Pages

মঙ্গলবার, ১৮ অক্টোবর, ২০২২

২০ তম পর্ব “চোখে দেখা রাজনীতি”র এ পর্বে আছে ঳ তিন জোটের রূপরেখা

 



তিন জোটের রূপরেখা:-মুক্তিযুদ্ধের পর আবার গোটা জাতি একটি প্লেট ফর্মে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার সুযোগ হয়েছিল। এই ঐক্যের তীব্র তোড়ে ভেসে গিয়েছিল স্বৈরাচারী এরশাদের মসনদ। এআন্দোলনের নপথ্যে ছিল একটি সার্বজনীন ঘোষণা পত্র যার নাম তিন জোটের রূপরেখা। আওয়ামীলীগ নেতৃত্বাধীন১৫ দল, বি এন পি নেতৃত্ত্বাধীন ৭দল, আর জাসদের নেতৃত্বে আরো পাঁচটি বাম দল ১৯৯০ সালের ২১ নভেম্বর যৌথভাবে এ রূপরেখা ঘোষণা করেছিল। জামাত কোন জোটে না থাকলেও আন্দোলনে অংশ গ্রহন করেছিল।

নবব্বয়ের তিন জোটের রূপ রেখা যা একটা যৌথ  ঘোষনার মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়েছিল। মূলতঃ তাতে দুটি দলিল ছিল,  একটি মূল ঘোষণা একটি আচরন বিধি।

মূল ঘোষনাটি ছিল নিম্নরূপ:-

১) হত্যা ক্যূ চক্রান্তের ও ষড়যন্ত্রের ধারায় প্রতিষ্টিত স্বেরাচারী এরশাদ সরকারের কবল থেকে দেশকে মুক্ত করে স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারায় দেশে পূর্ণ গনতন্ত্র ও গনতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় প্রতিষ্ঠা কল্পে :-

ক) এক সংবিধানের ধারা অব্যাহত রেখে এরশাদ ও তার সরকারকে পদত্যাগে বাধ্য করে স্বৈরাচার ও সাম্প্রদায়িকতা বিরুধী আন্দোলনরত তিন জোটের নিকট গ্রহনযোগ্য একজন নির্দলীয় এবং নিরপেক্ষ ব্যাক্তিকে উপরাষ্ট্রপতি পদে নিয়োগ করবেন।  বর্ত্তমান সরকার ও সংসদ বাতিল করে রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করে উক্ত উপরাষ্ট্রপতির নিকট ক্ষমতা হস্তান্তর করবেন।

খ) এই পদ্ধতিতে উক্ত ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির নেতৃত্বে একটি অন্তরবর্তীকালীন তত্বাবদায়ক সরকার প্রতিষ্টিত হবে। যার মূল দায়িত্ব হবে তিন মাসের মধ্যে একটি স্বার্বভৌম জাতীয় সংসদের অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের ব্যবস্থা সুনিশ্চিত করা।

২) (ক) তত্ত্বাবদায়ক সরকারের প্রধান নির্দলীয় এবং নিরপেক্ষ হবেন। অর্থাৎ তিনি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কোন দলের অনুসারী বা দলের সাথে সম্পৃক্ত হবেন না।

  খ) অন্তর্বতী সরকার শুধু প্রশাসনের দৈনন্দিন নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনা সহ অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের লক্ষ্যে নির্বাচন কমিশন পূর্নগঠন ও নির্বাচন কার্যক্রম পূর্নবিন্যাস করবেন।

 গ) গন প্রচার মাধ্যমকে পরিপূর্ণভাবে নিরপেক্ষ রাখার উদ্দেশ্যে রেডিও টেলিভিশন সহ সকল প্রচার মাধ্যমকে স্বাধীন ও স্বায়ত্বশাসিত সংস্থায় পরিনত করতে হবে এবং নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী সকল দলের  প্রচারনার অবাধ সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।

৩)  অবাধ নিরপেক্ষ নির্বচনের মাধ্যমে নির্বাচিত

স্বার্বভৌম সংসদের নিকট অন্তরবর্তী কালীন তত্ত্বাবদায়ক সরকার ক্ষমতা হস্তান্তর করবেন। এবং এ সংসদের নিকট সরকার জবাবদিহী করতে বাধ্য থাকবে।

৪) (ক) জনগনের সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতির ভিত্তিতে দেশে সাংবিধানিক শাসনের ধারা নিরঙ্কুস ও অব্যাহত  রাখা হবে। এবং অসংবিধানিক কোন পন্তায় ক্ষমতা দখলের প্রচেষ্টা প্রতিরোধ করা হবে। নির্বাচন ব্যতীত অসংবিধানিক বা সংবিধান বর্হিভূত কোন পন্তায় কোন অজুহাতেই নির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতাচ্যূত করা যাবেনা।

খ) জণগনের মৌলিক অধিকার সংরক্ষন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা এবং আইনের শাসন নিশ্চিত করা হবে।

গ) মৌলিক অধিকারের পরিপন্তী সকল আইন বাতিল করা হবে। (২১/১১/৯০)

তিন জোটের রূপরেখায় মূল ঘোষনার সাথে একটি আচরন বিধিও তৈরী করা হয়েছিল। (সহায়ক সূত্র-,সংকট নিরসনে নব্বয়ের তিন জোটের প্রসঙ্গীকতা,যায় যায় দিন, জুলাই ৪,২০১৩,)

 এরশাদ পতনের পর প্রসিডেন্ট সাহাবুদ্দিন যে উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করেন। তাতে তাদের সততা এবং যোগ্যতা নিয়ে করো কোন প্রশ্ন ছিল না। একটা সুষ্টু অবাধ নিরপেক্ষ নির্বাচন যে অনুষ্টিত হবে সবার মাঝে সে প্রত্যয় দেখা দিল।

এদিকে এরশাদকে প্রথমে তার গৃহে আটকে রাখা হয়। বি বি সি'কে দেয়া তার এক সাক্ষাৎকারে উত্তেজনা দেখা দিলে পরে তাকে দূর্নীতির দায়ে গ্রেফতার করা হয়। গুলশানের একটি বাড়ীকে সাব জেল ঘোষনা করে তাকে পরিবার সহ থাকার সুযোগ দেওয়া হয়। পরে জনগনের চাপে তাকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে স্তানান্তর করা হয়। এই নির্বাচনে জাতীয় পার্টিকেও অংশ গ্রহনের সুযোগ দেওয়া হয়।

তত্ত্বাবদায়ক সরকার যখন নির্বাচন নিয়ে তোড়জোর শুরু করে তখন রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সরকার পদ্ধতি নিয়ে শুরু হয় তুমুল বিতর্ক। আওয়ামীলীগ সহ বেশীরভাগ দলই সংসদীয় পদ্ধতির পক্ষে মত দেয়। বি এন পি প্রেসিডেন্ট পদ্ধতির পক্ষে থাকলেও পরে অবশ্য সংসদীয় পদ্ধতির সরকার মেনে নেয়। এভাবে সব দলের অংশ গ্রহনে শুরু হয় জাতীয় সংসদ নির্বাচন।

 প্রান্তের ভাবনা :-প্রান্ত এখনো ভূলে যায়নি এরশাদ পতনের সেই স্মৃতি। তখন চট্টগ্রামের  রাজপথে নেমেছিল উল্লাসিত জনতার ঢল। জনতার উল্লাস দেখে তার মনে পড়ে গিয়েছিল ১৬ই ডিসেম্বর পাক বাহিনীর আত্মসমর্পণে জনতার সেই ঢেউ জাগা বাঁধ ভাঙ্গা উল্লাসের কথা। সেদিন তারা মুক্তিযুদ্ধারা ছিল সেই বিজয় মঞ্চের নায়ক, আর আজকে প্রান্ত ও তার বান্ধবী  ফরজানা বীথি অন্যান্য সাধারন জনতার মত আজকের বিজয় মঞ্চের দর্শকমাত্র। এসব স্মৃতি জাগানিয়া বিষয় নিয়ে ভাবতে ভাবতে প্রান্ত তার বান্ধবী বীথীকে নিয়ে শহরের সারা রাজপথ অলি গলি ঘুরে ঘুরে দেখেছে স্বৈরাচার পতনে মানুষের স্বতঃস্ফুর্ত আনন্দ উন্মাদনা। তবে তার মনে একটা শঙ্কাবোধও কাজ করছে, এ আনন্দ জানিনা কতদিন স্থায়ী হয়। নাকি স্বাধীনতার পর জনতা যে বিজয় অর্জন করেছিল, সে বিজয়ের অর্জনগুলো যেভাবে প্রতিবিপ্লবীরা ষড়যন্ত্র করে ধংষ করে দিয়েছিল সে রকমভাবে এ বিপ্লবও স্বার্থ, অর্থ, লোভ আর ষড়যন্ত্রের যাঁথা কলে পিষ্ট হয়ে আবার হারিয়ে যায়। এসব ভেবে ভেবে সারা শহর হাঁটতে হাঁটতে প্রান্ত  তার বান্ধবী বীথিকে নিয়ে চট্টগ্রাম রেলওয়ের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আধার সিআরবিতে শতবর্ষী একটি বৃহৎ বৃক্ষ ছায়া শোভিত একটি ঘন গাছের নীচে বসে অনেক ক্ষণ কথা বলল। সে কথায় আসল শিল্প, সংস্কৃতি, , সমাজনীতি, রাজনীতি। এভাবে রাজনীতির পথ বেয়ে এক সময় এসব বাস্তবতা ছেড়ে তারা দুজন চলে যায় অন্য আর এক জগতে । সে জগৎ স্বপ্নের জগৎ ভালবাসার জগৎ। এ জগতে দুজনা দুজনকে আরো কাছে বলে আবিস্কার করল, এতদিন দুজের মনের অব্যক্ত ভালবাসর কথা, যা দ্বিধা দ্বন্দ্ব আর লাজ লজ্জায় বলতে পারনি তা আজ একে অন্যকে বলছে বাঁধ ভাঙ্গা উচ্ছাসে। যে কঠিন অথচ সহজ কথা ভালবাসি আজ দুজন দুজনকে বলতে পেরেছে নির্ধিদায়। স্বৈরাচার পতনের এ দিবসে দুজনের মধ্যে যে ভালবাসার ভিত রচিত হল। তাতে দুজনে শপথ নিল তারা দুজনে দুজনার আজীবন ভালবাসার মানুষ হয়ে থাকবে। এভাবে এক স্বপ্নীল রোমান্টকতার আবহে তারা যে অনেক সময় পার করে দিয়েছে তা গুনাক্ষরেও বুঝতে পারেনি। এক সময় গাছের ডালের চড়ুই শালিকের কিচির মিচির শব্দে দুজনের শম্বিত ফিরে পায়। তখন সন্ধ্যার জাফরানী রং সারা আকাশ জুড়ে প্রান্ত এবং ফারজানার  জন্য স্বপ্নীল জগৎ তৈরী করে রেখেছে। এ স্বপ্নীল জগতে পয়চারী করতে করতে প্রান্ত এবং তার বাগদত্তা বান্ধবী ফারজানা  ফিরে আসে বাস্তবতায়। আবার চারিদিকে কোলাহল স্বৈরাচারের পতন আনন্দ, শ্লোগান, মানুষের হাঁক ডাক, ব্যস্ততা মুখর পথঘাট রাজ পথ। এ ব্যস্ততার মধ্য দিয়ে তারা ফিরে গেল যার যার গন্তব্যে।

১৯তম পর্ব “চোখে দেখা রাজনীতি”র এ পর্বে আছে নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থান এবং এরশাদের পতন

 




৯০এর গনঅভ্যুত্থান এবং স্বৈরশাসক এরশাদের পতন:-২৪শে মার্চ লেঃ জেনারেল হোসেন মোহাম্মদ এরশাদ ক্ষমতা দখল করেই সামরিক আইন জারী করেন। সেই সামরিক আইনের বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিবাদ করে ছাত্ররা।  ১৯৮৩/৮৪সালে  বেশ কয়েকটি ছাত্র সংগঠনের সমন্বয়ে গঠে উঠা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের মিছিলে সেনাবাহিনীর হামলায় জাফর, জয়নাল, কাঞ্চন, দীপালী সাহা সহ অনেক ছাত্রছাত্রী নিহত হয়। তখন থেকে এরশাদের বিরুদ্ধে লাগাতার আন্দোলন শুরু হয়। এই আন্দোলনকে গন অভ্যুত্থানে রূপ দিতে জাতিকে অনেক চড়ায় উৎরায় পার হতে হয়েছে। দীর্ঘ নয় বৎসর কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র জনতাকে লড়াই করতে হয়েছে। অসংখ্য ছাত্র শ্রমিক জনতাকে প্রাণ দিতে হয়েছে। ছাত্র জনতার এই জানবাজি লড়ায়ের শুরুতেই ৮৩ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারী ড. কামাল হোসেনের বাড়ীতে বৈঠকরত জাতিয় নেতাদের গ্রেফতার করে চোখ বেঁধে কেন্টনমেন্টে নিয়ে নির্যাতন করা হয়। সেই সাথে সারা দেশে হাজার হাজার নেতা কর্মীদের গ্রেফতার করা হয়।

১৯৮৭ সালে  সময়ের সাহসী সন্তান নূর হোসেন রাজ পথে স্বৈরাচারের ভীত কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন। "স্বৈরাচার নিপাত যাক, গনতন্ত্র মুক্তি পাক" শ্লোগান বুকে পিঠে লাগিয়ে  ১৯৮৭ সালের ১০ই নভেম্বর স্বৈরাচারী এরশাদ সরকারের পদত্যাগ ও নিরর্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধারক সরকারের অধীনে সংসদ নির্বাচনের দাবীতে ৫,৭,৮দলের অবরোধ কর্মসূচী পালনকালে মিছিলে যোগদান করেন।  সেই সময় "স্বৈরাচার নিপাত যাক, গনতন্ত্র মুক্তি পাক" বুকে লেখা এই অগ্নি স্ফুলিঙ্গের মত টকবগে তরুনকে দেখে পুলিশ গুলি চালালে  জি পি ও'র সামনে জিরো পয়েন্টে নূর হোসেন নিহত হন। তার সাথে আরো নিহত হন  নুরুল হুদা বাবুল এবং ক্ষেত মজুর নেতা আমিনুল হুদা টিটু । নুর হোসেন সহ এসকল শহীদের আত্মত্যাগে স্বৈরাচার বিরুধী আন্দোলন আরো বেগবান হয় এবং তিন জোটের আন্দোলন অপ্রতিরোধ্য গতি লাভ করে।

এক সময় মনে হয়েছিল  এই বুঝি স্বৈরাচারী এরশাদের পতন হবে। কিন্তু পতন থেকে রক্ষা পান এরশাদ।

 ১৯৮৮ সালে আ স ম আব্দুর রবদের মত দালাল জুটিয়ে এরশাদ ভোটারবিহীন নির্বাচন করে আরো কিছু দিন স্বৈরাচারী শাসন দীর্ঘায়িত করলেও এ নির্বাচনে জন রোষ এমনভাবে ফোঁসে উঠেছিল যে  এই জন রোষে এরশাদ বিরুধী আন্দোলন আবারো নতুন মাত্রা পায়। ১৯৮৮ সালে ২৪শে জানুয়ারী চট্টগ্রামে কোর্ট বিল্ডিং এর সামনে এরশাদের পুলিশ বাহিনী শেখ হাসিনাকে লক্ষ্য করে গুলি বর্ষন করলে শেখ হাসিনা প্রানে রক্ষা পেলেও  এ ঘটনায় ৩০ জন আওয়ামীলীগ নেতা কর্মী শহীদ হন।  সে সময় এরশাদ বিরুধী আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী তিন জোট, ৮,৭,৫, দল এক খাট্টা হয়ে কোমর বেঁধে আন্দোলনে নামে। নব্বই সালে এসে এই আন্দোলন আরো বেগবান ও তীব্রতা লাভ করে। এরপর স্বৈরাচারী এরশাদ বিরোধী ধারাবাহিক আন্দোলনের এক পর্যায়ে ১৯৯০ এর ১৯ অক্টোবর  তিন জোটের রূপরেখা ঘোষনা করা হয়। এ ঘোষনার পর সারাদেশে বিক্ষোভ ও গণ আন্দোলন ক্রমান্বয়ে তীব্র থেকে তীব্রতর হতে থাকে। ২৭শে অক্টোবর এরশাদের গুন্ডাবাহিনী বাংলাদেশ মেডিকেল এসোসিয়েশনের যুগ্ম মহাসচিব ডা: শামশুল আলম খান মিলনকে হত্যা করলে সারা দেশে বিক্ষোভের আগুন দাউ দাউ করে জ্বলে উঠে। অবস্থা বেগতিক দেখে এরশাদ দেশে জরুরী অবস্থা জারী করেন। আওয়ামীলীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনাকে গৃহবন্দী করেন, বি এন পি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া গ্রেফতার এরিয়ে আত্ম গোপনে চলে যান । সংবাদ পত্রের উপর সেন্সারশীপ আরোপ করা হয়।  এর প্রতিবাদে ডি এফ ইউ জে এবং ডি ইউ জের ডাকে সাংবাদিকরা এরশাদের পতন না হওয়া পর্যন্ত ধর্মঘট পালনের ঘোষনা দেন। ফলে সারা দেশে সব সংবাদপত্রের প্রকাশনা বন্ধ থাকে। সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্য, তিন দলীয় ঐক্য জোটের মিলিত আন্দোলনে জনগণ সম্পৃক্ত হলে এরশাদের সেনা সমর্থিত সরকার  একেবারে কোণঠাসা হয়ে পড়ে।  সরকার ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে ঢাকা শহরে কার্ফিউ জারী করে। কর্ফিউ ভঙ্গ করে হাজার হাজার জনতা ঢাকার রাজপথে নেমে আসে।

অবশেষে ১৯৯০সালের ৪ঠা ডিসেম্বর গণ আন্দোলনের মুখে এরশাদ পদত্যাগের ঘোষনা দেন। দীর্ঘ নয় বৎসর ধরে পরিচালিত গন অন্দোলন গনঅভ্যূত্থানে রূপ নিলে ১৯৯০ সালের ৬ই ডিসেম্বর স্বরাচারী এরশাদ পদত্যাগে বাধ্য হন।

এরশাদ পদত্যাগ করে তিন দলীয় জোটের গ্রহনযোগ্য ব্যক্তি বিচারপতি শাহাবুদিনের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে গেলে কিছুটা সাংবিধানিক জঠিলতার সৃষ্টি হয়। সে কারনে (তিন জোটের রূপরেখা অনুযায়ী)এরশাদ তাঁর তৎকালীন ভাইস প্রেসিডেন্ট বারিষ্টার মওদূদ আহাম্দকে ভাইস প্রেসিডেন্ট পদ থেকে পদত্যাগ করিয়ে সে জায়গায় বিচারপতি সাহাবুদ্দিনকে ভাইস প্রসিডেন্ট হিসাবে নিয়োগ দেওয়া হয়। তারপর ৬ই ডিসেম্বর এরশাদ পদত্যাগ করলে তার শূন্য পদে সংবিধান অনুযায়ী ভাইস প্রেসিডেন্ট সাহাবুদ্দিন প্রেসিডেন্ট হিসাবে অধিষ্টিত হন।(সহায়ক সূত্র-.তিন জোটের রূপ রেখা এবং নব্বই এর গণ অভ্যূত্থান, মাহবুব আলম, ভোরের ডাক,২৮শে অক্টোবর,২০১৫)

#১৮তম পর্ব “চোখে দেখা রাজনীতি”র এ পর্বে আছে ঳ এরশাদের শাসনকাল

 




এরশাদের শাসনকাল:-
১৯৮২ সালের ২৪শে মার্চ আব্দুস সাত্তারের নির্বাচিত সরকারকে হটিয়ে ক্ষমতা দখলের পর ২৭ শে মার্চ বিচারপতি আহসান উদ্দীন চৌধূরীকে প্রেসিডেন্ট হিসাবে নিয়োগ করেন। তবে ঘোষিত সামরিক আইনে প্রেসিডেন্টের কোন ক্ষমতা ছিলনা। সব ক্ষমতা ছিল  (Chif marshal law admistator)সি এম এল এর উপর। সি এম এল এর অনুমোদন ব্যতীত তিনি কোন ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারতেন না। এই নখ দন্তহীন প্রসিডেন্টও বেশীদিন ঠিকতে পারেননি। ১৯৮৩ সালের ১১ই ডিসেম্বর প্রেসিডেন্ট আহসান উদ্দীন চৌধূরীকে অপসারন করে জেঃ এরশাদ নিজেই প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহন করেন।

  ১৯৮৪ সালে এরশাদ স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় উপজেলা পদ্ধতি চালু করেন। উপজেলা সমূহের প্রথম নির্বাচন অনুষ্টিত হয় ১৯৮৫ সালের মে মাসে। তারপর ১৯৮৬ সালের মে মাসে এরশাদ সংসদীয় নির্বাচন দেন। এ নির্বাচনে আওয়ামীলীগ প্রথমে নির্বাচনে অংশ গ্রহন না করার ঘোষনা দিলেও পরে নির্বাচনে অংশ গ্রহন করে। বিএনপি নির্বাচন বর্জন করে। এ নির্বাচনে আওয়ামীলীগের বিজয় দেখে এরশাদ মিডিয়া ক্যূর মাধ্যমে ব্যাপক কারচুপি করে ফলাফল তার পক্ষে নিয়ে আসেন। কারচুপির মাধ্যমে এ নির্বাচনে এরশাদের জাতীয় পার্টি সংসদে নিরঙ্কুস সংখ্যগরিষ্টতা অর্জন করে। এর পর একিই বৎসর অক্টোবর মাসে প্রধান বিরুধীদল গুলোর নির্বাচন বর্জনের মধ্য দিয়ে আয়োজিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে এরশাদ তার জাতীয় পার্টির মনোনয়নে পাঁচ বছরের জন্য প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবার পর ১৯৮৬ সালের ১০ই নভেম্বর তৃতীয় জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধীবেসন আহ্বাণ করেন। সংবিধানের সপ্তম সংশোধনী আইন পাশ করে সেদিন জাতীয় সংসদ সংবিধান পুর্নবহাল করেন। এর মাধ্যমে ১৯৮২ সালের ২৪শে মার্চ তার ক্ষমতা দখল সহ সামরিক আইন বা বিধি বিধান দ্বারা সম্পাদিত সকল কাজ ও পদক্ষেপকে বৈধতা দেওয়া হয়। তবে বিরুধী দলের প্রবল আন্দোলনের মুখে ১৯৮৭সালের ৭ই ডিসেম্বর রাষ্ট্রপতি এরশাদ তৃতীয় জাতীয় সংসদ বিলুপ্ত ঘোষনা করতে বাধ্য হন। প্রধান বিরুধীদলগুলো এরশাদের দেয়া ১৯৮৮সালের ৩রা মর্চের সাধারন নির্বাচনও বর্জন করেন। এইভাবে এরশাদের অপশাসনের বিরুদ্ধে বিরুধী দলগুলোর আন্দোলন অবিরাম চলতে থাকে। অবশেষে প্রবল গণআন্দোলনের মুখে ১৯৯০ সালে এরশাদ পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।

এরশাদও স্বাধীনতা বিরুধী, সাম্প্রদায়িক শক্তি, ও বঙ্গবন্ধুর খুনীদের পুর্নবাসন করেন :-এরশাদও জিয়ার মত ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করছেন, ১৯৮৮সালে ৮ জুন  সংসদে অষ্টম সংশোধনী বিল পাশ করার মধ্য দিয়ে ইসলামকে রাষ্ট্র ধর্ম করা হয়। এতে মুক্তিযুদ্ধের অসাম্প্রদায়িক চেতনা বিশেষভাবে রাষ্ট্র কতৃক ধর্মকে প্রধান্য না দেওয়ার অঙ্গীকার দারুন ভাবে ভূলুন্ঠিত হয়। তিনি তার পূর্বসূরীর পদাঙ্ক অনুশরন করে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি, স্বাধীনতা বিরুধীদের পুনর্বাসন, বঙ্গবন্ধুর খুনীদের পৃষ্টপোষকতার ধারবাহিতা অব্যাহত রেখেছিলেন। পাকিস্থানের আইএসআই, লিবিয়া সরকার এবং মধ্যপ্রচ্যের জঙ্গী সংগঠন ব্রাদারহুডের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় ১৯৮৬সালে বাংলাদেশে ফ্রিডম পার্টির যাত্রা শুরু হয়। বাংলাদেশে ধর্মীয় জঙ্গীবাদেরও প্রত্যক্ষ তৎপরতা শুরু হয় এরশাদ আমলে বঙ্গবন্ধুর খুনীদের গঠিত ফ্রীডম পার্টির হাত ধরেই।  ১৯৮৮সালের নির্বাচনে ফ্রিডম পার্টি ১১১টি আসনে প্রার্থী দেয় এবং দুইটি আসনে জয়লাভ করে।  (বি এন পির আস্তিনের নীচে জঙ্গীবাদের ফনা,রায়হান কবির,২৯শে আগষ্ট,২০১৬, চেনেল আই অন লাইন, ২৮শেঅক্টোবর,২০১৭)

 

এরশাদের দূর্নীতি :-এরশাদ ক্ষমতায় এসেছিলেন দূর্নীতির বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষনা করে।  কিন্তু দেশে বিদেশে তিনিই চিহ্নিত হয়েছেন দূর্নীতি পরায়ন রাষ্টপতি হিসাবে। দরিদ্র দেশের ধনী রাষ্ট্রপতি এমন একটা কথা আন্তর্জাতিক মহলে এরশাদ সম্পর্কে প্রচলিত ছিল। নয় বছর দেশ শাসনে তাঁর বিরুদ্ধে ছিল সীমাহীন দূর্নীতি স্বজনপ্রীতি বিদেশে অর্থপাচার সহ নানা অভিযোগ। ১৯৮৬ সালে লন্ডনের অবজারভার পত্রিকার ৩১ আগষ্ট সংখ্যার এক প্রতিবাদনে বলা হয়, রাষ্ট্রপতি এরশাদ ক্ষমতা গ্রহনের পর তিনি আর তার স্ত্রী সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেছেন। তাঁর স্ত্রী সে সময় দেশের রাজনীতি এবং অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে এমনভাবে শংশ্লিষ্ট ছিলেন যে তাকে তখন ক্ষুদে ইমেলদা হিসবে আখ্যায়িত করা হত। সানডে করেসপনডেন্টের রিপোর্টে বলা হয় রাষ্ট্রপতি এরশাদ বৈদেশিক সাহায্যের  লাখ লাখ ডলার আত্মসাৎ করে জমা করেছেন লন্ডন, সুইজারলেন্ড, হংকং সহ মধ্য প্রাচ্যের বিভিন্ন ব্যাঙ্কে। ৮৬ সালে লন্ডন অবজারভার পত্রিকার প্রতিবেদনে বলা হয়, এরশাদ তার কিছু মন্ত্রী ও ঢাকার কিছু ব্যবসায়ীর সহযোগিতায় সীমসহীন দূর্নীতি চালিয়েছেন। বিভিন্ন ব্যবসা থেকে বিপুল অংকের পার্সেন্টইজ গ্রহন করেছেন। আমদানী, বিমান ক্রয়, বিমান বন্দর নির্মান, গ্যাস ও রাসায়নিক খাত এমন কোন খাত নেই যে খাত থেকে তিনি এবং তার স্ত্রী লাভবান হননি।

এরশাদের কিছু ভাল উদ্যোগ:-

এরশাদের আমল মূলত দেশব্যাপী উপজেলা স্থানীয় সরকার পদ্ধতি প্রবর্তনের জন্য স্বরনীয় হয়ে থাকবে। প্রেসিডেন্ট এরশাদ  স্থানীয় তৃণমূল পর্যায়ে জনগণের অনুকূলে সদ্ধান্ত গ্রহনের ক্ষমতা কার্যকরভাবে বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে প্রশাসন ও পরিকল্পনায় তাদের অংশগ্রহনের উপর গুরুত্বারোপ করেছিলেন। তাই উপজেলা গুলোকে উন্নয়ন প্রশাসনের কেন্দ্র বিন্দু হিসাবে উন্নীত করার মাধ্যমে বিকেন্দ্রীকরণের এই ধারনাকে বাস্তবে রূপ দেয়ার চেষ্টা করেছেন।

এরশাদের আর একটি সাফল্য হল দক্ষিণ এশিয়া সহযোগিতা সংস্থা সার্ক গঠনে প্রায়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের উদ্যোগকে সামনে এগিয়ে নেওয়া। ১৯৮৫ সালের ৭ই ডিসেম্বর এরশাদের আমন্ত্রণে এ অঞ্চলের রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানরা ঢাকায় একটি শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দেয়। এই প্রথম শীর্ষ সম্মেলনেই দক্ষিন এশিয়ার নেতারা সার্ক গঠনের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত গ্রহন করে। যাতে অন্তর্ভূক্ত হয় ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্থান,নেপাল, ভূটান, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ।

এছাড়া ভূমি সংস্কার, ভূমিহীন ও প্রান্তিক চাষীদের মধ্যে খাস জমি বিতরন। অপারেশান ঠিকানা নামে ভূমিহীনদের জন্য খাস জমিতে গুচ্ছ গ্রাম প্রতিষ্টা, বর্গাচাষীদের আইনগত অধিকার প্রদান ইত্যাদী জন কল্যামূলক কাজ তিনি হাতে নিয়েছিলেন। যার বেশীর ভাগই ব্যর্থতায় বর্যবসিতঃ হয় আমলাতান্ত্রিক অদক্ষতা এবং দূর্নীতির কারনে।

(Ref.বাংলা পিডিয়া, বাংলাদেশ জাতীয় জ্ঞানকোষ/এরশাদ, লেঃ জেঃ হোসেন মোহাম্মদ এরশাদ)

২৬ তম পর্ব ২০০৬ সালে বি এন পি'র তত্ত্বাবধায়ক সরকার নাটক:

 . ২০০৬ সালে বি এন পি'র তত্ত্বাবধায়ক সরকার নাটক:-২০০৬ সলের জোট সরকার মেয়াদ শেষ হলে ক্ষমতা ছাড়ার সময় অাবার দেখা দেয় দুই প্রধান দল তথা জোট...