধাঁছের বাকশালের প্রবর্তন করেন। বাকশাল গঠনের কারনে মুক্তি যুদ্ধের পরাজিত শত্রু, তাদের এদেশীয় দোষরসহ নিজ দল এবং দেশী বিদেশী শক্তির সূদূর প্রসারী ষড়যন্ত্রে সেনা বাহিনীর কিছু বিপদগামী কনিষ্ট সেনা কর্মকর্তার পৈচাসিকতায় ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগষ্ট স্বপরিবারে নির্মমভাবে নিহত হন বঙ্গবন্ধু।
মঙ্গলবার, ১৬ আগস্ট, ২০২২
৩য় পর্ব /“চোখে দেখা রাজনীতির” ৩য় পর্বে মুক্তি বাহিনী গঠন থেকে আত্মসমর্পন,১৬ই ডিসেম্বর
১৯৭১ সালে পাকিস্থানীরা বাঙালী নিধনে ঝাঁপিয়ে পড়লে জণযুদ্ধের আদলে শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ তথা স্বাধীনতা যুদ্ধ। এ স্বাধীনতা যুদ্ধে যোগ দেয় সেনাবাহিনী, পুলিশ, ইপিআর,সহ স্বাধারন জনগন। কয়েক মাসের মধ্যে গঠিত হয় মুক্তি বাহিনী। এ মুক্তি বাহিনী গেরিলা কায়দায় আক্রমন চালিয়ে পাকিস্থানী সেনাদের ব্যতিব্যস্ত করে তুলে। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে ভারত আমাদের অর্থনৈতিক সামরিক এবং কূটনৈতিক সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়। গণ হত্যার হাত থেকে বাঁচতে প্রায় এককৌটি মানুষ ভারতে আশ্রয় নিলে তাদের যাবতীয় ভার ভারত সরকার বহন করে।
অন্যদিকে পাকিস্তানী সৈন্যরা সারা দেশজুড়ে যখন তান্ডব চালাচ্ছিল তখন পাকিস্থানীদের সহযোহিতা করতে এগিয়ে আসে এদেশের কিছু কুলাঙ্গার মুসলীম লীগ, জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলামী, সহ প্রতিক্রিয়াশীল সাম্প্রদায়িক শক্তি। তােদর সহযোগিতায় গঠন করা হয় শান্তি কমিটি, রাজাকার, আলবদর, আল সাম্স বাহিনী। অন্যদিকে আওয়ামীলীগ সহ সকল প্রগতিশীল দল ছাত্র কৃষক শ্রমিক জনতা পালিয়ে ভারতে চলে যায় হানাদারের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রশিক্ষণ নিতে। আওয়ামী লীগ সহ স্বাধীনতার পক্ষের দল সমূহের সকল নেতা ভারতে পালিয়ে দীর্ঘ মুক্তিযুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য সংগঠিত হয়। এর ফল স্বরূপ ১৯৭১ সালের ১৭ই এপ্রিল কুষ্টিয়ার ঐতিহাসিক মুজিব নগরের অম্র কাননে গঠিত হয় অস্থায়ী মুজিব নগর সরকার। আর সারা দেশকে আটটি রনাঙ্গনে ভাগ করে কর্নেল ওসমানীকে সর্বাধীনায়ক করে সার্বিক যুদ্ধ পরিচালনা করা হয়। (মুক্তিযুদ্ধে অস্থায়ী সরকার,উইকিপিডিয়া) (স্বাধীনতা যুদ্ধ উইকিপিডিয়া)(একাত্তরে দৈনিক সংগ্রামের ভূমিকা,সুব্রত শুভ)
প্রান্তের খবর:- এদিকে সারাদেশব্যপী চলছিল পাকিস্থানী হানাদারদের অত্যাচার, হত্যাকান্ড, তাদের সহযোগিতা করে যাচ্ছিল এ দেশের কিছু কুলাঙ্গার আলবদর আল্ সামশ আর শান্তি কমিটির সদস্যরা। তারা কে আওয়ামী লীগার, কার ছেলে মুক্তি বাহিনীতে যোগ দিয়েছে, কার ঘরে সুন্দরী কন্যা আছে এ সকল কিছুর খবর পাকিস্থানী সৈন্যদের কাছে পৌঁছে দিত। প্রান্তর বাবা একে তো মুসলীম লীগার, তার উপর এলাকার মেম্বার, তাই তাকে তার এলাকার শান্তি কমিটিরও মেম্বার করা হল। এলাকার মানুষ তিনি শান্ত কমিটির মেম্বার হওয়ায় দারুনভাবে অসন্তুষ্ট ছিল। প্রান্ত ও তার বোন রুশনী এবং তাদের মা'ও তার দেশের বিরুদ্ধে গিয়ে পাকিস্থানীদের হয়ে শান্তি কমিটির মেম্বার হওয়ায় তার প্রতি খুবই রুষ্ট হলেন।
এদিকে ধীরে ধীরে সারাদেশে পাকিস্তানী সৈন্যরা ছড়িয়ে পড়ল, অন্যদিকে ভারতে পালিয়ে যাওয়া আওয়ামীলীগ সহ অন্যান্য দলের নেতারাও বসে নেই, পাকিস্থানী হানাদার কতৃক ২৫শে মার্চ গণ হত্যা ও বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষনার পর জনগন যেভাবে পাকিস্তানীদের বিরুদ্ধে বিক্ষিপ্তভাবে প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু করে তাকে সুষ্টুভাবে পরিচালনার জন্য, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন আদায়, মুক্তিযুদ্ধে প্রত্যক্ষ সহায়তাকারী ভারতের সরকার ও তার সেনাবাহিনীর সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার জন্য একটি মুক্তিযুদ্ধকালীন সরকার গঠন অপরিহার্য প্রয়োজন বলে মনে করেন আওয়ামীলীগ নেতৃত্ব। সেই অপরিহার্যতার পরিপ্রেক্ষিতে আওয়ামীলীগের প্রথম সারীর প্রবীন নেতাদের সমন্বয়ে ১৯৭১ সালের ১০ই এপ্রিল মুজিব নগর সরকার গঠিত হয়। ১৯৭১ সালের ১৭ই এপ্রিল কুষ্টিয়ার তৎকালীন বৈদ্যনাথ তলার অম্রকাননে আজকের মুজিব নগরে মুজিব নগর সরকারের মন্ত্রী পরিষদের সদস্যরা শপথ গ্রহন করেন। এ সরকার গঠনের পর পরই পাকিস্থানীদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ যুদ্ধ প্রবল থেকে প্রবলতর যুদ্ধের রূপ নেয়।
এ সদ্য গঠিত মুজিব নগর সরকার ১৯৭১ সালের ২৯শে এপ্রিল মন্ত্রী পরিষদের এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করে। এ বৈঠকে বলা হয়, "সশস্ত্রবাহিনী সম্পর্কে সিদ্ধান্ত হল যে, প্রধান সেনাপতি অফিসারদের একটি তালিকা প্রস্তুত করবেন, কমান্ডকে সমন্বিত করে কঠোর শৃঙ্খলার মধ্যে আনতে হবে। বাংলাদেশ সেনা বাহিনীতে প্রশিক্ষনার্থীদের বাছায় পর্বে যথেষ্ট সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।"
এরপর ১০ থেকে ১৭ই জুলাই সেক্টর কমান্ডারদের একটি সম্মেলন অনুষ্টিত হয়। তাতে মুক্তিবাহিনীর যুদ্ধাঞ্চল ও যুদ্ধ কৌশল সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা হয় এবং কর্ণেল আতাউল গনি ওসমানীকে মুক্তি যুদ্ধের সর্বাধিনায়ক নিয়োগ করা হয়। এবং বাংলাদেশের সকল যুদ্ধাঞ্চলকে এগারটি ভাগে ভাগ করা হয়।
অন্যদিকে ২৫শ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষনার পর ৪ঠা এপ্রিল নুরুল আমিন, গোলাম আজম, খাজা খাইরুদ্দিন সহ বারজন পাকিস্থান পন্তী নেতা পাকিস্থান সেনা বাহিনীর জেনারেল টিক্কা খানের সাথে দেখা করে বিদ্রোহীদের (মুক্তি বাহিনীর) বিরুদ্ধে সহযোগিতার নিশ্চয়তা প্রদান করেন। টিক্কা খানের সাথে আলোচনার পর এই ডানপন্তী নেতারা পূর্ব পাকিস্থানের শান্তি পুনরুদ্ধারে ১৪০ সদস্য বিশিষ্ট শান্তি কমিটি গঠন করেন। ৯ই এপ্রিল খাজা খায়রুদ্দীন ঢাকায় এক বৈঠকে প্রথম ৯৬ জন রাজাকার নিয়োগ দেন। খুলনার খান জাহান আলী রোডের এক আনসার প্রশিক্ষন কেম্পে তাদের প্রশিক্ষন দেয়া হয়। স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধরত মুক্তি বাহিনীকে প্রতিরোধ করতে জামাত কর্মী সমন্বয়ে পূর্ব পাকিস্থান জামাতের সহকারী আমির মৌলানা ইউসুফের নেতৃত্বে প্রথম রাজাকার বাহিনী গঠিত হয়।
আল বদর বাহিনী জেনারেল নিয়াজীর পৃষ্টপোষকতায় পাকিস্থান সেনা বাহিনীকে সহায়তা করার জন্য গঠিত হয়।
এই আলবদর বাহিনী ছিল সাক্ষাত যমদূত। এদের কাজ ছিল মুক্তি বাহিনীকে ধরে পাকিস্থানী বাহিনীর হাতে তুলে দেয়া আর নারী ধর্ষন, আর পাকিস্থানী বাহিনীকে নারী ধর্ষনে সহায়তা করা। তাছাড়া তাদের আরো কাজ ছিল সন্ত্রাস আর রাজনৈতিক গণ হত্যার মাধ্যমে জন গনের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্ট করা। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, স্বাধীনতার অব্যবহিত আগে দেশের শ্রেষ্ট সন্তান বুদ্ধিজীবিদের বাসা থেকে ধরে নিয়ে হত্যার মূল হোতাও ছিলেন এই আল বদর বাহিনী।
আল সামস গঠিত হয় তৎকালীন ছাত্র সংঘের কর্ণধার মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মুজাহেদী ও কাদের মোল্লার নেতৃত্বে। এরা সারা দেশে প্রচরনা এবং সামরিক বাহিনীর সাথে যোগাযোগের কাজ করতেন। কাদের মোল্লার নেতৃত্বে এরা ধৃত মুক্তিযুদ্ধাদের অত্যাচারের মাধ্যমে নানা গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্ব আদায় করতেন।
সারাদেশের মত মুক্তিযুদ্ধারের হঠাতে প্রান্তদের এলাকাতেও ঘাটি গাড়ে পাকিস্থানী সৈন্যরা। এলাকার জামাতে ইসলামী, মুসলিম লীগ সহ পাকিস্থান পন্তী স্বাধীনতা বিরুধী শক্তিসমূহ তাদের সার্বিক সহযোগিতা করে যেত। তারা স্থানীয় জামাত, মুসলীম লীগ সহ স্বাধীনতা বিরুধী দল সমূহের কর্মীদের সমন্বয়ে গড়ে তুলেছিল রাজাকার বাহিনী। এ রাজাকার বাহিনীর সার্বিক তত্ত্বাবধানে ছিল তাদের নেতাদের নিয়ে গঠিত শান্তি বাহিনী। প্রান্তর বাবাও ছিলেন শান্তি বাহিনীর একজন সদস্য। তারা সব সময় চোখ কান খোলা রাখতেন যাতে তথাকথিত দোষকৃতকারী ভারতীয় চররা এলাকায় হানা দিয়ে যেন কোন বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে না পারে। কিন্তু রাজাকার আর পাকিস্থানী সৈন্যদের নিপীড়ন অত্যাচার আর স্ত্রাস তাদের চোখে পড়ত না তারা এ সকল অনৈতিক কার্য কলাপে বরং সাহায্য করে যেত।
আজ প্রান্তর বাবা এলাকায় অবস্থান রত পাক সেনা কমান্ডার, এলাকার শান্তি কমিটির চ্যেয়ারম্যান সদস্যসহ নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের সবাইকে তার ঘরে দাওয়াত দেয়। উদ্দেশ্য পাক সৈন্যদের সুনজরে থাকা এবং এলাকার সার্বিক আইন শৃঙ্খলা পরিস্তিতি নিয়ে আলোচনা করা। যাতে মুক্তিফৌজরা এলাকায় হানা দিয়ে এলাকার আইন শৃঙ্খলা পরিস্তিতির অবনতি ঘটাতে না পারে। কারন কিছুদিন আগে শান্তি কমিটির একজন সদস্যের বাড়ীতে রাত্রে হানা দিয়ে মুক্তি বাহিনীর ছেলেরা তার কান কেটে নিয়েছে, আর শাসিয়ে গেছে পাকিস্তান প্রীতি যদি বন্ধ না করে তা হলে তাকে হত্যা করা হবে। আর একজন সদস্যকে কাফনের কাপড় পাঠিয়ে সতর্ক করে দিয়েছে এই বলে যে, সে যদি আর পাকিস্থানের পক্ষ নিয়ে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে কাজ করে তাহলে তাকে গুলির আগায় প্রাণ দিয়ে মরতে হবে। তাছাড়া কিছুদিন আগে এই মুক্তি বাহিনী তাদের দুজন রাজাকার সদস্যকে হত্যা করে তাদের রাইফেল ছিনিয়ে নিয়ে গেছে। তাদের স্পর্ধা দিন দিন এমন বেড়ে যচ্ছে যে, যে কোন সময় তারা এলাকায় অবস্থানরত দেশ প্রেমিক সৈন্যদেরও আক্রমন করতে পারে। যাই হউক সেদিন সারা দূপুর প্রান্তর বাবা অমিনুর রহমানের বাড়ীতে দূপুরের দাওয়াত সেড়ে খোশ গল্প করে কাটান পাক সেনা কমান্ডার। এবং সিদ্ধান্ত হয় মুক্তিবাহিনীর যে কোন নাশকতামূলক কার্যকলাপ কঠোর হাতে দমন করা হবে।
প্রান্ত তার বাবার এ সকল স্বাধীনতা বিরুধী কার্যকলাপ কিছুতেই সহ্য করতে পারছিলনা। চারিদিকে পাক বাহিনী ও রাজাকার আলবদরদের অত্যাচার, নারী ধর্ষন, লুঠপাট প্রান্তকে এমন বিদ্রোহী করে তুলেছিল যে, সে সিদ্ধান্ত নিল যে কোন ভাবেই হোক ভারত চলে যাবে। সেখানে গিয়ে মুক্তি যুদ্ধে অংশ গ্রহন করে এর প্রতিশোধ নেবে।
প্রান্ত কাউকে কোন কিছু না বলে গোপনে চেষ্টা করে যাচ্ছিল কিভাবে মুক্তি যুদ্ধে অংশ গ্রহন করা যায় খবর পেল তাদের পাশের বাড়ীর এক আওয়ামীলীগ নেতা গোপনে অনেক ছেলেকে মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহন করতে ভারতে নিয়ে যাচ্ছে। একদিন গোপনে সেও লোকটির সাথে দেখা করে তাকে ভারতে নিয়ে গিয়ে মুক্তি যুদ্ধে অংশ গ্রহনের সুযোগ করে দেওয়ার জন্য অনুরোধ করল। তিনি প্রথমে ইতস্ততঃ করলেন, কারন প্রান্তর বাবা একজন মুসলিম লীগার এবং শান্তি বাহিনীর সদস্য, সে কিভাবে মুক্তি বাহিনীতে অংশ গ্রহন করবে। পরে চিন্তা করল সে শান্তি কমিটির সদস্যের ছেলে হলেও সে স্বাধীনতার পক্ষের। সত্তরের নির্বাচনে সে আওয়ামীলীগের পক্ষে ভিতরে ভিতরে অনেক কাজ করেছে। এ সকল বিষয় এ নেতার মনে আছে। তাই সে তাকে প্রতিশ্রুতি দিল নিয়ে যাবার। তবে তাকে সতর্ক করলেন বিষয়টা যেন গোপন থাকে যাতে কাক পক্ষীও টের না পায়। নেতা বলল, তুমি প্রস্তুত হয়ে থাক যাতে আমি বলার সাথে সাথে তুমি যেতে পার।
সাপ্তাহ খানেক পরে নেতার সহযোগিতায় সে সীমান্ত পেরিয়ে অন্যান্য অনেক যুবকের সাথে ভারত গিয়ে পৌঁছল। সেখানে হাজার হাজার ছেলে দেশ মাতৃকার জন্য যুদ্ধ করতে শসস্ত্র ট্রেনিং নিয়ে প্রস্তুত হচ্ছে। সে অবাক হয়ে দেখল সবার চোখে মুখে প্রতিশোধের আগুন বারুদের মত দাউ দাউ করে জ্বলছে, মুক্তির কি এক অনন্য নেশা সকলের মধ্যে। দেখল 'পাতলা ডাল' আর 'মোটা চালের ভাত' খেয়ে 'কোঁচ মারা লুঙ্গী' আর গেঞ্জী পরে বনে জঙ্গলে পালিয়ে পালিয়ে হাজার হাজার বাংলার তরুন যুবা প্রৌড় নারী পুরুষ যুদ্ধ করেছে শত্রুর বিরুদ্ধে। মৃত্যু যে সব সময় তাদের তাড়া করে ফিরছে সে দিকে তাদের কোন ভ্রক্ষেপ নেই। মুক্ত বাংলাদেশ তথা স্বাধীনতাই যেন তাদের সবার কাম্য।124
এদিকে প্রান্তকে খুঁজে না পেয়ে তার বাবার বুঝতে বাকী রইলনা সে মুক্তি যুদ্ধে অংশ গ্রহন করতে ভারতে পালিয়ে গেছে। ছেলের মুক্তি যুদ্ধে অংশ গ্রহন তাকে খুবিই বেকায়দা ফেলে দিয়েছে। সে এখন তার এলাকায় অবস্থানরত পাক বাহিনীকে কি জবাব দেবে? কি জবাব দেবে শান্তি কমিটিকে? সে বিষম চিন্তায় পড়ে গেল, সবার কাছে তার বিশ্বাসের ভিত অনেক আলগা হয়ে যাবে। তাছাড়া পাক সেনা কমান্ডারও তার ছেলে মুক্তি বাহিনীতে যোগ দেয়ার খবর শুনলে কি রকম প্রতিক্রিয়া দেখায় তাও তিনি ভেবে কুল পাচ্ছিলনা। তিনি ভয়ে ভয়ে বিষয়টা বেশ কয়দিন গোপন রাখলেও পরে ছেলের মুক্তি বাহিনীতে যোগ দেয়ার কথাটা চারিদিকে ফাঁস হয়ে গেল।
শান্তি কমিটির সদস্য আমিনুর রহমানের ছেলে কি ভাবে মুক্তি বাহিনীতে যোগ দিল বিষয়টা তার বন্ধু স্থানীয় পাক কমান্ডার খুব গুরুত্বের সাথে নিল এবং শান্তি কমিটির এক বৈঠক ডাকল। বৈঠকে এব্যপারে সিদ্ধান্ত হল এক সাপ্তাহের মধ্যে আমিন সাহেব যদি তার ছেলেকে মুক্তি সংগ্রাম থেকে ফিরিয়ে আনতে না পারেন তাহলে তাকে আর শান্তি কমিটির সদস্য হিসাবে রাখা হবেনা এবং ঘোরতর পরিনতি ভোগ করতে হবে। তাকে তাদের শত্রু বলে গন্য করা হবে। আমিন সাহেব তাদের অনেক বুঝাতে চেষ্টা করলেন এব্যপারে তার কোন হাত নেই, আওয়ামীলীগের ছেলে পিলেরা তাকে ফুসলিয়ে নিয়ে গেছে। কথা দিলেন, তিনি চেষ্টা করে দেখবেন ছেলেকে ফিরিয়ে আনতে।
আমিনুর রহমান অনেক কাঠ খড় পোড়ালেন, অনেক চেষ্টা করলেন, সাপ্তাহের বেশী পার হয়ে গেল, কিন্তু ছেলেকে ফিরিয়ে আনার সব চেষ্টায় তার বিফলে গেল। সে এখন আর পাক বাহিনীর সাথে যোগাযোগ রক্ষা করার সাহস পর্যন্ত করছে না। পাক বাহিনীর কাছে বৈরী ঘোষিত হবার পর এতদিনে সে উপলব্দী করতে পারছে সারাদেশ কিভাবে এক ভীতিকর অবস্থার মধ্যে কালাতিপাত করছে সাধারণ মানুষ। এদিকে পাক বাহিনীর ভয়ে তার রাজনৈতিক সহ কর্মীরাও তাকে আর কোন সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে না। কোন যোগাযোগও রাখছেনা। তার থেকে দূরে দূরে থাকছে।
এইভাবে তার দিন অতিবাহিত হচ্ছিল ভয়ে ভয়ে। হঠাৎ একদিন গভীর রাতে আমিন সাহেবের বাড়ী ঘিরে ফেলল পাক বাহিনী। অস্ত্র নিয়ে ঘরে ঢুকে সেনা কমান্ডারসহ চার পাঁচ জন সেনা। তারা নাকি খবর পেয়েছে প্রান্ত আজ রাতে গোপনে বাড়ীতে এসেছে, সে জন্য তারা তল্লাসী করতে এসেছে। আমিন সাহেব অসহয়ের মত এ তল্লাসী প্রত্যক্ষ করছেন অস্ত্রের মুখে। কিন্তু বলার কিছুই ছিল না। অবাক লাগে কিছুদিন আগে যে কামান্ডার সাহেবকে জামাই আদর দিয়ে তার বাসায় এনে দাওয়াত খাওয়ায়েছেন, সেই কমান্ডার আজ চক্ষু লজ্জার মাথা খেয়ে অসম্মান জনকভাবে তার ঘর তল্লাসী করছে। কি ঠৌঁট কাটা এ পাকিস্থানীরা।
এদিকে চরিত্রহীন সেনা কমান্ডার মেজর জোয়ারদার তল্লাসী চালাতে গিয়ে তার মেয়ে রোশনীর দিকে চোখ পড়ে। সেদিন রুশনীকে দেখে সে মনে মনে ফন্দী আঁটে যেভাবেই হউক রুশনীকে তার চাই।
শ্বাস করতে পারছেনা। তারাও তার কাছ থেকে দূরে দূরে অবস্থান করছে। আমিন সাহেব এখন চিন্তায় চিন্তায় অসহায়ভাবে দিন কাটাচ্ছে, তার ঘরে যুবতী কন্যা তিনি জানেন পাক সৈন্যরা সুযোগে পোলে যে কোন সময় তার কন্যার উপর লুলুপআমিন সাহেব এখন পাকিস্থানের একনিষ্ট সেবক একথা আর পাক সেনারা বিশ্বাস করে না। যেহেতু তারা বিশ্বাস করে না সেহেতু তাদের পদলেহী চাঁটার দল মুসলীম লীগার, জামাত বন্ধুরাও আমিন সহেবকে বি দৃষ্টি ফেলবে। এ রকম বৈরী পরিবেশে তার এলাকায় অবস্থান করা খুবই ঝুঁকির ব্যপার। সে চিন্তা করল পরিবারসহ শহরে গিয়ে কোন এক অজ্ঞাত স্থানে আত্মগোপন করে নিজের জান আর পরিবারের মান বাঁচাবেন।
আমিন সাহেব তার চিন্তা কর্যকরী করার আগেই পরের দিন রাত এগারটা বারটার দিকে পাক সৈন্যরা এসে অস্ত্রের মুখে তাকে ও তার কন্যা রোশনীকে ধরে নিয়ে গেল সেনা কেম্পে। রাতেই জিজ্ঞাসাবাদ করা হল আমিন সাহেকে। তার ছেলে কোথায়? সে কেন পাকিস্থান রক্ষার মুখোস পরে ভিতরে ভিতরে বাংলাদেশের জন্য কাজ করছে? কমান্ডার তাকে বলল,
"সঠিক কথা যদি স্বীকার না কর তাহলে তোমার সামনেই তোমার মেয়েকে ধর্ষন করা হবে।"
আমিন সাহেব কান্না করতে করতে বলে,
"স্যার আমি সারা জীবন পাকিস্থানের সেবা করে আসছি, এ পর্যন্ত পাকিস্থান রক্ষার জন্য যা কিছু প্রয়োজন তা করছি। আমি কোনদিন পাকিস্থানের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করিনি। আমার ছেলে পাড়ার ছেলেদের পাল্লায় পরে মুক্তি যুদ্ধে গেছে আমি তা গুনাক্ষরে জানিনা, জানলে আমি তাকে যেতে দিতাম না।"
আমিন সাহেবের এক সময়ের জানে দোস্ত তার কথা বিশ্বাস করল না। আমিন সাহেব কমান্ডারকে অনেক অনুরোধ করে বললেন, "আপনি যদি আমাকে বিশ্বাস না করেন আমরা বাপ বেঠীকে একসাথে গুলি করে মেরে ফেলেন, তবুও আমার মেয়ের ইজ্জত নষ্ট করবেন না, আমাকে এত রড় শাস্তি দিবেন না।"
কমান্ডার তার কোন কথায় শুনলেন না। তার সমনেই বিবস্ত্র করে ধর্ষন করল তার মেয়েকে রুশনীকে। তারপর মেয়ের সামনে গুলি করে মেরে ফেলা হলো আমিন সাহেবকে।
আমিন সাহেবের মৃত্যুর কথা শুনে স্ত্রী পাগলিনীর মত তার রাজনৈতিক বন্ধু মুসলিম লীগার, জামাতীদের দুয়ারে দুয়ারে ধর্ণা দেয় তার স্বামীকে তো মেরে ফেলা হয়েছে অন্ততঃ এখন তার মেয়েটাকে যেন মুক্তি দেয়া হয়। কিন্তু এখন সকলে তার পর হয়ে গেছে, যারা একদিন তাদের তোষামোদ করত তারা সবাই আজ বিপদের দিনে দূরে সরে গেছে। এত চেষ্টার পরও যখন তিনি কিছুই করতে পারছিলেননা তিনি সরাসরি পাক কমান্ডারের কাছে গিয়ে তার মেয়েকে ছাড়ে দিতে অনুরোধ করলেন। কিন্তু তার সব চেষ্টা বিফল হল। তিনি স্বামী হত্যার শোক আর মেয়ে ধর্ষিত হবার লজ্জায় অল্প দিনেই এ পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে পরপারে চলে গেলেন।
প্রান্ত ভারতে মুক্তি যুদ্ধের ট্রেনিংরত অবস্থায় তার পরিবারের এ করুন বিয়োগান্ত পরিনতির কথা শুনে প্রছন্ড ব্যথা পেলেন, তার ক্রোধের আগুন দাউ দাউ করে জ্বলতে লাগল, সে পণ করল জীবন দিয়ে হলেও সে তার প্রিতৃ হত্যা ও বোনের ইজ্জত হরনের প্রতিশোধ নিয়েই ছাড়বে।
প্রান্তর বাবা মা'র মৃত্যুর পর আরো প্রায় মাস দুই চলে গেছে। প্রান্ত এখন প্রশিক্ষন নিয়ে একটি গেরিলা বাহিনীর কমান্ডার। তাকে দলবল নিয়ে বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছে অপারেশন পরিচালনার জন্য। জুন জুলাই সে চট্টগ্রাম শহরও আশ পাশে বেশ কয়েকটি দুঃসাহসিক আক্রমন পরিচালনা করে। এতে পাকিস্থানী সেনাবাহিনীর বেশ ক্ষয় ক্ষতি হয়। ১৪ই আগষ্ট পাকিস্থানের স্বাধীনতা দিবস। ওই দিন পাকিস্থানী সেনা বাহিনী অন্যান্য এলাকার মত তাদের এলাকায়ও জাঁকঝমকপূর্ণ ভাবে দিবসটি পালনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। মোক্ষম সুযোগ, যে পাকিস্থানী সেনারা তার বাবাকে হত্যা করছে, তার বোনের ইজ্জত লুন্ঠন করে বন্দী করে রেখেছে, তার মাকে তিলে তিলে দগ্ধ করে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছে তাদের কমান্ডার মেজর জোয়ারদার সহ সবাইকে উচিৎ শিক্ষা দেয়ার উপযুক্ত সময়।
১৩ই আগষ্ট রাতে অতি সন্তর্পনে পাক সৈন্যদের চোখ ফাঁকি দিয়ে ২০ জনের একটি গেরিলাদল প্রান্তর নেতৃত্বে তাদের এলাকায় অতি নির্জন স্থানে এক পরিত্যক্ত ঘরে এসে অবস্থান নেয়। সারা রাত তারা পাক সৈন্যদের ঘাটি এবং গতিবিধি পর্যবেক্ষন তথা রেকী করে। আগামীকাল চৌদ্দই আগষ্ট তাদের স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্টানের ব্যস্ততায় অতর্কিতে আক্রমনের জন্য সব কিছু প্রস্তুত করে রাখা হয়েছে। এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা। অাসল ১৪ই আগষ্ট। তখন রাত দশটা। তারা সবাই স্বাধীনতা দিবসের আনন্দে মশগুল। বাইরে রাজাকাররা তাদের পাহাড়া দিচ্ছে। এমনি সময় অতর্কিতে উপর্যপরি আক্রমনে পাকিস্থানী বাহিনী দিশেহারা। তাদের পাল্টা আক্রমনের সুযোগ না দিয়ে মুক্তিযুদ্ধারা ঢুকে পরে তাদের কেম্পে। এমনি এক অপ্রস্তুত অবস্থায় তারা কিছু বুঝে উঠতে না পেরে দিশেহারা হয়ে ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। প্রান্তর নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধারা কামান্ডার সহ পাক সেনাদের বেশীরভাগকে হত্যা করে আর বাকী গুলা এদিক ওদিক পালিয়ে প্রাণে বাঁচে। প্রান্তরা রুশনী সহ যারা বন্দী অবস্থায় ছিল সবাইকে মুক্ত করে নিয়ে পালিয়ে যায়।
দিন যত যেতে থাকে মুক্তিবাহিনী সারা দেশে সংগঠিভাবে আক্রমন চালাতে থাকে। সীমান্ত এলাকার পাক ঘাটিগুলো একটার পর একটা মুক্তি বাহিনীর দখলে চলে আসে। পাশা পাশি গেরিলা আক্রমনও তীব্র থেকে তীব্রতর হতে থাকে। এমনিতে পাকিস্থানী বাহিনী এবং তাদের সহযোগী বাহিনীর কাজ ছিল সাধারন মামুষের উপর অত্যাচার করা। দেশ প্রেমিক বাঙ্গালীদের নির্য়াতন করা। সীমান্তে ও দেশের অভ্যন্তরে মুক্তিযুদ্ধাদের প্রচন্ড আক্রমনের জবাবে তারা অত্যাচারের মাত্রা আরো বাড়িয়ে দেয়। মুক্তি বাহিনীর প্রবল প্রতিরোধের মুখে তারা দিনের বেলায়ও নিজেদের সামরিক ঘাঁটি থেকেও বের হতে ভয় পেতে লাগল। এমনি পরিস্তিতিতে পশ্চিম পাকিস্থান থেকে আরো সৈন্য তলব করা হয়।
মুক্তিযুদ্ধ যখন চরম পরিনতির দিকে ধাবিত হচ্ছে মুক্তি যুদ্ধা ও গেরিলাযুদ্ধাদের আক্রমন পাল্টা আক্রমনে পাকিস্থানী সামরিক বাহিনীর অবস্থা এতটাই সূচনীয় হয়ে পড়ে যে উপায়আন্তর না দেখে পাকিস্থান ঘটনা ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার জন্য ভারতের উপর বিমান হামলা চালিয়ে যুদ্ধকে আন্তর্জাতিক রূপ দেয়ার চেষ্টা চালায়। সে লক্ষে পাকিস্থান ৩রা ডিসেম্বর আচমকা ১১টি ভারতীয় এয়ার বাসে হানা দিলে অপারেশান চেঙ্গিসখান নামে এই যুদ্ধের সূচনা ঘঠে। ভারত মুক্তি বাহিনীর পক্ষ নিয়ে এ যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়।
ভারত ও পাকিস্থান উভয় পক্ষ পূর্ব ও পশ্চিম রণাঙ্গনে সংর্ঘষে লিপ্ত হয়। পূর্ব রণাঙ্গনে মিত্র বাহিনী ও মুক্তি বাহিনীর যৌথ আক্রমনে এবং সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফুর্ত সহযোগিতায় সারা দেশে একের পর এক পাকিস্থানী ঘাটির পতন ঘটতে থাকে। যৌথ বাহিনী ধীরে ধীরে ঢাকার দিকে এগিয়ে যেতে থাকে। যুদ্ধ ঘোষনার মাত্র তের দিনের মাথায় ১৬ই ডিসেম্বর যৌথ বাহিনীর নিকট পর্যোদস্ত ও হতোদ্যম পাকিস্তানী বাহিনী ৯৩০০০হাজার সৈন্যসহ রেসকোর্স ময়দানে আত্মসমর্পন করতে বাধ্য হয়। এই আত্ম সমর্পনের মধ্য দিয়ে শেষ হল বাঙালীর নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের, পৃথিবীর বুকে জন্ম নিল আর একটি স্বাধীন দেশ। যার নাম বাংলাদেশ।
এদিকে চট্টগ্রামেও মক্তিযুদ্ধারা শহরের দিকে এগুতে থাকে। ভারতীয় মিত্র বাহিনী ও মুক্তি বাহিনীর চারিদিক থেকে সাঁড়াসী আক্রমনে দিশেহারা হয়ে পাক বাহিনী শহরের দিকে পালাতে থাকে। প্রান্তদের দলও ১৫ই ডিসেম্বর চট্টগ্রমের আশ পাশ হানাদার মুক্ত করে। চট্টগ্রাম শহরের প্রধান রক্ষাব্যূহে আক্রমন চালায়। সারা রাত পাক বাহিনীর সাথে মুক্তি বাহিনী ও মিত্র বাহিনীর যুদ্ধ চলে। রাস্তায় রাস্তায় যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে। অবশেষে ১৬ই ডিসেম্বর প্রান্ত সহ হাজার হাজার মুক্তি যুদ্ধা বিজয় উল্লাসের মধ্য দিয়ে বিজয়ীর বেশে চট্টগ্রাম শহরে প্রবেশ করে। হাজার হাজার জনতা হর্ষধ্বনী দিয়ে তাদের স্বাগত জানায়। দেশ স্বাধীন হয়েছে আজ লক্ষ লক্ষ শহীদের রক্ত ও হাজার হাজার মা বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে। যারা মা হারিয়েছে, যারা বাবা হারিয়েছে, যাদের মা বোন ধর্ষিতা, তারা কি এআনন্দের ভাগীদার হতে পারছে? প্রান্তও সে রকম একজন ভাগ্যবিড়ম্বিত মুক্তিযুদ্ধা। এ স্বাধীনতা তার বাবা মা কেড়ে নিয়েছে। বোনকে করেছে কলঙ্কিত। তবু তার আক্ষেপ নাই, অন্ততঃ তারা নতুন প্রজন্মের জন্য একটা স্বাধীন আবাস ভূমি অর্জন করেছে।যেখানে তারা স্বাধীনভাবে বিচরন করতে পারবে। গলা ছেড়ে গাইতে পারবে "আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি"। আর নিজেদের ভাগ্য নিজেরা গড়তে পারবে। কোন বিদেশী আর তাদের উপর রাজা হয়ে আসবেনা।
প্রান্ত তিনমাস আগে পাক হানাদার বাহিনীর কাছ থেকে উদ্ধার করে তার বোনকে যাদের জিম্মায় দিয়ে গিয়েছিল সেখান থেকে নিয়ে আসল নিজের কাছে। বিধ্বস্ত বিপর্যস্ত রুশনী আজ আর আগের মত নেই। বেঁচে থেকেও সে জীবমৃত। প্রান্ত লক্ষ করল রুশনী শুধু আজ একা নয়। রুশনীর ভিতর বাসা বেঁধেছে আরেক অস্তিত্ব। যে অস্তিত্বের ধমনীতে বইছে পাক হানাদারের রক্ত। প্রান্তু ভেবে অস্তির কি করবে সে। আমাদের যে সমাজ ব্যবস্থা মানুষ ত বুঝতে চাইবেনা কোন্ পরিস্থিতিতে আজ তার বোনের এ অবস্থা হয়েছে। প্রান্তু সিদ্ধান্ত নিল রুশনীর সাথে কথা বলে এ অনাগত সন্তানকে সে নষ্ট করে ফেলবে।
স্বাধীনতার মাস খানেক পর প্রান্ত একদিন সুযোগ বুঝে রুশনীকে কথাটা পাড়ল। প্রান্ত ভাবেনি রুশনী এভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে। রুশনী কিছুতেই এ অনাগত যুদ্ধ শিশুকে নষ্ট করতে রাজি হল না। তার মধ্যে জেগে উঠল নারীর স্বাসতঃ মাতৃত্ব। একজন নারী হয়ে সে কিছুতেই তার পেটে ধারন করা সন্তানকে হত্যা করতে দিতে চাইছে না। হউকনা সে অবাঞ্চিত। সে ত কোন দোষ করেনি। প্রান্ত তার আদরের বোনের ইচ্ছার অবমূল্যায়ন করেনি। তবে সে একটা শর্ত দিয়েছে এ সন্তান সে রাখতে পারবেনা। এ সন্তানকে যাতে সুন্দরভাবে গড়ে তুলে এরকম একজন দম্পতিকে দত্তক দিয়ে দিতে হবে। রুশনীর সন্তানের প্রতি মমতা ভায়ের অনুরোধের কাছে হার মানতে হল। সে তার প্রস্তাবে রাজি হল।
আরো মাস দুয়েক কেটে গেছে, রুশনী জন্ম দিল তার সে
অবাঞ্চিত যুদ্ধ শিশুর। রুশনীকে ভায়ের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে গিয়ে সে শিশুকে দত্তক হিসাবে তুলে দিল এক বৃটিস দম্পতির নিকট। রুশনীর নাড়ী ছেড়া ধন অবাঞ্চিত বলে চলে গেল অন্যকে মা ডাকতে। অন্যের স্বপ্নিল জগৎকে আলোকিত করতে। রুশনী ভাবে পৃথিবীটা কত বিচিত্র! একজনের কামনার আখাঙ্খা মিটাতে কত নারীকে বলী হতে হয় সমাজ নামক খর্গের নীচে। আবার সে সুযোগ কাজে লাগিয়ে আর এক নিঃসন্তান দম্পতির স্বপ্ন রঙিন হয়। আর এক জনের বুক ভরে উঠে। দুনিয়াটা এ রকমই জোয়ার ভাটার খেলা।
নব জাতককে দত্তক দিয়ে রুশনীর মন খুবই বিষন্ন হয়ে গেল। জন্মের পর মাত্র মাস খানেক কাল দেখা শিশুটি তার চোখে সারাদিন ভাসছে, যেন তাকে মা মা করে ডাকছে। তার স্তন্য পান করতে কান্না করছে। সে কাছুতেই ভূলতে পরছেনা তার জঠরে বেড়ে উঠা সে যুদ্ধ শিশুটিকে।
আজ সকাল সকাল প্রান্তকে একটু বের হতে হচ্ছে জরুরী কাজে। রুশনীকে বলে গেছে তার জন্য অপেক্ষা না করে তার খাবার খেয়ে নিতে।
প্রান্ত সারা দিন তার কাজে ব্যস্ত, একটুও ফুরসত ছিলনা। রাত্রে বাসায় ফিরে বন্ধ দরজার সামনে রুশনীকে ডাকল দরজা খুলতে। কিন্তু কোন সারা শব্দ নেই। ব্যপার কি! ভড়কে গেল প্রান্ত। শেষ মেষ দরজা ভাংতে হল তাকে, ঘরে ডুকে দেখে রুশনী তার ঘরে শাড়ী জড়িয়ে সিলিং ফ্যানে ঝুলে আছে। প্রান্ত তাকে জড়িয়ে ধরে বাঁচানোর চেষ্ট করলেন। কিন্তু তখন সে আর এ জগতে নাই। নিথর দেহ হিম শীতল হয়ে ঝুলে আছে সিলিং ফ্যানে।
অনেক রক্ত, অনেক ত্যাগ, অনেক নারীর ইজ্জতের বিনিময়ে পাওয়া আমাদের এ বাংলাদেশ। প্রান্তদের মত অনেক পরিবার ছারখার হয়ে, মা বাবা ভাই বোন আত্মীয় স্বজন হারিয়ে আমরা পেয়েছি বাংলার এই স্বাধীনতা।
এতে সদস্যতা:
পোস্টগুলি (Atom)
২৬ তম পর্ব ২০০৬ সালে বি এন পি'র তত্ত্বাবধায়ক সরকার নাটক:
. ২০০৬ সালে বি এন পি'র তত্ত্বাবধায়ক সরকার নাটক:-২০০৬ সলের জোট সরকার মেয়াদ শেষ হলে ক্ষমতা ছাড়ার সময় অাবার দেখা দেয় দুই প্রধান দল তথা জোট...
-
তিন জোটের রূপরেখা:-মুক্তিযুদ্ধের পর আবার গোটা জাতি একটি প্লেট ফর্মে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার সুযোগ হয়েছিল। এই ঐক্যের তীব্র তোড়ে ভেসে গিয়েছিল স্বৈরাচ...
-
বঙ্গবন্ধু হত্যার ষড়যন্ত্রকারী আরেক কুশিলব বঙ্গবন্ধুর বন্ধুবেশী ঘাতক খন্দকার মুশতাক। এবার দেখুন তার নাটকের মঞ্চয়ন, একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের ...
-
খালেদা জিয়ার শাসনকাল (১৯৯১-১৯৯৬):- ১৯৯১সালে পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বি এন পি ১৪০টি আসন লাভ করে। তখন সরকার গঠনের জন্য তার আরো এগারটি আসনে...
.png)
.png)
.png)



