Pages

সোমবার, ২২ আগস্ট, ২০২২

৬ষ্ট পর্ব /পাকিস্থান থেকে বাংলাদেশ “চোখে দেখা রাজনীতি”র ৬ষ্ট পর্বে বঙ্গবন্ধু হত্যায় দেশীয় ও আন্তর্জাতিক তথা পাকিস্থান আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা


 

বঙ্গবন্ধু হত্যার ষড়যন্ত্রকারী আরেক কুশিলব বঙ্গবন্ধুর বন্ধুবেশী ঘাতক খন্দকার মুশতাক। এবার  দেখুন তার নাটকের মঞ্চয়ন, একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের মূহূর্তে বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে নস্যাৎ করতে যে কয় জন দেশী বিদেশী ষড়যন্ত্রকারী ষড়যন্ত্র করেছিল সেই ষড়যন্ত্রকারীরাই ছিল পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের মূল কুশিলব।  যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালিন পররাষ্ট্র মন্ত্রী যিনি তার কুট বুদ্ধির জন্য বাঙ্গালীদের কাছে তখন থেকে আজ পর্যন্ত ঘৃনিত, বাঙ্গালীরা এখনো কুট বুদ্ধি বুঝাতে তার 'কিসিঞ্জার' নামটি ব্যবহার করে, সেই কুটবুদ্ধির  কিসিঞ্জার, পাকিস্থানের মেকিয়াভেলী রাজনীতিবিদ জুলফিকার আলী ভূট্টো, আর বাংলাদেশের মিরজাফর খ্যাত খন্দকার মুশতাক আহম্মদ, মাহবুবুল আলম চাষী, তাহের উদ্দীন ঠাকুরাই,  ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যার নেতৃত্ব দিয়েছে। যে মুশতাক বঙ্গবন্ধু প্রেমে মশগোল হয়ে ১৯৭১সালে পাকিস্থানীদের হাত থেকে বঙ্গবন্ধুকে বাঁচাতে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিনিময়ে পাকিস্থানীদের সাথে সমঝোতা করতে চেয়েছিলেন, বঙ্গবন্ধুকে বাঁচাতে না পারার শংকায় কেঁদে বুক ভাসিয়েছেন। বঙ্গবন্ধুর মায়ের মৃত্যুতে বঙ্গবন্ধুর চেয়ে বেশী কেঁদেছেন সে কুশলী অভিনেতা, আবার বন্ধুবেশী ঘাতক হয়ে ষড়যন্ত্র করে ১৫ই আগষ্ট বত্রিশ নম্বরের বাস ভবনে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার জন্য টেঙ্ক পাঠিয়ে নিজের আগামসী লেনের বাসার দোতলায় বসে প্রেসিডেন্ট হবার স্বপ্নে বিভোর হয়ে অপেক্ষা করছিলেন। শেখ মুজিবকে হত্যার পর তার লাশ বত্রিশ নম্বরের বাড়ীর সিঁড়িতে পড়ে থাকা অবস্থায় সেনা বাহিনীর পাক মার্কিন চরদের সহায়তায় গদী দখল করে প্রেসিডেন্টের শপথ নিয়েছিলেন। এই বিশ্বসঘাতক ষড়যন্ত্রকারী পাকিস্থানী চর মোশতাক স্বাধীনতার পর প্রচারনা চালিয়ে বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের সাথে  তাজউদ্দিনের ফাটল সৃষ্টি করেন এই বলে যে, তাজউদ্দীন বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্থানের কারাগারে মৃত্যু ঘটিয়ে দেশের ভাগ্য বিধাতা হতে চেয়েছিলেন। তার এ প্রচারনায় মুক্তিযুদ্ধাদের মধ্যেও তাজুদ্দিন সম্পর্কে ব্যাপক বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়। তাজউদ্দীনকে বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের প্রতি বৈরী বানিয়ে তিনি তাদের ঘাতকরূপী বন্ধু ও আপনজন সেজেছিলেন। আবার সেই আপনজন  তাদের হত্যা করে  শুধু উল্লাসই প্রকাশ করেননি, হত্যাকারীদের সূর্যসন্তান হিসাবেও আখ্যা দিয়েছিলেন। এই ঘৃন্যতম বর্বরতাকে ঐতিহাসিক প্রয়োজন মনে করেছিলেন।

কিন্তু বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য সহকর্মী তাজুদ্দীনকে বঙ্গবন্ধু থেকে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে বিচ্ছিন্ন করে মন্ত্রী সভা থেকে বরখাস্ত করতে সফল হয়েছিল সত্য, কিন্তু তাজুদ্দিন জীবন দিয়ে প্রমান করে গেছেন বঙ্গবন্ধুর প্রতি তার শ্রদ্ধা, ভালবাসা আর আনুগত্যে এতটুকু খাদ ছিলনা। কলামিষ্ট স্বদেশ রায় দৈনিক জণকন্ঠে ২০০৪ সালে ২৩শে এপ্রিল লিখেছেন, "সত্যিকার অর্থে বাংলাদেশের ইতিহাস নিয়ে যতই গবেষনা হউকনা কেন, বারবার দেখা যাবে মুজিব তাজুদ্দিন এ জুটি যেন হয়েছিল একটি নির্যাতিত জাতির ঐতিহাসিক প্রয়োজনে। শেখ মুজিবুর রহমানের মত বিশাল নেতার সাথে তাজুদ্দিন আহাম্মদের মত প্রজ্ঞাবান নেতৃত্ব ছিল প্রকৃতির অমোঘ আশির্বাদ।"

  যাই হউক যে কথা বলতে চেয়েছিলাম। ৭১এর বঙ্গবন্ধু প্রেমী মুশতাক আর ৭৫ এর বঙ্গবন্ধুর খুনী মুশতাকের মধ্যে হিসাব মিলান। হিসাব মিলালে দেখবেন আরো একটি বিষয় বেরিয়ে আসবে, মুজিব হত্যার অল্প কিছুক্ষনের মধ্যে পাকিস্থান এ খুনী মুশতাক সরকারকে স্বিকৃতি দেয়। মুজিব হত্যায় উল্লাসিত ভূট্টো বাংলাদেশের জন্য পঞ্চাশ হাজার টন চাল তার সাথে দেড় কৌটি গজ কাপড় পাঠানোরও ঘোষনা দেন। দেখুন থলের বিড়াল কিভাবে বের হয়ে আসছে। 

এখানে হিসাব আরো আছে, বাংলার শত্রু ভুট্টো কিসিঞ্জার এ সকল বিদেশী প্রভূরা বাংলাদেশের কুলাঙ্গার মোশতাক জিয়াদের দিয়ে এ হত্যাকান্ড ঘটায়। তারা শুধু বঙ্গবন্ধুকে নয়, তারা ফারুক-রশীদ-ডালিম-নূর চক্রকে লেলিয়ে দিয়ে বঙ্গবন্ধু পরিবার ও তার স্বজনদেরও নির্মম ভাবে হত্যা করে। বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ড নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষনা করা সাংবাদিক 'লিফশুলজের' মতে ''জিয়ার সুস্পষ্ট সমর্থন ছাড়া কোন দিনই মুজিব হত্যা কান্ড সফল হতো না। তাই জিয়া এ হত্যাকান্ডের ছায়া মানুষ।"

এ হত্যাকান্ডে পাকিস্থান জড়িত থাকার আরো  সুস্পষ্ট প্রমান হল, বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের পর ঢাকা বেতার কেন্দ্রে  অবস্থান কারী মেজর শাহরিয়ার তৎকালীন ঢাকা বেতার কেন্দ্রের আঞ্চলিক পরিচালক আশফাকুর রহমানকে ১৫ই আগষ্ট হত্যা কান্ডের পর  বাসা থেকে ধরে এনে বন্দুকের নল ঠেকিয়ে রেডিওতে প্রচারের জন্য যে যে নির্দেশ দিয়েছিলেন তা বঙ্গবন্ধু হত্যা কান্ডের বিচারের সময় আদালতে সাক্ষী হিসাবে তিনি যে জবান বন্দী দিয়েছিলেন তাকে থেকে বুঝা যায় পাকিস্থানের প্রতি তাদের কত দরদ। আশফাকুর রহমান বলেন "মেজর শাহরিয়ার তাকে ডেকে নিয়ে তদের(ক্যূ সংগঠনকারীদের) পলিসি কি জানিয়ে সে মত কাজ করার নির্দেশ দেন। তার নির্দেশের মধ্যে ছিল, "এখন থেকে বেতারের নাম বাংলাদেশ রেডিও হবে, বঙ্গবন্ধু, জয়বাংলা, পাকিস্থানী হানাদার বাহিনী, রাজাকার ইত্যাদী শব্দগুলা উচ্ছারন করা যাবেনা, তাছাড়া শেখ মুজিব সংক্রান্ত কোন তথ্য উচ্চারন করা যাবেনা।----" এখন হিসাব মিলালে দেখবেন তারাও পাকিস্থানীদের মত জয়বাংলা শ্লোগানে ভীত, পাকিস্তানী হানাদার আর রাজাকারদের  কুকীর্তি ধাপাচাপা দিতে উৎগ্রীব, সে লক্ষেই তারা এসব উচ্ছারন নিষিদ্ধ করেছিলেন । উল্লখ্য জিয়াও হেঁটেছিলেন সে পথে। তাহলে এ ষড়যন্ত্রকারীরা কি পাকিস্থানী প্রেতাত্মা ছিল না?

গর্ত খুঁড়লে আরো কত সাপ আর কেঁচু বের হয় তা একটু জাতিকে জানানো দরকার। আমরা জানি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে "মোর একটি ফুলকে বাঁচাব বলে যুদ্ধ করি" কালজয়ী গানের গায়ক আপেল মাহমুদ, ৭৫ সালে তিনি বাংলাদেশ বেতারের  আধিকারিক ছিলেন। তিনি বঙ্গবন্ধু হত্যার বিষয়টি আগে থেকে অবহিত ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর হত্যার পর পর তিনি বেতার কেন্দ্রে এসে মেজর ডালিমকে হাসি মুখে অভিনন্দন জানান। বেতার কেন্দ্র চালু করতে সর্বিক সহযোগিতা করেন। আপেল মাহমুদ নিজে  ডালিমকে স্কিপ্ট লিখে দেন যা ডালিমের কন্ঠে রেকর্ড করে বার বার বেতারে প্রচার করা হয়।

এখন শুনুন আর এক তথাকথিত স্বনামধন্য ব্যক্তি সূরকার গীতিকার, চলচ্চিত্র পরিচালক'ওরা এগার জন খ্যাত' খান আতাউর রহমানের কথা, বাংলাদেশ বেতারের সাবেক স্কিপ্ট লেখক জয়নুদ্দীনের লিখা থেকে জানা যায়, পূর্বালোচনা মোতাবেক সকাল দশটার দিকে বেতার কেন্দ্রে ছুটে আসেন  মুক্তিযুদ্ধের প্রচন্ড বিরুধীতাকারী খান আতাউর রহমান। তিনি দুটি গান নিয়ে আসেন, যা মেজর ডালিমের সাথে সলাপরামর্শ করে আগেই লেখা। আপেল মাহমুদের রুমে বসে নিজের লেখা এ গান দুটির সূর করেন তিনি।  গান দুটি শাহরিয়ার, মেজর ডালিম, মেজর রশীদকে সূর্য সন্তান আখ্যা দিয়ে লেখা। গান দুটি তড়ীঘড়ি রেকর্ড করে বার বার বাজনো হয়।  ( সহায়ক সূত্র -বাংলাদেশ বেতারে বঙ্গবন্ধুর খুনীদের অপারেশন,  খালেদ বিন জয়েন উদ্দীন, সাবেক স্কিপ্ট রাইটার, সহ সম্পাদক বেতার বাংলা ১১ই আগষ্ট ২০১৪, দৈনিক জনকন্ঠ)

খন্দকার মুশতাকের বিরাশি দিন:- পৃথিবীতে যেমন কিছু মহা মানবের আবির্ভাব ঘটে, সমাজ রাষ্ট্রে বিপ্লব ঘটিয়ে পৃথিবীকে উন্নতির পথে কল্যানের পথে নিয়ে যেতে, আবার কিছু কিছু বিশ্বাসঘাতক খল নায়কের সৃষ্টি হয় যারা নিজ স্বার্থে জাতীর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে প্রগতির চাকাকে পিছিয়ে দিয়ে সমাজকে নিমজ্জিত করে এক অরাজক নারকীয় পরিস্তিতিতে। তাদের বিশ্বসঘাতকতায় ক্ষতিগ্রস্ত হয় সমাজ জাতি ও রাষ্ট্র। মীর জাফরের পর বাংলার ইতিহাসে বিশ্বাসঘাতক দ্বিতীয় খল নায়ক হচ্ছে  খন্দকার মুশতাক আহমদ। এই খন্দকার মুশতাক ক্ষমতায় লোভে তার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সুহৃদ, ঘনিষ্ট বন্ধু আন্দোলন সংগ্রামের গুরু বঙ্গবন্ধুকে ষড়যন্ত্রে মাধ্যমে হত্যা করে তাঁর তাজা রক্ত মাড়িয়ে রাষ্ট্রপতির পদ দখল করেন। ক্ষমতা দখল করে বেতার ভাষনে বলেন তিনি ঐতিহাসিক প্রয়োজনে ক্ষমতা দখল করেছেন।

উল্লেখ্য যে সংবিধান অনুযায়ী প্রেসিডেন্ট নিহত হলে দায়িত্ব পাওয়ার কথা ভাইস প্রসিডেন্ট। আর তিনি অপারগ হলে দায়িত্ব বর্তায় জাতীয় সংসদের স্পীকারের উপর।  কিন্তু সবকিছু উপেক্ষা করে খুনী চক্রের সাথে হাত মিলিয়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসীন হন মোশতাক।

ক্ষমতায় এসে তিনি প্রথমে বাংলাদেশ বেতারের নাম বদলিয়ে করে দেন রেডিও বাংলাদেশ। মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনাকারী চার নেতাকে বন্দী করে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসেন চরম ডান পন্তীদের। যারা সকলেই প্রবলভাবে পাকিস্থানী রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় বিশ্বাসী। ফলে বাস্তবায়িত হতে থাকে পাকিস্থানী আদর্শ। জয়বাংলার জায়গায় চলে আসে জিন্দাবাদ। প্রচেষ্টা চলে বাংলাদেশকে সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র বানানোর। পাকিস্থানের সাথে শক্তিশালী সম্পর্ক স্থাপন, সম্ভব হলে কনফেরাশন গঠনের সম্ভাবনাও দেখা দেয়। ৭৫এর ২৬শে সেপ্টেম্বর মুশতাক এই মর্মে একটি অধ্যাদেশ বা দায়মুক্তি আদেশ জারী করেন যাতে স্বপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যার সাথে জড়িতদের কোন বিচার করা না যায়। মুস্তাকের ক্ষমতার অন্তিম সময়ে তারি নির্দেশে কারাঅভ্যন্তরে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় তার এক সময়ের আন্দোলন সংগ্রামের সাথী, রাজনৈতিক সহচর জাতীয় চার নেতাকে।

১৯৭৫সালের ৩রা নভেম্বর মুক্তিযুদ্ধা খালেদ মুশারফের নেতৃত্বে যে পাল্টা অভ্যূত্থান সংঘঠিত হয় তাতে ক্ষমতাচ্যূত হন মেজর ফারুক,রশীদ এবং মোশতাকের গড়া বিরাশি দিনের বঙ্গবন্ধুর রক্তে রঞ্জিত সরকার।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

২৬ তম পর্ব ২০০৬ সালে বি এন পি'র তত্ত্বাবধায়ক সরকার নাটক:

 . ২০০৬ সালে বি এন পি'র তত্ত্বাবধায়ক সরকার নাটক:-২০০৬ সলের জোট সরকার মেয়াদ শেষ হলে ক্ষমতা ছাড়ার সময় অাবার দেখা দেয় দুই প্রধান দল তথা জোট...