Pages

রবিবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২২

৭ম পর্ব পাকিস্থান থেকে বাংলাদেশ ঳“চোখে দেখা রাজনীতি”র ৭ম পর্বে বঙ্গবন্ধু হত্যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিবাদ




বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ড ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়:-  অনেকে বলে থাকেন বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা নিরব ছিল। মুজিব হত্যার পর ঢাকার মত ঢাকা বিশ্ববিদ্যায়ও হতবম্ব ও কিংকর্তব্য বিমুড় হয়ে পড়েছিল একথা সত্যি। কিন্তু  ছাত্ররা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন এলাকায় প্রতিবাদের চেষ্টা করেন। সারা ঢাকা শহরে কার্ফূ জারী করায় এবং কড়া সেনা টহলের জন্য তা ব্যর্থ হয়, এরপর বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ট জন হিসাবে পরিচিত বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি প্রফেসর আব্দুল মতিনকেও গ্রেফতার করা হয়, তারপর তড়িঘরি করে ঈদ ও পুজার অজুহাত দেখিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষনা করা হয়। ফলে ছাত্ররা আর সংগঠিত হতে পারেনি।

       দীর্ঘ ছুটির পর আবার  বিশ্ববিদ্যালয় খুললে রাতের আঁধারে ছাত্ররা সারা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবন  মধূর কেন্টিন,  কার্জন হল সহ সারা বিশ্ব বিদ্যালয় এলাকা পোষ্টার ও দেয়াল লিখনে ভরে দেন। তাদের লিখনের ভাষা ছিল "জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু।" এক মুজিবের রক্ত থেকে লক্ষ মুজিব জন্ম নেবে।" এরপর ঢাকায় প্রথম প্রকাশ্যে ২০শে অক্টোবর বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রকাশ্য প্রতিবাদ হয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধূর কেন্টিনের সামনে। শুধু তারা প্রতিবাদ করে ক্ষান্ত হয়নি, প্রতিবাদ সমাবেশ শেষে ছাত্ররা সারা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসও  প্রদক্ষিন করে।  ছাত্র লীগ আর ছাত্র ইউনিয়নের নেতারা এ প্রতিবাদ সভা ও মিছিলের আয়োজন করে। (সাংবাদিক অজয় রায়, সাক্ষাৎকার, ডাইচে ভেলে ১৫/০৮/১৩)

২১ অক্টোবর আবার প্রতিবাদ সমাবেশ করতে গেলে পুলিশ হামলা চালায়। এরপর ২৯শে অক্টোবর আবার প্রতিবাদ সমাবেশের ঘোষনা দিলে ক্যাম্পাসে সেনা  টহল দেয়া শুরু করে।  বিশ্ববিদ্যালয়ে তখন এক ভীতিকর অবস্থার সৃষ্টি হয় কাকে কোন সময় গ্রেফতার করা হয় তার কোন ঠিক ছিল না।  এই নৈরাজ্যকর অবস্থায় ছাত্ররা হল ত্যাগ করে দেশের বাড়ীতে চলে যায়।

প্রান্তুও অন্যান্যদের মত হল ত্যাগ করে গ্রামে  বাড়ীতে চলে যায়। ঢাকা শহরের মত তার দেশের বাড়িতেও একিই অবস্থা সাধারন মানুষ এ হত্যাকান্ডে বিস্ময়ে বেদনায় শোকে পাথর হয়ে যায়। যারা মুজিব ভক্ত তাদের অনেকের চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়েছে অশ্রুর ধারা, যারা মুজিব আমলে দুঃখ কষ্টের শিকার হয়েছিল তারা তাঁর পতন চাইলেও কিন্তু মানুষ নামের পিচাসদের এই পৈচাশিক নারকীয়তা কখনো তারা কামনা করেনি। বঙ্গবন্ধুর প্রতি রুষ্টরাও বিস্ময়ে বিমূড় হয়ে গিয়েছিল এই নারকীয়তা দেখে। তারা এভাবে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা মেনে নিতে পারেনি। তবে এতদিন গর্তে লুকিয়ে থাকা স্বাধীনতা বিরুধী পরাজিত  শত্রুরা আবার আনন্দ উল্লাসে ডগমগ করতেও দেখেছে প্রান্ত।  রাজাকাররা আবার রাজাকার পরচয় দিয়ে স্বগর্বে মাঠে নামতে শুরু করে। অন্যদিকে প্রান্তের মত মুক্তিযুদ্ধারা মুক্তিযুদ্ধা পরিচয় দিতেও ভয় পাচ্ছিল। স্বাধীনতার পক্ষের মানুষেরা চোখ মেলে শুধু দেখতে থাকল কিন্তু করার কিছুই ছিল না। চারিদিকে শুধু রাষ্ট্রীয় পৃষ্টপোষকতায় আওয়ামীলীগ আর মুিজব নিন্দা আর সমালোচনার ঝড়। আরো চলছিল অত্যাচার অবিচার।

প্রান্ত অবাক হয়ে ভাবে কিভাবে এমনটি হল, বিশ্ববিদ্যালয়ে বন্ধুদের কাছ থেকে শুনেছে বঙ্গবন্ধু ডালিমকে পুত্রবৎ স্নেহ করতেন  যে ডালিমকে তিনি পুত্রের মত স্নেহ করতেন, বঙ্গবন্ধুর শিয়রে বসে যে ডালিম তার পারিবারিক জীবনের সুখ দুখের অনুভূতি তাঁর সাথে শেয়ার করতেন, সেই ডলিমের মনের অন্ধকার দিকটি খুঁজার তাগিদ সরল বঙ্গবন্ধু কোনদিন বোধ করেন নাই। তাকে অবিশ্বাস করার মত নীচুতা তিনি দেখাতে পারেন নি। শুধু সে নয় জিয়াসহ অন্য যাদের দ্বারা ক্যূ সংগঠিত হয়েছে তাদের ব্যপারেও বঙ্গবন্ধুকে অনেক বার সতর্ক করা হয়েছিল, কিন্তু বাঙ্গালীরা তাকে মারতে পারে তিনি তা কোনদিনই বিশ্বাস করতে পারেন নাই। এ সকল বিষয় বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধুদের মুখে মুখে। তারা সবাই বঙ্গবন্ধুর সরলতার জন্য তাঁকে দুষছেন।  বঙ্গবন্ধু মানুষকে বিশ্বাস করার মাশুল এত ছড়া মূল্যে দিতে হল যে ভাবতে ভাবতে প্রান্তর মন বেদনায় ভারাক্রান্ত হয়ে গেল। তার চোখে সে আবার বঙ্গবন্ধুকে দেখতে পাচ্ছে, তাঁর যেন মৃত্যু হয় নাই, তিনি যেন আবার  বাংলার জনপদে, মাঠে, ঘাঠে ধরাজ কন্ঠে ভাষন দিয়ে যাচ্ছেন, দুখী মানুষের জন্য সংগ্রাম করে যাচ্ছেন। প্রান্তের চোখে আরো ভাষছে সেই উত্তাল উণসত্তোর, ৭০ এর নির্বাচন, যখন সারা দেশ চষে বেড়িয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। সেই অসহযোগ আন্দোলন, সেই ৭ই মার্চের অমর কবিতা নিয়ে রেসকোর্সের মাঠে বঙ্গবন্ধুর দরাজ কন্ঠের আবৃত্তি। প্রান্তের সেই স্বপ্নীল চোখ আবার যখন তম্নয়তা থেকে বাস্তবে ফিরে আসে তখন ব্যথায় কুঁকড়ে যায় তার মন, বুঝতে পারে বঙ্গবন্ধু তো আর কোনদিন আমাদের মাঝে ফিরে আসবেনা আমাদের সুখে দুখের সাথী হবেনা।

        এদিকে  ষড়যন্ত্রকারীরা মুজিব হত্যার প্রেক্ষাপটটা এমন ভাবে তৈরী করেছিল যে আওয়ামীলীগের কর্মী সমর্থকরা বুঝতে পারছিলনা কে শত্রু কে মিত্র। কারন মুজিবকে হত্যা করে মুজিব অনুশারীরাই আবার সরকার গঠন করেছে। মুশতাক, তাহের উদ্দীন ঠাকুর, শাহ মুয়াজ্জেম ধিকৃত ষড়যন্ত্রকারীরা ছাড়া আওয়ামীলীগের সব নেতাই নিথর নিস্তব্দ মৃত মানুষ যেন।

২৪শে আগষ্ট মুশতাক সরকার শফিউল্লাকে হটিয়ে জিয়াকে সেনা বাহিনী প্রধান হিসাবে নিয়োগ দেন। এবং জেঃ এরশাদকে করা হয় উপ প্রধান সেনা প্রধান। সেনা প্রধান হওয়ায় জিয়ার অনেক দিনের স্বপ্নসাধ পূর্ণ হল, আর তার উচ্ছাকাঙ্খা পুরনের অভীষ্ট লক্ষের আরো অনেক কাছাকাছি এসে পৌঁছল। অন্যদিকে আওয়ামীলীগের অনেক শীর্ষ নেতা তাজউদ্দীন, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, কেপ্টেন মনসুর আলী, এম কামরুজ্জামান, আব্দুস সামাদ আজাদসহ অনেককে গ্রফতার করা হল। পরে ষড়যন্ত্রকারীরা জাতীয় চার নেতাকে সহ অনেককে তাদের সরকারে যোগ দেয়ার প্রস্তাব দেয়। কিন্তু তারা অনেকে প্রাণ ভয়ে, অনেকে ষড়যন্ত্রের সাথে যুক্ত থাকায়, আবার অনেকে লোভে পরে খুনী মুশতাকের মন্ত্রী সভায় যোগ দেয়। কিন্তু এ চার নেতা লোভ লালসা আর মৃত্যু  ভয় উপেক্ষা করে তাদের মন্ত্রীত্বের প্রস্তাব ঘৃনা ভরে প্রত্যাখ্যান করে কারা অভ্যান্তরে থাকাটাকে শ্রেয় মনে করেছিল। এদিকে খুনী মুশতাক ও জিয়া যথাক্রমে  প্রেসিডেন্ট ও সেনা প্রধান হয়েও স্বস্তিতে ছিলেন না। তাই তারা ২৬শে সেপ্টেম্বর নিজেদের এবং আত্ম  স্বীকৃত খুনীদের রক্ষা করার জন্য জারী করে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ। যার মূল কথা হল ১৫আগষ্টের হত্যাকান্ডের বিচার বাংলাদেশের কোন আদালতে করা যাবেনা।

 মুশতাক ক্ষমতায় আসার পর যতই দিন যাচ্ছে সেনা বাহিনীতে শুরু হতে থাকল বিশৃঙ্খলা। জুনিয়র অফিসারদের কাছে সেনা বাহিনীর সিনিয়র অফিসাররা ছিল কোণ ঠাসা।  খন্দকার মুশতাক আর জেনারেল জিয়ার আশ্রয়  প্রশ্রয়ে বঙ্গভবনে ফারুক-রশীদ-ডালিমদের ঔদ্বত্বপূর্ণ আচরন দিন দিন বেড়ে যেতে থাকল যা সেনাবাহিনীর উর্ধতন অফিসারা মেনে নিতে পারছিলনা। কর্নেল জামিল বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় ৪৪নং সাক্ষী হিসাবে বলেছিলেন, "জেঃ জিয়া ২৪শে আগষ্ট সেনা প্রধান হলেও সেনাবাহিনীর চেইন অব কমান্ড ফিরিয়ে আনতে কোন চেষ্টাই করেননি বরং আস্কারা দিয়েছেন।" এই বিশৃঙ্খল পরিস্তিতিতে সিনিয়র অফিসারা চেয়েছিল বিদ্রোহী জুনিয়র সেনা কর্মকর্তাদের কেন্টনমেন্টে ফিরিয়ে নিয়ে আর্মি চেইন অব কামান্ড ফিরিয়ে আনতে। আর সেই কারনে ৩রা নভেম্বরের সেনা অভ্যূত্থান অনিবার্য় হয়ে পড়ে। তাই ১৫ই আগষ্টের খুনী অফিসারদের আর্মি চেইন অব কমান্ডে ফিরিয়ে আনতে সিজিএস খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে একটি সামরিক অভ্যূত্থান সংগঠিত হয়। এ অভ্যূত্থানে মুশতাক - ডালিম-রশীদদের নিয়োগ দেওয়া সেনা প্রধান জিয়াকে গৃহ বন্দী করা হয়। ৩রা নভেম্বরের এ অভ্যূত্থানে মুশতাক ও তার খুনী চক্র মনে করেছিল এটা আওয়ামীলীগ দ্বারা সংগঠিত সেনা  অভ্যূত্থান। তারা ভেবেছিল এ পাল্টা অভ্যূত্থানে আওয়ামীলীগ আবার ক্ষমতায় এসে এ চার েতার নেতৃত্বে সংগঠিত হবে।  সে কারনে রশীদ ডালিম মুশতাক চক্র খালেদ মোশাররফের এই অভ্যূত্থানের পর পরই এ সিদ্ধান্ত নিল যে আওয়ামীলীগকে নেতৃত্ব শূন্য করতে এ চার নেতাকে হত্যা করতে হবে। যাতে নেতৃত্ব শূন্য আওয়ামী লীগ আর ক্ষমতায় যেতে না পারে। তাই খুনী মুশতাক-রশীদ-ডালিম-ফারুকের নির্দেশে ২রা নভেম্বর রাতে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে রিসালাদার মুসলেউদ্দীনের নেতৃত্বে একটি কিলিং মিশন পাঠানো হয়। জেলখানায় গিয়ে তারা বন্দী জাতিয় চার নেতাকে তাদের হাতে তুলে দিতে বলেন। জেল কতৃপক্ষ তা করতে অপারগতা প্রকাশ করলে, স্বয়ং প্রেসিডেন্ট খন্দকার মুশতাক টেলিফোনে তাদেরকে কিলিং মিশনের হাতে তুলে দিতে নির্দেশ দেন। তারপর কিলারা তাদের এক কামরায় জড়ো করে ব্রাশ ফায়ারে হত্যা করে পালায়ে যায়। এদিকে ফারুক রশীদরা যা ভেবেছিল এটা আওয়ামীলীগ সমর্থিত অভ্যূত্থান কিন্তু তাদের অনুমান সঠিক ছিল না। যদিও বিরুদ্ধবাদীরা ষড়যন্ত্র করে এরকমই প্রচার করেছিল যে এটা ভারত সমর্থিত আওয়ামীলীগের অভ্যূত্থান।

 এদিকে যখন খুনী চক্র দেখল যে এটা আওয়ামীলীগের অভ্যূত্থান নয়, তখন অভ্যূত্থানকারী নেতাদের সাথে মুশতাক আর তার খুনী চক্রের সাথে দীর্ঘ আলোচনার হয়। আলোচনায় পর সমঝোতার ভিত্তিতে প্রেসিডেন্ট মুশতাক বৃগেডিয়ার খালেদ মোশাররফকে মেজর জেনারেল পদে উন্নিত করে সেনা প্রধান নিয়োগ করেন। তার বিনিময়ে ১৫ই আগষ্ট ও ৩রা নভেম্বরের হত্যাকান্ডে জড়িত ফারুক, ডালিম, রশীদ, নূর, পাশা গংদের মুশতাকের উদ্যোগে বিদেশে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হয়। (তখনো খালেদ মোশারফরা চার নেতা হত্যার ব্যপারে কিছুই জানতেননা)  খুনী মেজরা পালিয়ে যাওয়ার পর খন্দকার মুশতাক আর প্রসিডেন্ট থাকতে চাইলেন না, কিন্তু খালেদ মোশাররফের অনুরোধে তিনি দায়িত্ব পালন করে যান। খালেদ মোশাররফ চেয়েছিলেন রক্তপাতহীন ভাবে তার অভিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছতে। তিনি তার ভয়ঙ্কর প্রতিদ্বন্দ্বী জিয়াকে বাঁচিয়ে রেখে কেন্টনমেন্টে জিয়ার নিজের বাসায় জামায় আদরে গৃহ বন্দী করে রাখেন। তাঁকে গৃহবন্দী করে রাখার দায়িত্ব দেন আনকোরা এক তরুন কেপ্টেন হফিজউল্লাহকে। তিনি জিয়াকে বন্দী করে তার বাসার টেলিফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন সত্যি কিন্তু হাফিজ একটি ভূল কারে বসেন। তিনি জানতেন না জিয়ার বাসার বেডরুমে আর একটি টেলিফোন সংযোগ আছে। তিনি সেখান থেকে সুকৌশলে কর্নেল তাহেরকে ফোন করে খুব সংক্ষেপে বলেন "সেইভ মাই লাইফ," তাহের তার আহ্বানে সাড়া দিলেন। আর এদিকে খালেদ মোশাররফরা রক্ত পাত এড়াতে বঙ্গ ভবনে বেহুদা আলোচনা করতে করতে কি করবে না করবে দ্বিধা দ্বন্দ্বে ভোগে অনেক সময় ক্ষেপন করে ফেলেন। এমন অবস্থার সুয়োগ নিয়ে জাসদ কর্নেল তাহেরের নেতৃত্বে গোপনে গঠিত সৈনিক সংস্থা গণবাহিনীর মাধ্যমে কেন্টনমেন্টে প্রচার পত্র বিলি করে খালেদের বিরুদ্ধে সৈনিকদের  উত্তেজিত করে তোলে । ওই প্রচার পত্রের ভাষা ছিল তীব্র ও আক্রমনাত্বক, সেখানে খালেদকে বানানো হয় ভারতের দালাল। জাসদের এই কুট চালে পরিস্তিতি সম্পূর্ণ পাল্টে যায়। নড়বড়ে হয়ে যায় খালেদ মোশাররফের ভিত। ৭ই নভেম্বর জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জাসদ কর্নেল তাহেরের নেতৃত্বে খালেদ মোশাররফের বিরুদ্ধে পাল্টা আর একটি অভ্যূত্থান পরিচালনা করে যা সিপাহী জনতার অভ্যূত্থান নামে পরিচিত ।  এ সিপাহী অভ্যূত্থানে কর্নেল তাহের তথা জাসদ জিয়াকে তাদের কিছু এজেনন্ডা বাস্তয়নের অঙ্গিকার নিয়ে বন্দী দশা থেকে মুক্ত করে আনেন। আর অন্যদিকে উত্তেজিত সৈনিকদের হাতে নির্মমভাবে নিহত হন মুক্তিযুদ্ধা মেজর জেনারেল খালেদ মোশারফ, কর্নেল হুদা এবং মেজর হায়দার।

জিয়া মুক্ত হওয়ার পর তাহের এবং হাসানুল হক ইনু তার সাথে দেখা করেন। তখন পরিস্তিতি অনেক পাল্টে গেছে বন্দী জিয়া আর মুক্ত জিয়ার মধ্যে অনেক তফাৎ। এখন সবকিছু তাঁর নিয়ন্ত্রনে।  তিনি তার প্রাণ রক্ষাকারী তাহেরকে দেয়া প্রতিশ্রুতি আর রক্ষা করতে প্রস্তুত নয়।  তাহের বুঝে গেলেন জিয়া তার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। তিনিও দমে যাওয়ার পাত্র নন। তিনি বগুড়া, যশোর, রংপুর কেন্টনমেন্টে অভ্যূত্থানের প্রচেষ্ট চালায়।

জিয়াও বুঝতে পারলেন ক্ষমতায় থাকতে হলে তাহের এবং জাসদকে নিশ্চিন্ন করে দিতে হবে। সেই অনুযায়ী গ্রেফতার করা হয় তাহের সহ জাসদের সব নেতা। শুরু হয় প্রহশনের বিচার। বিচারে জাসদের অনেক নেতাকে জাবজ্জীন সহ বিভিন্ন মেয়াদে কারদন্ডে দন্ডিত করা হয়। আর জীবন দাতা অনেক দিনের বন্ধু তাহেরকে প্রহসনের বিচারে দেয়া হয় মৃত্যুদন্ড। ১৯৭৬ সালের ২১জুলাই তাহেরকে ফাঁসীতে ঝুলিয়ে মৃত্যদন্ড কর্যকর করা হয়। এভাবে জীবন দিলেন ৭ই নভেম্বরের বিপ্লবের  করিগর । নিয়তি কতই নিষ্টুর! কর্নেল তাহেরের নেতৃত্বে সংগঠিত বিপ্লবকে আজ জিয়ার দল বি এন পি পালন করছে বিপ্লব ও সংহতি দিবস হিসাবে।  

এদিকে জিয়াকে মুক্ত করার পর  অভ্যূত্থান সংশ্লিষ্ট উর্ধতন সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাদের নিয়ে একটি বৈঠক হল। বৈঠকে বিচারপতি সায়েমকে রাষ্ট্রপতি রাখার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। তাছাড়া জিয়া সহ তিন বাহিনীর প্রধানদের  ডি সি এম এ করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। জিয়ার এ সিদ্ধান্ত মনপুতঃ হয়নি। কারন উচ্ছাভিলাসী জিয়া নিজেকে সিএমএলএ (Chief marshal law administrator) হিসাবে ভোরেই রেডিওতে ঘোষনা দিয়েছিলেন (ঐ ৭১ এর ২৮ মার্চের মত)

  আবার আসা যাক প্রান্তের কাছে, প্রান্ত এখনো দেশের বাড়ীতে তার চাচার বাসায়। দেশের বিশৃঙ্খল রাজনৈতিক অবস্থায় সে এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়াকে নিরাপদ মনে করছে না, চারিদিকে এখন আওয়ামী লীগ, কমিউনিষ্ট পার্টি সহ স্বাধীনতার পক্ষ শক্তির উপর ধর পাকর চলছে। এখন তার কোন কাজ নেই বন্ধু বান্ধবদের নিয়ে আড্ডা দেয়া আর গ্রামে ঘুরে বেড়ানো ছাড়া। কিন্তু সে ভিতরে ভিতরে রাজনীতির খবরাখবর রাখছেন।  ২রা নভেম্বর রাতে খালেদ মোশাররফের যে পাল্টা অভ্যূত্থান হয়েছিল সে এ অভ্যূত্থান সম্পর্কে  রেডিওতে অবহিত হয়েছিল। তার খুব খুশী লেগেছিল, হয়তো আবার আওয়ামীলীগ তথা স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি ক্ষমতা দখল করেছে। কিন্তু প্রায় দুই তিন দিন রেডিও ষ্টেশান বন্ধ দেশের পরিস্তিতি থমতমে। এ রকম বিরজমান পরিস্তিতিতে নিশ্চয় কোন একটা অঘটন না ঘটে পারেনা যদিও এ ব্যপারে সারা জাতির মত সেও তখনো অন্ধকারে।

    দেশে ক্যূ পাল্টা ক্যূ এসব নিয়ে মানুষ বিরক্ত, মানুষ চাই শান্তিতে থাকতে। এরকম পরিস্তিতিতে মানুষ পরতপক্ষে ঘরের বাইরে যেতে চাইনা, ঘরে বসে সময় কাটায়, এ সুযোগে প্রান্তুদের পাশের বাড়ীর পুকুরে টাকার বিনিময়ে বড়সী শিকারের আয়োজন চলছিল। প্রান্তুর এক মামা তাদের কাছ থেকে দুইটা সিট ভাড়া নিয়েছে মাছ শিকারের জন্য। একটাতে প্রান্তুর মামা আর একটাতে প্রান্তু বসল। প্রায় আরো অাট দশ জন মাছ শিকারী পুকুরের সারা পাড় জুড়ে মাছ শিকারে বড়সী ফেলেছিল। অন্তু যদিও মাছ শিকার করতে এসেছে কিন্তু তার মন ভাল নেই, সে বিষন্ন মনে ভাবছে কি হচ্ছে দেশে, কোন খবর পাচ্ছি না।

রেডিও ষ্টেশনও বন্ধ। পাশা পাশি বড়সী ফেলে বসা আরো অনেক মাছ শিকারী দেশের ঘটে যাওয়া রাজনীতি নিয়ে বলাবলি করছে , এক এক জন এক এক কথা বলতে লাগল। কেউ খালেদকে সমর্থন করছে, কেউ জিয়াকে সমর্থন করছে। কিন্তু তাহেরের কথা সাধারন মানুষের তখনও মুখে শুনা যাচ্ছিলনা। কে এক জন এসে বলল পাল্টা অভ্যুত্থানের নেতা খালেদ মোশাররফ সহ আরো তিন জন সেনা অফিসার সৈনিকদের হাতে নিহত হয়েছে , আর সৈনিকরা জিয়াকে বন্দী দশা থেকে মুক্ত করে এনেছে। খালেদ মোশারফসহ আরো দুই মুক্তিযুদ্ধার  মৃত্যু সংবাদ প্রান্তকে খুবিই শোকাহত করল, যেহেতু তারা সবাই মুক্তিযুদ্ধা ।

এখবর শুনে যারা আওয়ামী লীগ বিদ্বেষী তারা খুশী হল বেশ বুঝা যায়। তারা বলতে লাগল ভারতের হাত থেকে দেশ রক্ষা পেয়েছে। আরো বুঝা গেল এ দলের বেশীর ভাগ মুসলিম লীগ পন্তী পাকিস্থানী মনোভাবাপন্ন। আর যারা আওয়ামীলীগ পন্থী তারা অনেকটা হতাস হল। তারা দোষারোপ করতে লাগল খালেদ মোশাররফের পরিবারকে যারা ৩রা নভেম্বরের অভ্যূত্থানের পর ঢাকার রাজপথে অভ্যূর্ত্থানের পক্ষে আওয়ামীলীগকে সমর্থন জানিয়ে মিছিল করেছিল। এ মিছিলের ফলে পাল্টা অভ্যূত্থানকারীরা ভারতপন্তী এবং আওয়ামীলীগের বলে চিহ্নিত হয়ে গেল। এতে কর্নেল তাহেরের গনবাহিনী সাধারন সৈনিকদের খেপিয়ে তুলে খালেদ মোশাররফ সহ অনেক দেশ প্রেমিক মুক্তিযুদ্ধার প্রাণ সংহার করার সুযোগ করে দিয়েছিল। যার ফলে অভ্যূত্থানও ব্যর্থ হয়ে যায়। 

কিন্তু তখনো সাধারণ মানুষ জিয়াকে মুক্ত করার নেপথ্য নায়ক তাহেরের কথা জানে না। এ পাল্টা অভ্যূত্থানের মূল কুশিলব  জাসদের গণ বাহিনীর নায়ক তাহেরের নাম জানতে পারে অনেক পরে।

এদিকে খালেদ মোশাররফের হাতে বন্দী জিয়া মুক্ত হয়ে বেতার ঘোষনার পর সারা দেশে তিনি ৭ই নভেম্বর বিপ্লবের হিরো বনে গেলেন। সারাদেশে তিনি ব্যাপক ভাবে পরিচিত হয়ে গেলেন।

অন্যদিকে নেপথ্যে থাকা জাসদ তথা কর্ণেল তাহের সৈনিকদের মধ্যে যে মিথ্যা অপপ্রচার চালিয়ে  জিয়ার মাধ্যমে ক্ষমতায় আসীন হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন, সে লক্ষে গুড়ে বালি দিয়েছিলেন জেঃ জিয়া। শুধু তাই নয় জিয়ার উচ্ছাকাঙ্খার কাছে বলি হয়েছেন কর্ণেল তাহের তথা জাসদ। কিন্তু ভাগগ্যের নির্মম পরিহাস এ সত্যটা তখন জাসদ যেমন সাধারণ মানুষকে তুলে ধরতে পরেনি এখনো বেশীর ভাগ মানুষের নিকট এ সত্যটা অজানা।

১৭তম পর্ব “চোখে দেখা রাজনীতি”র এ পর্বে আছে ঳ এরশাদ আর জিয়া দুই স্বৈরাচারের তুলনামূলক আলোচনা

 


প্রান্ত রক্তে রক্তে মুক্তিযুদ্ধ দেখেছে, এক সাগর রক্ত দিয়ে বাংলাদেশ এসেছে। ভেবেছিল রক্ত দেখার পালা শেষ। কিন্তু এরপরও রক্ত দেখার শেষ হয় নাই। দেখেছে স্বপরিবারে বঙ্গবন্ধুর বর্বরোচিত হত্যা, এই যে হত্যার শুরু তারপর থেকে এখন পর্ষন্ত চোখে দেখে আসছে রক্ত আর রক্ত, প্রসিডেন্টের রক্ত, মুক্তিযুদ্ধা সৈনিকের রক্ত, স্বাধারণ সৈনিকের রক্ত, নেতা নেত্রীর রক্ত, আম জনতার রক্ত।  কত রক্ত আর দেখবে বাঙ্গলী!!  মুক্তযুদ্ধা প্রান্তরা শুধু এখন নিরব দর্শকের মত সব দেখে যাচ্ছে। আর ভাবতে থাকে কিসের জন্য এই বাংলাদেশ স্বাধীন করলাম,  এখন হচছেটা কি? বঙ্গবন্ধু নিহত, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ভূলুন্ঠিত, সামরিক বহিনীতে ক্ষমতা নিয়ে মুক্তিযুদ্ধা মুক্তিযুদ্ধা হানাহানি খুনা খুনি, দলাদলি। এসব দেখে  হতাস হয়ে পড়ে প্রান্তের মত মুক্তিযুদ্ধারা  এবং সাধারণ জনগণও। প্রান্ত ভাবে এজন্যই কি আমরা বাংলাদেশকে এত রক্ত দিয়ে স্বাধীন করেছি?  যে দেশের জন্য আজ প্রান্ত এবং তার মত আরো অনেকে বাবা হারা, মা হারা, বোন হারা,  তাদের এখনো কত শোক, কত লজ্জা, কত গ্লানী কাঁধে নিয়ে বয়ে বেড়াতে হচ্ছে।  এত ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত এই দেশে আজ এসব কি হচ্ছে? এই হতাসার কথা তার মত লক্ষ লক্ষ লোক কার কাছে বলবে ! কার সাথে শেয়ার করে নিজের মনকে একটু হালকা করবে!  মাঝে মাঝে প্রান্ত তার বান্ধবী একিই কলেজের প্রভাষক এবং সহকর্মী ফারজান হক বিথীর সাথে এসব নিয়ে কথা বলে। ফারজানাও আরেক মুক্তিযুদ্ধা পরিবারের সন্তান, সে তার দুঃখ গুলো বুঝে, তার দুঃখে সেও ব্যথিত হয়।  এ কলেজে অধ্যাপনা করার পর নিস্বঙ্গ প্রান্ত, ভালাবাসাহীন প্রান্তু, যেন এক প্রশান্ত সবুজ দ্বীপ খুজে পেয়েছে ফারজানা বিথী নামের এ মেয়েটির মাঝে। যার সাথে সে তার পরিবার, তার সমাজ, তার রাষ্ট্র, সব কিছু নিয়ে কথা বলে একটু হালকা হয়ে সাচ্ছন্দের জায়গা খুঁজে পায়।

   প্রান্ত জ্ঞান বুদ্ধি হওয়ার পর থেকে  নিরবে পাকিস্থান আমল থেকে রাজনীতির মঞ্চায়ন দেখে দেখে আসছে নিরব দর্শকের মত। তিনি জিয়ার ক্ষমতা দখল দেখেছে, ক্ষমতা নিজের কজ্বায় রাখতে গিয়ে কত মুক্তিযুদ্ধা ভাইকে ফাঁসীতে ঝুলিয়ে হত্যা করেছে তাও দেখেছে। এখন এরশাদকেও দেখেছে, প্রান্ত দেখে এরশাদ আর জিয়ার মধ্যে মৌলিক কোন পার্থক্য নাই। এরশাদ এবং জিয়া দুজনের চরিত্র একিই, দু জনেরই লক্ষ্য সামরিক বাহিনীর কাঁধে বন্দুক রেখে গনতন্ত্রকে পদদলিত করে স্বৈরাচারী কায়দায় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল  করা। দখল করে ছলে বলে কৌশলে সে ক্ষমতা পাকাপোক্ত করা।

প্রান্তের মতে বাংলাদেশের ইতিহাসে সবছেয়ে ধূর্ত ও কূট বুদ্ধিসম্পর্ন সামরিক স্বৈরাশাসক হচ্ছেন জেঃ জিয়াউর রহমান এবং তারপর জেঃ এরশাদ। তারা দুজনই খুবই কৌশলে রাষ্ট্রপতি নিহত হওয়ার ঘটনা থেকে নিজেদের নিরাপদ দূরত্বে আড়াল রেখে সময়মত খোলস থেকে বেরিয়ে এসে দেশের কান্ডারী হয়ে বসেছিলেন। আয়ুব খানের সামরিক শাসনের আদলেই এ দুজন সমর নায়ক  রাষ্ট্র পরিচালনা করেছেন। এ সকল সামরিক শাসকরা সবাই পাকিস্থানী সামরিক বাহিনীর উত্তারাধিকারী।

        প্রান্তের মতে বাংলা দেশে জিয়া এবং এরশাদ এ দুজন সামরিক স্বৈরশাসক। এদের দুজনকে আমাদের নব প্রজন্মের সামনে নির্মোহ এবং নিপেক্ষভাবে তুলনামূলক বিচার বিশ্লেষন করে আমরা তুলে ধরতে পরিনা, বিএনপি বৃহত্তর দল হওয়ায় তাঁর সমর্থকরা তাঁর প্রতি আবেগ দেখাতে গিয়ে তার ক্ষমতা দখলকে বলেন বিপ্লব, তাকে বলেন বিপ্লবের নায়ক, আর এরশাদের  ক্ষমতা দখলকে বলেন সামরিক অভ্যূত্থান, আর তাকে বলেন  স্বৈরাশাসক। কিন্তু ক্ষমতা দখলে দূজনের ধূর্ততা এবং চাতুরী বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে দুজনের ক্ষমতা দখল ছিল হুবহু এক। দুজনেই স্বৈরশাসক। দুজনের মধ্যে পার্থক্য হল জিয়া ক্ষমতায় আসার পর মোহভঙ্গের আগে হানিমুন পর্যায়ে নিহত হয়ে বিদায় নিয়েছিলেন। তাই তার প্রতি মোহের ঘোর কাটতে পারেনি।   কিন্তু এরশাদ ক্ষমতায় এসে হানিমুন পর্যায় শেষ করে বেশ কিছুদিন ঘর সংসার করেছেন, তাই তার প্রতি মোহ ভঙ্গ হয়েছিল তাই তাকে সৈরশাসক বলি। এরশাদকে যা বলি জিয়াকে সেটা বলতে কষ্ট পায়।

প্রান্ত নির্মোহভাবে দুই স্বৈরাচারের চূতুর্যপূর্ণ কৌশলের বিভিন্ন তুলনামূলক তথ্য উপাথ্য সংগ্রহ করে নিন্মে দেখিয়েছেন তাদের ক্ষমতা দখলের কৌশলে মূলতঃ কোন পর্থক্য নেই। 

মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের ক্ষমতা দখলের  কৌশল:-

ক) রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব নিহত হন কিছু সেনা সদস্যের হাতে, দৃশ্যত এ হত্যাকান্ডে জিয়ার কোন সম্পৃক্ততা ছিলনা।

খ) কিন্তু বঙ্গবন্ধু হত্যার পর তাঁর দলের একজনকে(খন্দককার মোশতাক)

পুতুল বানিয়ে পেছনে পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সময় নেয়া হয়।

গ) পরে সামরিক আইন জারী করে একজন বিচারপতিকে (বিচারপতি সায়েমকে) প্রেসিডেন্ট বানিয়ে সেনা প্রধান (জিয়াউর রহমান) ক্ষমতা দখল করেন।

ঘ) ক্ষমতা দখলের পর জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণে  ছয় মাসের মধ্যে নির্বাচন দিয়ে গণতান্ত্রিক সরকারের কাছে ক্ষমতা ফিরিয়ে দিয়ে সেনা নায়ক ব্যারাকে ফিরে যাবার অঙ্গীকার করেন।

ঙ) ক্ষমতায় আসার পর একাত্তরের পরাজিত শত্রুদের পুর্নবাসনের প্রকল্প হাতে নেন। যুদ্ধাপারধীদের বিচার বন্ধ করেন। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে খেলেন লুকোচুরি খেলা।

চ) রাষ্ট্রপতি হত্যাকারী সেনা কর্মকর্তাদের কোর্ট মার্শালে বিচার না করে দূতাবাসে চাকরী দিয়ে পুরস্কৃত করেন।

জ) একটা হাঁ না গণভোট করে  ৯৯% হাঁ ভোট নিজের পক্ষে দেখিয়ে নিজেকে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ঘোষনা করেন।

ঝ) রাষ্ট্রীয় সম্পদ এবং জনবল ব্যবহার করে প্রজাতন্ত্রের করম্চারী হয়ে রাজনীতিতে অবৈধভাবে নিজেকে সম্পৃক্ত করেন।

ঞ) দেশের উন্নয়নের কথা বলে ঘোষনা করেন ১৯ দফা কর্মসূচী।

ট) বিভিন্ন দলছুটদের নিয়ে জাতিয়তাবাদী ফ্রন্ট গঠিত করেন, সেখানে সাম্প্রদায়িক রাজনীতিকে প্রশ্রয় দিয়ে বুনা হয় মৌলবাদের বীজ। 

ঠ) তিনি স্বাধারণ মানুষকে ধোঁকা দেয়ার জন্য তাঁর পূর্বসূরী আয়ুব ইয়াহিয়া তথা পাকিস্থানী শাসকদের মত ধর্মকে রাজনীতিতে ব্যবহার করার কৌশল অনুশরন করেন। সে লক্ষে তিনি সংবিধানে বিছমিল্লাহ সংযোজন করেন। যদিও তিনি বঙ্গবন্ধু কতৃক নিষিদ্ধ ঘোষিত অনৈসলামিক কর্মকান্ড  মদ জুয়ার লাইসেন্স বন্ধ না রেখে পুনরায় চালু করেন।

ড) জাতিয়তাবাদী ফ্রন্টকে জাগ( জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দল) দলে রূপান্তরিত করেন।

ঢ) অবশেষে দলের নাম আধুনিকায়ন করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বি এন পি) করা হয়। এবং জিয়াউর রহমান নিজেই তার চেয়ারম্যান পদে অধিষ্টিত হন।

লেঃজেঃ হোসেন মোহাম্মদ এরশাদের কৌশল:-

জেঃ এরশাদও জেঃ জিয়ার একিই পদাঙ্ক অনুশরন করেন।

ক) একজন রাষ্ট্রপতি (এ ক্ষেত্রে জিয়াউর রহমান) সেনা বাহিনীর সদস্যদের হাতে নিহত হন। দৃশ্যত এ হত্যাকান্ডে এরশাদের কোন ভূমিকা ছিল না।

খ) রাষ্ট্রপতি হত্যার পর সেই দলেরই একজনকে(বিচারপতি আব্দুস সাত্তার) পুতুল বানিয়ে পিছনে পরিকল্পনা বাস্তবয়ানের সময় নেওয়া হয়।

গ) একজন বিচারপতি (এখানে হবে বিচারপতি এহসান উদ্দীন চৌধূরী)কে প্রেসিডেন্ট বানিয়ে সেনা প্রধান (এরশাদ) ক্ষমতা দখল করেন।

ঘ) ক্ষমতা দখলের পর সামরিক শাসন জারী করে জাতির উদ্দেশ্যে ভাষনে ছয় মাসের মধ্যে নির্বাচন দিয়ে গণতান্ত্রিক সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করে সেনাশাসক(এরশাদ) ব্যারাকে ফিরে যাবার অঙ্গীকার করেন।

ঙ) কিছু দিন পর জনগনের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটানোর কথা বলে প্রসিডেন্টের নিকট থেকে জোর করে ক্ষমতা দখল  করে নিজেই প্রেসিডেন্ট বনে যান।

চ) ক্ষমতায় আসার পর পরই ৭১ এর পরাজিত শত্রুর পুর্বাসন প্রকল্প অব্যাহত রাখেন। যুদ্ধাপরাধীর বিচারও বন্ধ থাকে। অব্যাহত থাকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে  বিকৃতি ও লুকোচুরি।

ছ) রাস্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু হত্যার তিনিও বিচার করেননি, তাদের তিনিও দূতাবাসে চাকুরী দিয়ে পুরুস্কৃত করেন এবং এবং তিনি তার পূর্বসূরী থেকে একধাপ এগিয়ে বঙ্গবন্ধুর খুনী সেনা কর্মকর্তােদর কাউকে কাউকে রাজনৈতিক দল গঠন করে দেশে রাজনীতি করার সুযোগও করে দেন। এমনকি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনেরও অংশ গ্রহন করার সুযোগ দেয়া হয় তাদের। জিয়া হত্যার বিচারও করেন নি তিনি। সাত্তারের সময় কোর্ট মার্শালে শুধু সেনা বিদ্রোহের বিচার করা হয়েছিল ।

ঝ) একটা হাঁ না ভোট করে ৯৯% ভোট নিজের পক্ষে সীল মেরে তিনিও তথাকথিত নির্বাচিত প্রসিডেন্ট  বনে যান।

ঞ) তিনিও রাস্ট্রিয় সম্পদ আর জনবল ব্যবহার করে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী থাকা অবস্থায় রাজনীতির যাত্রা শুরু করেন এবং দল গঠন করেন । @#$%$#@&%$#@

ট) তিনিও জিয়ার মত  উন্নয়নের আঠার দফা কর্মসূচী ঘোষনা করেন।

ঠ) বিভিন্ন দল ছুটদের নিয়ে তিনিও ফ্রন্ট তেরী করেন। তিনিও রাজনীতিতে সম্প্রদায়িকতাকে উস্কে দিয়ে জিয়ার পোঁতা মৌলবাদের বীজের অঙ্কোরুদ্গমন ঘটিয়ে তার পরিচর্যা করেছেন।

ড) তিনিও সাধারন মুসলমানকে ধর্মের ধোঁকা দেবার জন্য রাষ্ট্র ধর্ম ইসলাম ঘোষনা করছিলেন। জেঃ জিয়া যেমন সংবিধানে বিছমিল্লাহ সংযোজন করেছিলেন। উল্লেখ্য এরশাদ ব্যক্তগতভাবে কত ধর্মপরায়ন তা তো দেশবাসীর জানা। 

ঢ) তিনিও জাতিয়তাবাদী ফ্রন্ট গঠন করে জনদলে রূপান্তরিত করেন।

ন) অবশেষে দলের নাম আধুনিকায়ন করে জাতিয় পার্টি রাখেন এবং  নিজে দলের চেয়ারম্যান পদে অধিষ্টিত হন।

(সহায়ক সূত্র-আমার ব্লক ডট কম,/৭ই নভেম্বরের প্রশ্ন /জিয়ার ক্ষমতা দখল বিপ্লব দিবস হলে এরশাদের ক্ষমতা দখল কেন হবেনা?(আবু সায়েদ,জিয়াউদ্দীন,০৯/১১/২০০৯)

     উপরের তুলনামূলক আলোচনায় প্রান্তের নিকট এ সত্যটা প্রতিভাত হয়েছে যে স্বৈরশাসকদের সবার চরিত্র এক। সে জিয়া বা এরশাদ যে হউন না কেন। জিয়ার আর এরশাদের মধ্যা শুধু ভিন্নতা একটি জায়গায়। জিয়ার প্রতি সাধারন মানুষের মোহ ভঙ্গের আগে সামরিক অভ্যূত্থানে নিহত হয়ে ক্ষমতাচ্যূত হয়েছেন আর এরশাদ ক্ষমতা হারিয়েছেন মোহ ভঙ্গের পর গনআন্দোনের মধ্য দিয়ে। তাই এরশাদকে স্বৈরাচার বলতে সবাই সাছন্দ বোধ করেন। তবে যে যাই বলুকনা কেন প্রান্ত মনে করেন তারা শুধু গনতন্ত্রকে হত্যা করেনি তারা ধংষ করেছে রাষ্ট্রীয় মূলনীতি, তারা ধংষ করেছে মুক্তি যুদ্ধের চেতনা, তারা ধংষ করেছে অসম্প্রদায়িক রাজনীতির বিকাশ, তারা ধংষ করেছে গনতান্ত্রিক প্রতিষ্টান, তারা রাজনীতিতে আগমন ঘটিয়েছেন সুবিধাবাদী দূর্বৃত্ত চরিত্রের, আগমন ঘটিয়েছেন  মোলবাদী এবং স্বাধীনতা বিরুধীদের। তারা অরাজনৈতিক ব্যক্তিকে রাজনীতিতে আনার রেওয়াজ চালু করে ত্যাগী নেতাদের অবমূল্যায়ন করেছেন। ফলে রাজনীতি চলে গেছে অরাজনৈতিক ব্যক্তির হাতে। সে জন্যই রাজনীতিতে চলছে দূর্নীতি আর দূর্বৃত্যায়ন। স্বৈরশাসকের এ আবর্জনা সাফ করে বাঙালীকে আবার আদর্শের পথে আসতে অনেক সময় পার করতে হবে। প্রয়োজন হবে হোসেন শহীদ সোহরোয়ার্দী, শেরে বাংলা, ভাসানী এবং বঙ্গবন্ধুর মত সৎ যোগ্য নেতার।


১৬ তম পর্ব “চোখে দেখা রাজনীতি”র এ পর্বে আছে সাত্তারের কাছ থেকে এরশাদের ক্ষমতা দখল

তারপর মোক্ষম সময় হিসাবে বেছে নিল ১৯৮২ সালের ২৪শে মার্চ। ২৪শে মার্চ সকালে এরশাদের অনুগত একদল সামরিক অফিসার বঙ্গবভনে গিয়ে বন্দুকের মুখে রাষ্ট্রপতি আব্দুছ সাত্তারের সরকারকে উৎখাত করে ক্ষমতা দখল করে নেয়। (তাঁর গুরু জিয়াউর বহমান যেমন  বিচারপতি সয়েমকে করেছিল)সেদিন বিকালে বেতার এবং টিভিতে দেয়া ভাষনে এরশাদ বলেন, "জনগনের ডাকে সাড়া দিয়ে তাকে ক্ষমতা গ্রহন করতে হয়েছে। এছাড়া আর কোন বিকল্প পথ ছিলনা। এক সাক্ষাৎকারে তিনি আরো বলেন, "তিনি ক্ষমতা দখল করেননি রাষ্ট্রপতি সেচ্ছায় তার হাতে ক্ষমতা তুলে দিয়েছেন।" ক্ষমতা দখল করে তিনি প্রথমে সারা দেশে মার্শাল ল জারী করেন। তারপর সংবিধান রহিত করে জাতীয় সংসদ বাতিল করেন এবং মন্ত্রীসভা বরখাস্ত করেন। এরপর বেতার এবং টেলিভিসন ভাষনে তার পূর্বসূরী আয়ুব, ইয়াহিয়া,জিয়াউর রহমানের মত বলেন, "দেশ আজ গভীর সঙ্কটে নির্মজ্জিত । প্রশাসন আজ সুষ্টুভাবে কোন কাজ করতে পারছে না"---"ক্ষমতাসীন দলের লোকদের ক্ষমতা নিয়ে কাঁড়াকাঁড়ি জাতীয় স্বার্থ ও নিরাপত্তা বিপন্ন করছে।"----"তাই জাতির বৃহত্তর স্বার্থে -------দেশ প্রেমিক জনগনের দোয়ায় গনপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসাবে ১৯৮২ সালের ২৪শে মার্চ বুধবার থেকে গনপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের পূর্ণ ক্ষমতা গ্রহণ করছি।" তিনি আরো বলেন, তিনি দেশের সকল সশস্ত্র বাহিনীরও পূর্ণ ক্ষমতাও গ্রহন করছেন।----" তিনি বলেন--আমি যে কোন ব্যক্তিকে দেশের প্রেসিডেন্ট নিয়োগ করতে পারি--, --সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি, বা আমার নিযুক্ত যে কোন বিচারপতির কাছ থেকে শপথ নিয়ে প্রেসিডেন্ট দায়িত্বভার গ্রহন করবেন।  আমি প্রয়োজনে এ নিয়োগ রদ অথবা বাতিল করতে পারি। যে ব্যক্তি রাষ্ট্র প্রধান হবেন তিনি  প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসাবে আমার উপদেশ মত কাজ করবেন,  যা দায়িত্ব দেব তা পালন করবেন।"

তিনি সামরিক ফরমানের ক্ষমতা বলে আরো বলেন,---"আজ থেকে সংবিধান স্তগিত করা হলো, নব নির্বাচিত জাতীয় সংসদ ভেঙ্গে দেয়া হলো, সামরিক আইন জারীর সাথে সাথে বর্ত্তমান প্রেসিডেন্ট, ভাইস প্রেসিডেন্ট, স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার, কেউ আর তাদের স্বপদে বহাল নেই। মন্ত্রী পরিষদের আর অস্তিত্ব নেই। "(সহায়ক সূত্র-,এরশাদের শাসনামল-৪, রমিতের বাংলা ব্লগ)

        প্রান্ত রক্তে রক্তে মুক্তিযুদ্ধ দেখেছে, এক সাগর রক্ত দিয়ে বাংলাদেশ এসেছে। ভেবেছিল রক্ত দেখার পালা শেষ। কিন্তু এরপরও রক্ত দেখার শেষ হয় নাই। দেখেছে স্বপরিবারে বঙ্গবন্ধুর বর্বরোচিত হত্যা, এই যে হত্যার শুরু তারপর থেকে এখন পর্ষন্ত চোখে দেখে আসছে রক্ত আর রক্ত, প্রসিডেন্টের রক্ত, মুক্তিযুদ্ধা সৈনিকের রক্ত, স্বাধারণ সৈনিকের রক্ত, নেতা নেত্রীর রক্ত, আম জনতার রক্ত।  কত রক্ত আর দেখবে বাঙ্গলী!!  মুক্তযুদ্ধা প্রান্তরা শুধু এখন নিরব দর্শকের মত সব দেখে যাচ্ছে। আর ভাবতে থাকে কিসের জন্য এই বাংলাদেশ স্বাধীন করলাম,  এখন হচছেটা কি? বঙ্গবন্ধু নিহত, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ভূলুন্ঠিত, সামরিক বহিনীতে ক্ষমতা নিয়ে মুক্তিযুদ্ধা মুক্তিযুদ্ধা হানাহানি খুনা খুনি, দলাদলি। এসব দেখে  হতাস হয়ে পড়ে প্রান্তের মত মুক্তিযুদ্ধারা  এবং সাধারণ জনগণও। প্রান্ত ভাবে এজন্যই কি আমরা বাংলাদেশকে এত রক্ত দিয়ে স্বাধীন করেছি?  যে দেশের জন্য আজ প্রান্ত এবং তার মত আরো অনেকে বাবা হারা, মা হারা, বোন হারা,  তাদের এখনো কত শোক, কত লজ্জা, কত গ্লানী কাঁধে নিয়ে বয়ে বেড়াতে হচ্ছে।  এত ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত এই দেশে আজ এসব কি হচ্ছে? এই হতাসার কথা তার মত লক্ষ লক্ষ লোক কার কাছে বলবে ! কার সাথে শেয়ার করে নিজের মনকে একটু হালকা করবে!  মাঝে মাঝে প্রান্ত তার বান্ধবী একিই কলেজের প্রভাষক এবং সহকর্মী ফারজান হক বিথীর সাথে এসব নিয়ে কথা বলে। ফারজানাও আরেক মুক্তিযুদ্ধা পরিবারের সন্তান, সে তার দুঃখ গুলো বুঝে, তার দুঃখে সেও ব্যথিত হয়।  এ কলেজে অধ্যাপনা করার পর নিস্বঙ্গ প্রান্ত, ভালাবাসাহীন প্রান্তু, যেন এক প্রশান্ত সবুজ দ্বীপ খুজে পেয়েছে ফারজানা বিথী নামের এ মেয়েটির মাঝে। যার সাথে সে তার পরিবার, তার সমাজ, তার রাষ্ট্র, সব কিছু নিয়ে কথা বলে একটু হালকা হয়ে সাচ্ছন্দের জায়গা খুঁজে পায়।

   প্রান্ত জ্ঞান বুদ্ধি হওয়ার পর থেকে  নিরবে পাকিস্থান আমল থেকে রাজনীতির মঞ্চায়ন দেখে দেখে আসছে নিরব দর্শকের মত। তিনি জিয়ার ক্ষমতা দখল দেখেছে, ক্ষমতা নিজের কজ্বায় রাখতে গিয়ে কত মুক্তিযুদ্ধা ভাইকে ফাঁসীতে ঝুলিয়ে হত্যা করেছে তাও দেখেছে। এখন এরশাদকেও দেখেছে, প্রান্ত দেখে এরশাদ আর জিয়ার মধ্যে মৌলিক কোন পার্থক্য নাই। এরশাদ এবং জিয়া দুজনের চরিত্র একিই, দু জনেরই লক্ষ্য সামরিক বাহিনীর কাঁধে বন্দুক রেখে গনতন্ত্রকে পদদলিত করে স্বৈরাচারী কায়দায় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল  করা। দখল করে ছলে বলে কৌশলে সে ক্ষমতা পাকাপোক্ত করা।

প্রান্তের মতে বাংলাদেশের ইতিহাসে সবছেয়ে ধূর্ত ও কূট বুদ্ধিসম্পর্ন সামরিক স্বৈরাশাসক হচ্ছেন জেঃ জিয়াউর রহমান এবং তারপর জেঃ এরশাদ। তারা দুজনই খুবই কৌশলে রাষ্ট্রপতি নিহত হওয়ার ঘটনা থেকে নিজেদের নিরাপদ দূরত্বে আড়াল রেখে সময়মত খোলস থেকে বেরিয়ে এসে দেশের কান্ডারী হয়ে বসেছিলেন। আয়ুব খানের সামরিক শাসনের আদলেই এ দুজন সমর নায়ক  রাষ্ট্র পরিচালনা করেছেন। এ সকল সামরিক শাসকরা সবাই পাকিস্থানী সামরিক বাহিনীর উত্তারাধিকারী।



       
প্রান্তের মতে বাংলা দেশে জিয়া এবং এরশাদ এ দুজন সামরিক স্বৈরশাসক। এদের দুজনকে আমাদের নব প্রজন্মের সামনে নির্মোহ এবং নিপেক্ষভাবে তুলনামূলক বিচার বিশ্লেষন করে আমরা তুলে ধরতে পরিনা, বিএনপি বৃহত্তর দল হওয়ায় তাঁর সমর্থকরা তাঁর প্রতি আবেগ দেখাতে গিয়ে তার ক্ষমতা দখলকে বলেন বিপ্লব, তাকে বলেন বিপ্লবের নায়ক, আর এরশাদের  ক্ষমতা দখলকে বলেন সামরিক অভ্যূত্থান, আর তাকে বলেন  স্বৈরাশাসক। কিন্তু ক্ষমতা দখলে দূজনের ধূর্ততা এবং চাতুরী বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে দুজনের ক্ষমতা দখল ছিল হুবহু এক। দুজনেই স্বৈরশাসক। দুজনের মধ্যে পার্থক্য হল জিয়া ক্ষমতায় আসার পর মোহভঙ্গের আগে হানিমুন পর্যায়ে নিহত হয়ে বিদায় নিয়েছিলেন। তাই তার প্রতি মোহের ঘোর কাটতে পারেনি।   কিন্তু এরশাদ ক্ষমতায় এসে হানিমুন পর্যায় শেষ করে বেশ কিছুদিন ঘর সংসার করেছেন, তাই তার প্রতি মোহ ভঙ্গ হয়েছিল তাই তাকে সৈরশাসক বলি। এরশাদকে যা বলি জিয়াকে সেটা বলতে কষ্ট পায়।

বৃহস্পতিবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২২

১৫ তম পর্ব “চোখে দেখা রাজনীতি”র এ পর্বে আছে ঳ অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসাবে সাত্তারের অধিষ্ঠান

জিয়া হত্যার বিচার :- '১৯৮১ সালে ৩০মে একটি সামরিক অভ্যূত্থান পরিচালনা করে জিয়াউর রহমানকে হত্যা করার পর, এর দায় পড়ে সেনা বাহিনীর চট্টগ্রাম ডিভিশনের  জিওসি মেজর জেনারেল মঞ্জুর  উপর। পুলিশের হাতে জেনারেল মঞ্জুর গ্রেফতার হওয়ার পর সেই সময়ের সেনা প্রধান লেঃ জেঃ এরশােদর পরামর্শে প্রেসিডেন্ট সাত্তার মঞ্জুকে সেনা হফাজতে দিতে নির্দেশ দেন। প্রসিডেন্টের নির্দেশ পেয়ে  চট্টগ্রাম পুলিশ, চট্টগ্রামের কমিশনার এবং জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে তাকে সেনাবাহিনীর হাতে হস্তান্তর করা হয়।সেনা হফাজতে নেয়ার পরের দিনই সরকার এক প্রেস নোট জারী করে বলে যে কিছু উশৃঙ্খল সেনা সদস্য তাকে হত্যা করেছে।

 জিয়া হত্যার জন্য জেনারেল মঞ্জুকে দায়ী করা হলেও তাকে বিচারের আওতায় না এনে সরাসরি হত্যা এবং তড়িঘড়ি করে কোর্ট মার্শালে বিচারের বিচারের মাধ্যমে তার অনুগত মুক্তিযুদ্ধা সেনা কর্মকর্তাদের ফাঁসী দেওয়া এবং পরবর্তীতে মঞ্জু হত্যাকারীদের বিচারের আওতায় না আনা, এসব বিভিন্ন প্রশ্নবিদ্ধ কর্মকান্ডের কারনে জনমনে অনেক সন্দেহ আর প্রশ্নের জন্ম দেয়। জিয়া হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী কে তা আজো রহস্যাবৃতই রয়ে গেল। এর

 যঠ কখনো খুলবে আর মনে হয়না। (সহায়ক সূত্র-,জিয়া হত্যাকান্ডের নেপথ্যে ষড়য়ন্ত্র-৩, জুন৪,২০১৭,on line)

   জিয়া হত্যাকান্ডের পর তাড়িঘড়ি করে তৎকালীন সেনা প্রধান এরশাদের নির্দেশে এবং তত্বাবদানে গঠিত হয় একটি কোর্ট মার্শাল। ওই কোর্ট মর্শালের ডিফেন্ডিং অফিসার কর্ণেল আয়েন উদ্দীন এবং এই হত্যাকান্ড নিয়ে গবেষনা করা সাংবাদিক জুলফিকার আলী মানিকের মতে বিচারটি ছিল নীল নক্সা বাস্তবয়নের বিচার। যার মূল উদ্দশ্য ছিল সেনা বাহিনী থেকে মুক্তিযুদ্ধা নিধন। জুলফিকার আলী মনিক 'জিয়া হত্যাকান্ড নীল নকসার বিচার' গবেষনা মূলক বইয়ে লিখেছেন "রাষ্ট্রপতি জিয়া হত্যাকান্ডকে কেন্দ্র করে  সেনাবাহিনীতে কোর্ট মার্শলে গোপন বিচারটি ছিল  পুরোপুরি প্রহসন ও সাজানো নাটক। সেনাবাহিনীতে মুক্তিযুদ্ধা নিধনের নীল নক্সার অংশ হিসাবে তা আগে থেকে নির্ধারন করে রাখা হয়েছিল কাদের বিচার হবে কি শাস্তি পাবে।"

এখানে লক্ষনীয় বিষয় হল কোর্ট মার্শালের বিচারের  জন্য যে সামরিক আদালত গঠন করা হয় তার সাত সদস্যের ছয় সদস্যই ছিল পাকিস্থান প্রত্যাগত। শুধু এক জন সদস্য কর্ণেল মতিউর রহমান ছিলেন মুক্তিযুদ্ধা। জানা যায় এই কোর্টের প্রধান ছিলেন মেজর জেনারেল আব্দুর রহমান তিনিও একজন পাকিস্থান প্রত্যাগত। শুধু তাই নয় তিনি মুক্তিযুদ্ধা বিদ্বষী লোক ছিলেন বলেও জানা যায়। (মানিক, পৃষ্টা-৫৯)

আর একটি লক্ষনীয় বিষয় ছিল কোর্ট মার্শালে অভিযুক্ত ছিল শুধু মুক্তিযুদ্ধা অফিসাররা। সেই সময় চট্টগ্রাম সেনানিবাসের চার ব্রিগেড কমান্ডের তিন জনই ছিলেন মুক্তি যুদ্ধা, ব্রিগেডিয়ার মহসীন, কর্নেল নোয়াজিশ ও কর্নেল রশীদ। এই তিন জনকেই কোর্ট মার্শালে ফাঁসী দেওয়া হয়। অপর ব্রিগেড কমান্ডার ছিলেন পাকিস্থান প্রত্যাগত কর্নেল লতিফ তাকে অভিযুক্তও করা হয়নি।

    দুঃখের বিষয় হলো এই কোর্টের সাত সদস্যের একজনও যদি এই রায়ের সাথে দ্বিমত পোষন করতেন তাহলে এ প্রহসনের বিচার থেকে আমাদের মুক্তিযুদ্ধা ভায়েরা বেঁছে যেতেন।  অন্তত সাত জনের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধা বিচারক কর্ণেল মতিউর রহমান যদি বলতেন ফাঁসী দেওয়ার ব্যাপারে আমি একমত নিই।  তাহলে ফাঁসী দেওয়া যেত না। তাই কতৃপক্ষ মুক্তিযুদ্ধাদের ভিতর থেকে এমন একজনকে বেছে নিয়েছেন যার কাছ থেকে মন মত ব্যবহার পাওয়া যাবে। (মানিক,পৃষ্টা-৪৯)

কোর্ট মার্শালে অভিযুক্তদের পক্ষে মামলার ডিফেন্ডার 'আইন উদ্দিন', এবং কোর্ট মর্শালে দশ বছরের কারাদণ্ড প্রাপ্ত মেজর রেজাউল করিম পরবর্তীতে উল্লেখ করেছেন, ব্রিগেডিয়ার মহসীন এবং কর্নেল মাহফুজের সারা দেহ এবং  হাতের নক উপড়ে ফেলে টর্চার করে তাদের কাছ থেকে স্বীকারোক্তিমূলক জবাব বন্দী আদায় করা হয়। যা মিলেটারী বা সিভিল কোন আইনে নাই।

 এখানে আরো একটি অবাক করা কান্ড হলো জিয়া হত্যাকান্ডকে কেন্দ্র করে যে কোর্ট মার্শাল গঠিত হয় তাতে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে জিয়া হত্যা কান্ডে জড়িত থাকার কোন অভিযোগ আনা হয়নি। তাদের বিরুদ্ধে যে তিনটি বিষয়ে অভিযোগ আনা হয়েছিল তাহল, ১) বাংলাদেশ সামরিক বাহিনীতে বিদ্রোহ ঘটানো ২) বাংলাদেশ সামরিক বাহিনীতে সংঘটিত বিদ্রোহে যোগদান। ৩) বাংলাদেশ সামরিক বাহিনীতে বিদ্রোহের উস্কানী দেওয়া।

১৯৮১ সালে জিয়া হত্যা কান্ডকে কেন্দ্র করে গঠিত মার্শাল ল কোর্টে মোট তের জন মুক্তিযুদ্ধা অফিসারকে ফাঁসী দেওয়া হয়। তার মধ্যে পাঁচজন ছিলেন খেতাব প্রাপ্ত মুক্তি যুদ্ধা। খেতাব প্রাপ্তদের মধ্যে তিনজন ছিলেন বীর বিক্রম, দুই জন ছিলেন বীর প্রতীক।

বিভিন্ন সূত্রের বরাত দিয়ে ---লেখক জুলফিকার আলী মানিক লিখেছেন, ওই বিচারের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধা নিধনের আর একটি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হয়েছে, সেক্ষেত্রে অভিযুক্তদের মধ্যে যারা বেঁচে থাকলে সমস্য হতে পারে তাদেরকে ফাঁসী দেয়া হয়। (সহায়ক সূত্র-চেনেলআই অন লাইন,২০শে অক্টোবর ২০১৭)   

(জিয়া হত্যার নয়, সেনা বিদ্োহের বিচার হয়। দন্ডিত বেশীর ভাগই মুক্তি যুদ্ধা, চেনেল আই,) (জিয়া হত্যাকান্ডের নেপথ্যে ষড়যন্ত্রের, নেপথ্যে ষড়যন্ত্র-২ চেনেল আই),(৩,অপন ভূবন অন লাইন/, সাখাওয়াত আল আমিন ) (জুলফিকার আলী মনিক, জিয়া হত্যাকান্ড, নীল নকসার বিচার।)

জিয়া হত্যার সম্ভাব্য কারণ :-মুক্তিযুদ্ধের পর কর্ণেল তাহেরের মত জিয়ার  সাথে  জেঃ মঞ্জুরও ঘনিষ্টতা ছিল। ৭ই নভেম্বেরর পর জিয়ার আস্থাভাজন জেঃ মঞ্জুকে সেনা বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ পদ  'সি জি এস' এর দায়িত্ব দেয়া হয়। এই পদে আগে ছিলেন ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ। খালেদ শাফাযাতের ব্যর্থ অভ্যূত্থানের পর তাদের অনুগত মুক্তিযুদ্ধা অফিসারদের চাকুরিচ্যুত করা হলেও, জেঃ মঞ্জু ও অন্যান্য মুক্তিযুদ্ধারা জিয়ার অনুগত হিসাবে সেনাবাহিনীতে  থেকে যান। এইভাবে দেখা যাচ্ছে সেনা বাহিনীতে মুক্তিযুদ্ধা অফিসাররা ঐক্যবদ্ধ থাকার পরিবর্তে বিভিন্ন সময়ে আলাদা আলাদা শিবিরে বিভক্ত হয়ে পরস্পরের সাথে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়েছেন।

জিয়ার জেড ফোর্সে থাকা মুক্তিযুদ্ধা লেঃ কর্ণেল নুরুননবী এবং লেঃ কর্ণেল দিদারুল আলম ৮০সালে অভ্যূত্থান পরিকল্পনা করে ব্যর্থ হয়ে ছিলেন। 

রাজনীতিতে শক্ত অবস্থান তৈরী করার জন্য জিয়া মুক্তিযুদ্ধা হয়েও মুক্তিযুদ্ধ বিরুধীদের তার রাজনৈতিক দলে স্থান দিয়েছিলেন। একাত্তরে পাকিস্থানের দালাল ডান পন্তী নেতা শাহ আজিুর রহমানকে  কি করে প্রধান মন্ত্রী করা হল জিয়া নিহত হবার দুই মাস আগে ঢাকায় সেনাবাহিনীর এক অনুষ্টানে মুক্তিযুদ্ধা অফিসাররা রাষ্ট্রপতি জিয়াকে সরাসরি প্রশ্ন করেছিলেন। (সহায়ক সূত্র-,ত্রিশোনকু মল্লিক, চট্টগ্রাম বিদ্রোহ,পৃষ্টা ৮)  এছাড়া পাকিস্থান প্রত্যাগত জেঃ এরশাদকে সেনা প্রধান করায়ও তারা মনক্ষুন্ন হন।

এর আগেও ১৯৭৭সালে আর এক ব্যর্থ অভ্যূত্থানের পর দুই জৈষ্ট মুক্তিযুদ্ধা অফিসার আবুল মঞ্জুর আর মীর শওকত আলীকে যথাক্রমে চট্টগাম আর যশোর সেনানিবাসে জি ও সি করে দূরে সরিয়ে দেওয়া হয়। তখন ঢাকা সেনা সদরের গুরুত্বপূর্ণ পদসমূহ চলে আসে পাকিস্থান প্রত্যাগতদের দখলে।

এছাড়া জিয়া সেনা বাহিনীর সমর্থনে ক্ষমতায় গিয়েও ক্রমশ সেনা বাহিনী থেকে দূরে সরে দলীয় রাজনীতির দিকে ঝুঁকে পড়া পার্ব্বত্য এলাকার শান্তি প্রতিষ্টা নিয়ে মতবিরোধ, সামরিক বাহিনীর কিছু কর্মকর্তা এবং তার দল বি এন পি'র কিছু নেতার দূর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়া ইত্যাদী বিষয়ও সেনাবাহিনী তথা জেঃ মঞ্জুর জিয়ার প্রতি ক্ষুদ্ধ হয়েছিলেন বলে জানা যায়। (সহায়ক সূত্র-পৃ১৫৪-১৫৫,জুফিকার আলী মানিক, জিয়া হত্যাকান্ড,)

এরশাদের সাথেও মঞ্জুর ভাল সম্পর্ক ছিল না। এরশাদের অনুগত পাকিস্থান প্রত্যাগত অফিসার আর মঞ্জুর অনুগত মুক্তিযুদ্ধা অফিসারদের মধ্যে একটি বৈরী সম্পর্ক বিরাজ করছিল বলে মনে করা হয়। জিয়া মুক্তি যুদ্ধা অফিসারদের নিকট প্রিয় হলেও তাঁর পাকিস্থান প্রত্যাগতদের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ মুক্তিযুদ্ধা অফিসাররা তা পছন্দ করেননি। তারা এতে তাঁর প্রতি অসন্তুষ্ট ছিলেন।

আর একটি বিষয় লক্ষনীয় যে জিয়া হত্যার কিছুদিন আগে জেঃ মঞ্জুকে বদলী করা হয় ঢাকায় ডিফেন্স সার্ভিসেস কমান্ড এন্ড ষ্টাফ কলেজে কমানডেন্ট হিসাবে। এর অর্থ মঞ্জু আর পদাতিক ডিভিসনের সক্রিয় কমান্ডে থাকবেন না। উপরন্তু ষ্টাফ কলেজের কমানডেন্ট হিসাবে তাকে সি জি এসের নির্দেশ মানতে হবে। সি জি এস পদে মঞ্জু কয়েক বৎসর আগেই ছিলেন। ফলে বদলীর এই আদেশ মঞ্জুর সহ তার অনুরক্ত মুক্তিযুদ্ধা অফিসাররা মেনে নিতে পারেননি।  এতেও মঞ্জু এবং তার অনুরক্তরা রাষ্ট্রপতি জিয়ার প্রতি ক্ষুদ্ধ ছিলেন।

জিয়া যে রাতে নিহত হয়েছেন সে রাতেও আইন শৃঙ্খলা পরিস্তিতি নিয়ে আলোচনায় চট্টগ্রামের পুলিশ কমিশনাররা জিয়াকে  জানান, বি এন পি'র চল্লিশ নেতা কর্মীর বিরুদ্ধে বেআইনী জমি দখল, বেআইনী অস্ত্র বহন, শহরে সন্ত্রাসের সাথে  জড়িত থাকার কথা। 

তার দলের নেতাদের এসকল দূর্নীতি, সন্ত্রাস, বেআইনী দখল সব বিষয়ও সেনা বহিনীকে ক্ষুদ্ধ করেছিল।

এসব কারনে সম্ভবত জিয়ার বিরুদ্ধে অভ্যূত্থান সংগঠন এবং হত্যার প্রক্ষাপট তৈরী হয়।

প্রান্তের ভাবনা:-প্রান্ত  পাকিস্থানী স্বৈরাচারী শাসন, মুক্তিযুদ্ধ,  মুক্তি যুদ্ধকে ঘিরে লক্ষ লক্ষ বাঙালীর মত তার জীবনের করুন ট্রেজেডী, তারপর ৭৫এ বঙ্গবন্ধুকে স্বপরিবারে হত্যার পর একে একে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে সেনাবাহিনী থেকে  মুক্তিযুদ্ধাদের নিধন করে মুক্তিবাহিনী শূন্য সেনাবাহিনী করা। এসব দেখে দেখে অন্যান্য মুক্তিযুদ্ধাদের মত তারও আক্ষেপ করা ছাড়া আর কিছুই করার ছিল না। সে প্রায়ই  ভাবে বঙ্গবন্ধু কি জীবনের ওপার থেকে আমাদের অভিশাপ দিচ্ছে ?  আমরা কেন এক মুক্তিযুদ্ধা ভাই আর এক মুক্তিযুদ্ধা ভাইয়ের রক্ত নিয়ে হুলি খেলছি? সে স্তির করল একদিন টুঙ্গীপাড়ায় বঙ্গবন্ধুর মাজারে যাবে, মুক্তিযুদ্ধা তথা বাঙালী জাতির হয়ে  তাঁর কাছে ক্ষমা চাইবে। বঙ্গবন্ধুর কবর জিয়ারত করে তার আত্মার শান্তি কামনা করবে।

সাত্তারের ক্ষমতায় অধিষ্টান:-প্রসিডেন্ট জিয়ার হত্যাকান্ডের পর উপ রাষ্টপতি বিচারপতি সাত্তার অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসাবে ক্ষমতায় অধীষ্টিত হন। ক্ষমতায় অধিষ্টিত হয়ে তিনি চল্লিস দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষনা করেন। দেশে জরুরী অবস্থা জারী করেন। এরপর সংবিধান অনুযায়ী ১৮০দিনের মধ্যে প্রসিডেন্ট নির্বাচন করার বাধ্যবাধকতা থাকায় তিনি ৪ঠা জুন ১৯৮১ সালে  প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের তারিখ ঘোষনা করেন। বিএনপি অস্থায়ী প্রসিডেন্ট বিচারপতি সাত্তারকে ২২শে জুন তাদের প্রার্থী ঘোষনা করেন। সাত্তারের প্রার্থী হওয়া নিয়ে আইনী জঠিলতা সৃষ্টি হলে এ নিয়ে তুমুল বিতর্কের সৃষ্টি হয়। সরকার ৮ই জুলাই সংবিধানের ষষ্ঠ সংশোধনী এনে সাত্তারের প্রার্থীতা নিয়ে আইনী জঠিলতা দূর করেন। ১৯৮১ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তিনি বিজয়ী হয়ে রাষ্টপতি নির্বাচিত হন। ১৯৮২ সালে ২৪শে মার্চ এক রক্তপাতহীন সামরিকঅভ্যূত্থানে বিচারপতি সাত্তারকে ক্ষমতাচ্যূত করে  হোসেন মোহাম্মদ এরশাদ বাংলাদেশের রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করেন। ( বিচারপতি সাত্তার বাংলা পিডিয়া)

  শেখ হাসিনার দেশে প্রত্যাবর্তন:-১৭ মে ১৯৮১ সাল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ তথা বাংলার মানুষের জন্য একটি স্বরনীয় দিন। জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমানের দূই জীবিত কন্যার একজন শেখ হাসিনা আজ দেশে ফিরেছেন। ১৭ মে বিকেলে তাঁর বিমান ঢাকা বিমান বন্দরে অবতরন করেন। কিন্তু যে বাংলা দেশে তিনি ফিরে আসেন সে বাংলাদেশে তিনি আর খুঁজে পায়নি তাঁর বিশ্ব কাঁপানো জনক বঙ্গবন্ধুকে। ফিরে পায়নি সেই স্বাসতঃ বাঙ্গালী মায়ের প্রতিছবি স্নহময়ী জননীকে। ফিরে পায়নি ভাই ভাবীদের। ফিরে পায়নি েসই ছোট্ট রাসেলকে যে সাইকেল চালাতে চালাতে বোনের কাছে আসত শিশুতোষ নানা আবদার নিয়ে।

    আজ ১৭ মে বৃষ্টি যেন তার শোকাচ্ছন ধূষরতা নিয়ে একত্বতা ঘোষনা করেছিল পিতৃ মাতৃহীন বঙ্গ পিতার কন্যা শেখ হাসিনার শোকের সাথে। প্রকৃতি সারাদিন কেঁদেছিল, অঝোর ধারায় কেঁদেছিল প্রকৃতির কান্না আর বঙ্গবন্ধুর কন্যার অশ্রু একাকার হয়ে গিয়েছিল পদ্মা মেঘনা যমুনা কর্নফুলী স্রোত ধারায় মিলিত হয়ে। যে স্রোতের গর্জনে এখনো বঙ্গবন্ধু কথা কয়, যে স্রোতের কল্লোলে ধ্বনীত হয় জয় বাংলা, যে নদীর কাশবন পাড়ে বঙ্গবন্ধু এখনো ফুল হয়ে@#@#$$#@$#@দোলে। অতঃপর এসেছিলেন শেখ হাসিনা বৃষ্টিধূষর চোখে, আর আবেগ জড়িত কন্ঠে চিৎকার করে বলেছিলেন, আমি আমার পিতৃ হত্যার বিচার চাই, বিমান বন্দরে লাখ লাখ মানুষ তার সাথে সূর মিলায়ে বলেছিল, 'জনক হত্যার বিচার চাই।' 'জনক হত্যার বিচার চাই।'

প্রান্তুও গিয়েছিল বঙ্গবন্ধু কন্যাকে দেখতে ঢাকায়, লক্ষ জনতার কতারে দাঁড়িয়ে সেও আওয়াজ তুলেছিল 'জনক হত্যার বিচার চাই।' কে করবে বিচার?  যারা বঙ্গবন্ধু হত্যার বেনিফিশিয়ারী, যারা হত্যাকারীদের পৃষ্টপোষক, যারা বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার ঠেকাতে আইন করেছে তাদের কাছে কি বিচার পাওয়া যাবে? তবু কেন জানি মন বলছে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার একদিন হবেই হবে। তাঁর মনের গহীন কোন থেেক সে চাওয়াটা রের হয়ে আসছে দৃড় প্রত্যয়ে।

এরপর পিতৃমাতৃহীন স্বজন হারা পরিবেশে জনক কন্যার শুরু হল এক সংগ্রামী জীবন। দলকে পুর্গঠন এবং গনতন্ত্র পুনরুদ্ধারে তিনি সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। দলের হাজার হাজার কর্মী তখনো কারগারে বন্দী, মিথ্যা মামলা আর  হুলিয়া মাথায় নিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে অনেকে। মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী সংগঠন আওয়ামীলীগকে ধংষ করার যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে তাকে ব্যর্থ করে দিতে হবে। ভয়ভীতি প্রদর্শন, অর্থ বিত্ত আর ক্ষমতার লোভ দেখিয়ে দল ভেঙ্গে নেতাকর্মীদের ক্ষমতাসীন দলে  ভিড়ানোর চেষ্টা,  কখনো কখনো দলীয় কার্যক্রম থেকে নেতা কর্মীদের নিস্কৃীয় করতে যে ষড়যন্ত্র চলছে তা পরাভূত করতে তিনি বিচক্ষনতার সহিত সাহস নিয়ে  এগিয়ে চলছেন। আর এইভাবে সামরিক ও স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে দেশবাসীকে ঐক্যবদ্ধ করতে সংগ্রামের মধ্য দিয়ে তার যাত্রা শুরু। (সহায়ক সূত্র-কেমন ছিল বাংলাদেশ, ৭৫-৮১,গোলাম কুদ্দুছ)

 

এরশাদের ক্ষমতা দখল :-বাংলাদেশের রাজনীতিতে ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যার সব চেয়ে বেশী বেনিফিশিয়ারী হলেন জিয়াউর রহমান। জিয়াউর রহমানের পর সবচেয়ে লাভবান হলেন হোসেন মোহাম্মদ এরশাদ। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর শফি উল্লাহকে সরিয়ে জিয়াকে ষখন Army chif of staff করা হয়, খুনী মোশতাক ও ডালিম ফারুকদের দ্বিতীয় পছন্দননীয় ব্যক্তি ছিল ভারতের ন্যাশনাল  ডিফেন্স কলেজে প্রতিরক্ষা কোর্সে প্রশিক্ষনরত সামরিক অফিসার এরশাদ। তাই তাকে মেজর জেনারেল পদোন্নতি দিয়ে করা হয় Deputy chief of army staff। কারন  বঙ্গবন্ধু হত্যাকারীদের সাথে জিয়ার মত তারও  ছিল ঘনিষ্ট ও সৌহার্দপূর্ণ যোগাযোগ।

১৫ই আগষ্ট বঙ্গবন্ধু হত্যার পর তিনি দিল্লীতে প্রশিক্ষনরত অবস্থায় দেশে আসেন এবং বঙ্গবন্ধুর খুনীদের সাথে বৈঠকও করেন। জিয়ার শিষ্য এরশাদও ছিল জিয়ার মত।  জিয়া যেমন উচ্ছাকাঙ্খী ছিেলন তেমনি এরশাদও ছিলেন উচ্ছাকাঙ্খী। তিনি তার এই উচ্ছাকাঙ্খা মনের ভিতর পুষে রেখেছিলেন। জিয়াকে গুনাক্ষরেও বুঝতে দেয়নি। তাই জিয়াউর রহমান বিশ্বাস করে তাকে Army chief of staff পদে নিয়োগ দেন। কিন্তু এরশাদ জিয়ার সেই বিশ্বাসের মূল্য দেননি।(জিয়া যেমন দেননি বঙ্গবন্ধুর বিশ্বাসের মূল্য) তিনিও তাঁর গুরুর মত সুযোগের সৎ ব্যবহার করে তার রাজনৈতিক দূরভিসন্ধি চরিতার্থ করেছেন। ১৯৮১ সালে ৩০মে রাষ্টপতি জিয়া সামরিক অভ্যুত্থানে নিহত হলে তার অব্যবহিত পর থেকেই সংবাদ পত্রে  বিবৃতি ও কভারেজের মাধ্যমে রাজনীতিতে এরশাদের আগ্রহের প্রকাশ ঘটতে থাকে। ক্ষমতা দখলের লক্ষে প্রায় দশ মাস ধরে ক্ষেত্র প্রস্তুত করতে থাকেন তিনি। প্রকাশ্য ও গোপনে চালিয়েছেন নানা তৎপরতা।জিয়া নিহত হবার পাঁচ মাসের মাথায় ১১ই অক্টোবর লন্ডনের গার্ডিয়ান পত্রিকায় এক সাক্ষাৎকারে তিনি দেশ পরিচালনায় সেনাবাহিনীর অংশিদারিত্ব দাবী করেন। সেনাবাহিনীর এ ভূমিকার প্রাতিষ্টানিক রূপ দেয়ার জন্য তিনি সাংবিধানের প্রয়োজনীয় সংশোধনীরও প্রস্তাব দেন। ২৮ নভেম্বর  পত্রিকা সম্পদকদের তার অফিসে আমন্ত্রণ জানিয়ে তিনি একটি লিখিত বক্তব্য তাদের হাতে তুলে দেন। যার শিরোনাম ছিল Role of military in Bangladash. যেখানে স্পষ্ট করে বলা হয় সেনা বাহিনী দেশ রক্ষার কাজ করবে সাথে সাথে দেশ পরিচালনাও করবে। সার্বভৌমত্ব শুধু সীমান্ত রক্ষার উপর নির্ভর করেনা, এদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের উপরও নির্ভর করে। সুতরাং এ দু কাজে সেনাবাহিনীকে নিয়োজিত থাকতে হবে। এরশাদের এ ধরনের প্রস্তাব কোন নির্বাচিত সরকারের পক্ষে মেনে নেওয়া সম্ভব ছিলনা। ২৯ নভেম্বর এরশাদের এধরনের প্রস্তাবের খবর প্রকাশিত হবার পর বিচারপতি সাত্তার তার ঘনিষ্ট কয়জন মন্ত্রির সাথে বৈঠক করেন। কেউ তাকে তৎক্ষনাৎ বরখাস্ত করতে বলেন, কেউ  ভেবে চিন্তে কাজ করতে বলেন। বঙ্গভবনের এই আলোচনার খবর দ্রুত এরশাদের কাছে পৌছে যায়। এরপর এরশাদ তার চির শঠতার স্বভাব অনুযায়ী প্রেসিডেন্ট সাত্তারের সাথে সাক্ষাৎ করে সম্পাদকদের কাছে দেওয়া বক্তব্য অস্বীকার করেন এবং ভূল স্বীকার করেন।  এভাবে এরশাদের ক্ষমতা দখলের প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকে।

এদিকে মন্ত্রী পরিষদের সদস্যরাও বিভক্ত হয়ে পড়ে। এক পক্ষ প্রেসিডেন্ট সাত্তারের প্রতি আস্থা রাখলেও অন্য পক্ষ তার কতৃত্বকে চেলেঞ্জ করে। প্রভাবশালী মন্ত্রী তৎকালীন স্বরাষ্ট মন্ত্রী আব্দুল মতিনের সাথে প্রতিমন্ত্রী আবুল কাশেমের বিরোধ ছিল প্রকট। এই বিরুধের জের ধরেই খুনের আসামী সন্ত্রাসী এমদাদুল হক ইমদুকে কাসেমের বাড়ী থেকে গ্রেফতার করা হয়। এসংবাদটা আগুনের মত চারিদিকে ছড়িয়ে পড়লে সরকারের প্রতি স্বাধারন মানুষের ঘৃনার উদ্রেক হয় এবং নব নির্বাচিত সরকারের ভাবমূর্তিও নষ্ট হয়। এ দূর্নামটাকেও পুঁজি করে এরশাদ।

  রাষ্ট্রপতি সাত্তার ক্ষমতায় ঠিকে থাকতে সামরিক বাহিনীর সাথে বুঝা পরার কম চেষ্টা করেন নাই। তিনি এরশাদের প্রস্তাব অনুযায়ী সেনাবাহিনীকে প্রশাসনের সাথে সম্পৃক্ত রাখার জন্য জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিল গঠন করেন। এতে বেসামরিক প্রশাসনে সামরিক হস্তক্ষেপ বেড়ে

 

যায়। তাদের কথামত ১১ইফেব্রুয়ারী মন্ত্রসভা বিলুপ্ত করে নতুন মন্ত্রীসভা গঠন করা হয়। কিন্তু যাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির ব্যাপক অভিযোগ ছিল তারা বহাল থাকায় কিছু সেনা কর্মকর্তা ১৯ শে ফেব্রুয়ারী বঙ্গবভনে গিয়ে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ পেশ করেন। এবং সেনবাহিনীর নিকট ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য চাপ দেন। সাত্তার অদক্ষ ও দুর্নীতিবাজদের মন্ত্রীসভা থেকে বাদ দিতে রাজি হলেও ক্ষমতা হস্থান্তরে রাজি হননি।

 ১৯ ফেব্রুয়ারীর এ হস্তক্ষেপের পর এরশাদ একটি মোক্ষম সময়ের জন্য অপেক্ষা করছিল।

তারপর মোক্ষম সময় হিসাবে বেছে নিল ১৯৮২ সালের ২৪শে মার্চ। ২৪শে মার্চ সকালে এরশাদের অনুগত একদল সামরিক অফিসার বঙ্গবভনে গিয়ে বন্দুকের মুখে রাষ্ট্রপতি আব্দুছ সাত্তারের সরকারকে উৎখাত করে ক্ষমতা দখল করে নেয়। (তাঁর গুরু জিয়াউর বহমান যেমন  বিচারপতি সয়েমকে করেছিল)সেদিন বিকালে বেতার এবং টিভিতে দেয়া ভাষনে এরশাদ বলেন, "জনগনের ডাকে সাড়া দিয়ে তাকে ক্ষমতা গ্রহন করতে হয়েছে। এছাড়া আর কোন বিকল্প পথ ছিলনা। এক সাক্ষাৎকারে তিনি আরো বলেন, "তিনি ক্ষমতা দখল করেননি রাষ্ট্রপতি সেচ্ছায় তার হাতে ক্ষমতা তুলে দিয়েছেন।"


 

১৪ তম পর্ব “চোখে দেখা রাজনীতি”র এ পর্বে আছে ঳ জিয়া হত্যার বিচার

 

জিয়া হত্যার বিচার :- '১৯৮১ সালে ৩০মে একটি সামরিক অভ্যূত্থান পরিচালনা করে জিয়াউর রহমানকে হত্যা করার পর, এর দায় পড়ে সেনা বাহিনীর চট্টগ্রাম ডিভিশনের  জিওসি মেজর জেনারেল মঞ্জুর  উপর। পুলিশের হাতে জেনারেল মঞ্জুর গ্রেফতার হওয়ার পর সেই সময়ের সেনা প্রধান লেঃ জেঃ এরশােদর পরামর্শে প্রেসিডেন্ট সাত্তার মঞ্জুকে সেনা হফাজতে দিতে নির্দেশ দেন। প্রসিডেন্টের নির্দেশ পেয়ে  চট্টগ্রাম পুলিশ, চট্টগ্রামের কমিশনার এবং জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে তাকে সেনাবাহিনীর হাতে হস্তান্তর করা হয়।সেনা হফাজতে নেয়ার পরের দিনই সরকার এক প্রেস নোট জারী করে বলে যে কিছু উশৃঙ্খল সেনা সদস্য তাকে হত্যা করেছে।

 জিয়া হত্যার জন্য জেনারেল মঞ্জুকে দায়ী করা হলেও তাকে বিচারের আওতায় না এনে সরাসরি হত্যা এবং তড়িঘড়ি করে কোর্ট মার্শালে বিচারের বিচারের মাধ্যমে তার অনুগত মুক্তিযুদ্ধা সেনা কর্মকর্তাদের ফাঁসী দেওয়া এবং পরবর্তীতে মঞ্জু হত্যাকারীদের বিচারের আওতায় না আনা, এসব বিভিন্ন প্রশ্নবিদ্ধ কর্মকান্ডের কারনে জনমনে অনেক সন্দেহ আর প্রশ্নের জন্ম দেয়। জিয়া হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী কে তা আজো রহস্যাবৃতই রয়ে গেল। এর

 যঠ কখনো খুলবে আর মনে হয়না। (সহায়ক সূত্র-,জিয়া হত্যাকান্ডের নেপথ্যে ষড়য়ন্ত্র-৩, জুন৪,২০১৭,on line)

   জিয়া হত্যাকান্ডের পর তাড়িঘড়ি করে তৎকালীন সেনা প্রধান এরশাদের নির্দেশে এবং তত্বাবদানে গঠিত হয় একটি কোর্ট মার্শাল। ওই কোর্ট মর্শালের ডিফেন্ডিং অফিসার কর্ণেল আয়েন উদ্দীন এবং এই হত্যাকান্ড নিয়ে গবেষনা করা সাংবাদিক জুলফিকার আলী মানিকের মতে বিচারটি ছিল নীল নক্সা বাস্তবয়নের বিচার। যার মূল উদ্দশ্য ছিল সেনা বাহিনী থেকে মুক্তিযুদ্ধা নিধন। জুলফিকার আলী মনিক 'জিয়া হত্যাকান্ড নীল নকসার বিচার' গবেষনা মূলক বইয়ে লিখেছেন "রাষ্ট্রপতি জিয়া হত্যাকান্ডকে কেন্দ্র করে  সেনাবাহিনীতে কোর্ট মার্শলে গোপন বিচারটি ছিল  পুরোপুরি প্রহসন ও সাজানো নাটক। সেনাবাহিনীতে মুক্তিযুদ্ধা নিধনের নীল নক্সার অংশ হিসাবে তা আগে থেকে নির্ধারন করে রাখা হয়েছিল কাদের বিচার হবে কি শাস্তি পাবে।"

এখানে লক্ষনীয় বিষয় হল কোর্ট মার্শালের বিচারের  জন্য যে সামরিক আদালত গঠন করা হয় তার সাত সদস্যের ছয় সদস্যই ছিল পাকিস্থান প্রত্যাগত। শুধু এক জন সদস্য কর্ণেল মতিউর রহমান ছিলেন মুক্তিযুদ্ধা। জানা যায় এই কোর্টের প্রধান ছিলেন মেজর জেনারেল আব্দুর রহমান তিনিও একজন পাকিস্থান প্রত্যাগত। শুধু তাই নয় তিনি মুক্তিযুদ্ধা বিদ্বষী লোক ছিলেন বলেও জানা যায়। (মানিক, পৃষ্টা-৫৯)

আর একটি লক্ষনীয় বিষয় ছিল কোর্ট মার্শালে অভিযুক্ত ছিল শুধু মুক্তিযুদ্ধা অফিসাররা। সেই সময় চট্টগ্রাম সেনানিবাসের চার ব্রিগেড কমান্ডের তিন জনই ছিলেন মুক্তি যুদ্ধা, ব্রিগেডিয়ার মহসীন, কর্নেল নোয়াজিশ ও কর্নেল রশীদ। এই তিন জনকেই কোর্ট মার্শালে ফাঁসী দেওয়া হয়। অপর ব্রিগেড কমান্ডার ছিলেন পাকিস্থান প্রত্যাগত কর্নেল লতিফ তাকে অভিযুক্তও করা হয়নি।

    দুঃখের বিষয় হলো এই কোর্টের সাত সদস্যের একজনও যদি এই রায়ের সাথে দ্বিমত পোষন করতেন তাহলে এ প্রহসনের বিচার থেকে আমাদের মুক্তিযুদ্ধা ভায়েরা বেঁছে যেতেন।  অন্তত সাত জনের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধা বিচারক কর্ণেল মতিউর রহমান যদি বলতেন ফাঁসী দেওয়ার ব্যাপারে আমি একমত নিই।  তাহলে ফাঁসী দেওয়া যেত না। তাই কতৃপক্ষ মুক্তিযুদ্ধাদের ভিতর থেকে এমন একজনকে বেছে নিয়েছেন যার কাছ থেকে মন মত ব্যবহার পাওয়া যাবে। (মানিক,পৃষ্টা-৪৯)

কোর্ট মার্শালে অভিযুক্তদের পক্ষে মামলার ডিফেন্ডার 'আইন উদ্দিন', এবং কোর্ট মর্শালে দশ বছরের কারাদণ্ড প্রাপ্ত মেজর রেজাউল করিম পরবর্তীতে উল্লেখ করেছেন, ব্রিগেডিয়ার মহসীন এবং কর্নেল মাহফুজের সারা দেহ এবং  হাতের নক উপড়ে ফেলে টর্চার করে তাদের কাছ থেকে স্বীকারোক্তিমূলক জবাব বন্দী আদায় করা হয়। যা মিলেটারী বা সিভিল কোন আইনে নাই।

 এখানে আরো একটি অবাক করা কান্ড হলো জিয়া হত্যাকান্ডকে কেন্দ্র করে যে কোর্ট মার্শাল গঠিত হয় তাতে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে জিয়া হত্যা কান্ডে জড়িত থাকার কোন অভিযোগ আনা হয়নি। তাদের বিরুদ্ধে যে তিনটি বিষয়ে অভিযোগ আনা হয়েছিল তাহল, ১) বাংলাদেশ সামরিক বাহিনীতে বিদ্রোহ ঘটানো ২) বাংলাদেশ সামরিক বাহিনীতে সংঘটিত বিদ্রোহে যোগদান। ৩) বাংলাদেশ সামরিক বাহিনীতে বিদ্রোহের উস্কানী দেওয়া।

১৯৮১ সালে জিয়া হত্যা কান্ডকে কেন্দ্র করে গঠিত মার্শাল ল কোর্টে মোট তের জন মুক্তিযুদ্ধা অফিসারকে ফাঁসী দেওয়া হয়। তার মধ্যে পাঁচজন ছিলেন খেতাব প্রাপ্ত মুক্তি যুদ্ধা। খেতাব প্রাপ্তদের মধ্যে তিনজন ছিলেন বীর বিক্রম, দুই জন ছিলেন বীর প্রতীক।

বিভিন্ন সূত্রের বরাত দিয়ে ---লেখক জুলফিকার আলী মানিক লিখেছেন, ওই বিচারের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধা নিধনের আর একটি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হয়েছে, সেক্ষেত্রে অভিযুক্তদের মধ্যে যারা বেঁচে থাকলে সমস্য হতে পারে তাদেরকে ফাঁসী দেয়া হয়। (সহায়ক সূত্র-চেনেলআই অন লাইন,২০শে অক্টোবর ২০১৭)   

(জিয়া হত্যার নয়, সেনা বিদ্োহের বিচার হয়। দন্ডিত বেশীর ভাগই মুক্তি যুদ্ধা, চেনেল আই,) (জিয়া হত্যাকান্ডের নেপথ্যে ষড়যন্ত্রের, নেপথ্যে ষড়যন্ত্র-২ চেনেল আই),(৩,অপন ভূবন অন লাইন/, সাখাওয়াত আল আমিন ) (জুলফিকার আলী মনিক, জিয়া হত্যাকান্ড, নীল নকসার বিচার।)

জিয়া হত্যার সম্ভাব্য কারণ :-মুক্তিযুদ্ধের পর কর্ণেল তাহেরের মত জিয়ার  সাথে  জেঃ মঞ্জুরও ঘনিষ্টতা ছিল। ৭ই নভেম্বেরর পর জিয়ার আস্থাভাজন জেঃ মঞ্জুকে সেনা বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ পদ  'সি জি এস' এর দায়িত্ব দেয়া হয়। এই পদে আগে ছিলেন ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ। খালেদ শাফাযাতের ব্যর্থ অভ্যূত্থানের পর তাদের অনুগত মুক্তিযুদ্ধা অফিসারদের চাকুরিচ্যুত করা হলেও, জেঃ মঞ্জু ও অন্যান্য মুক্তিযুদ্ধারা জিয়ার অনুগত হিসাবে সেনাবাহিনীতে  থেকে যান। এইভাবে দেখা যাচ্ছে সেনা বাহিনীতে মুক্তিযুদ্ধা অফিসাররা ঐক্যবদ্ধ থাকার পরিবর্তে বিভিন্ন সময়ে আলাদা আলাদা শিবিরে বিভক্ত হয়ে পরস্পরের সাথে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়েছেন।

জিয়ার জেড ফোর্সে থাকা মুক্তিযুদ্ধা লেঃ কর্ণেল নুরুননবী এবং লেঃ কর্ণেল দিদারুল আলম ৮০সালে অভ্যূত্থান পরিকল্পনা করে ব্যর্থ হয়ে ছিলেন। 

রাজনীতিতে শক্ত অবস্থান তৈরী করার জন্য জিয়া মুক্তিযুদ্ধা হয়েও মুক্তিযুদ্ধ বিরুধীদের তার রাজনৈতিক দলে স্থান দিয়েছিলেন। একাত্তরে পাকিস্থানের দালাল ডান পন্তী নেতা শাহ আজিুর রহমানকে  কি করে প্রধান মন্ত্রী করা হল জিয়া নিহত হবার দুই মাস আগে ঢাকায় সেনাবাহিনীর এক অনুষ্টানে মুক্তিযুদ্ধা অফিসাররা রাষ্ট্রপতি জিয়াকে সরাসরি প্রশ্ন করেছিলেন। (সহায়ক সূত্র-,ত্রিশোনকু মল্লিক, চট্টগ্রাম বিদ্রোহ,পৃষ্টা ৮)  এছাড়া পাকিস্থান প্রত্যাগত জেঃ এরশাদকে সেনা প্রধান করায়ও তারা মনক্ষুন্ন হন।

এর আগেও ১৯৭৭সালে আর এক ব্যর্থ অভ্যূত্থানের পর দুই জৈষ্ট মুক্তিযুদ্ধা অফিসার আবুল মঞ্জুর আর মীর শওকত আলীকে যথাক্রমে চট্টগাম আর যশোর সেনানিবাসে জি ও সি করে দূরে সরিয়ে দেওয়া হয়। তখন ঢাকা সেনা সদরের গুরুত্বপূর্ণ পদসমূহ চলে আসে পাকিস্থান প্রত্যাগতদের দখলে।

এছাড়া জিয়া সেনা বাহিনীর সমর্থনে ক্ষমতায় গিয়েও ক্রমশ সেনা বাহিনী থেকে দূরে সরে দলীয় রাজনীতির দিকে ঝুঁকে পড়া পার্ব্বত্য এলাকার শান্তি প্রতিষ্টা নিয়ে মতবিরোধ, সামরিক বাহিনীর কিছু কর্মকর্তা এবং তার দল বি এন পি'র কিছু নেতার দূর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়া ইত্যাদী বিষয়ও সেনাবাহিনী তথা জেঃ মঞ্জুর জিয়ার প্রতি ক্ষুদ্ধ হয়েছিলেন বলে জানা যায়। (সহায়ক সূত্র-পৃ১৫৪-১৫৫,জুফিকার আলী মানিক, জিয়া হত্যাকান্ড,)

এরশাদের সাথেও মঞ্জুর ভাল সম্পর্ক ছিল না। এরশাদের অনুগত পাকিস্থান প্রত্যাগত অফিসার আর মঞ্জুর অনুগত মুক্তিযুদ্ধা অফিসারদের মধ্যে একটি বৈরী সম্পর্ক বিরাজ করছিল বলে মনে করা হয়। জিয়া মুক্তি যুদ্ধা অফিসারদের নিকট প্রিয় হলেও তাঁর পাকিস্থান প্রত্যাগতদের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ মুক্তিযুদ্ধা অফিসাররা তা পছন্দ করেননি। তারা এতে তাঁর প্রতি অসন্তুষ্ট ছিলেন।

আর একটি বিষয় লক্ষনীয় যে জিয়া হত্যার কিছুদিন আগে জেঃ মঞ্জুকে বদলী করা হয় ঢাকায় ডিফেন্স সার্ভিসেস কমান্ড এন্ড ষ্টাফ কলেজে কমানডেন্ট হিসাবে। এর অর্থ মঞ্জু আর পদাতিক ডিভিসনের সক্রিয় কমান্ডে থাকবেন না। উপরন্তু ষ্টাফ কলেজের কমানডেন্ট হিসাবে তাকে সি জি এসের নির্দেশ মানতে হবে। সি জি এস পদে মঞ্জু কয়েক বৎসর আগেই ছিলেন। ফলে বদলীর এই আদেশ মঞ্জুর সহ তার অনুরক্ত মুক্তিযুদ্ধা অফিসাররা মেনে নিতে পারেননি।  এতেও মঞ্জু এবং তার অনুরক্তরা রাষ্ট্রপতি জিয়ার প্রতি ক্ষুদ্ধ ছিলেন।

জিয়া যে রাতে নিহত হয়েছেন সে রাতেও আইন শৃঙ্খলা পরিস্তিতি নিয়ে আলোচনায় চট্টগ্রামের পুলিশ কমিশনাররা জিয়াকে  জানান, বি এন পি'র চল্লিশ নেতা কর্মীর বিরুদ্ধে বেআইনী জমি দখল, বেআইনী অস্ত্র বহন, শহরে সন্ত্রাসের সাথে  জড়িত থাকার কথা। 

তার দলের নেতাদের এসকল দূর্নীতি, সন্ত্রাস, বেআইনী দখল সব বিষয়ও সেনা বহিনীকে ক্ষুদ্ধ করেছিল।

এসব কারনে সম্ভবত জিয়ার বিরুদ্ধে অভ্যূত্থান সংগঠন এবং হত্যার প্রক্ষাপট তৈরী হয়।

প্রান্তের ভাবনা:-প্রান্ত  পাকিস্থানী স্বৈরাচারী শাসন, মুক্তিযুদ্ধ,  মুক্তি যুদ্ধকে ঘিরে লক্ষ লক্ষ বাঙালীর মত তার জীবনের করুন ট্রেজেডী, তারপর ৭৫এ বঙ্গবন্ধুকে স্বপরিবারে হত্যার পর একে একে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে সেনাবাহিনী থেকে  মুক্তিযুদ্ধাদের নিধন করে মুক্তিবাহিনী শূন্য সেনাবাহিনী করা। এসব দেখে দেখে অন্যান্য মুক্তিযুদ্ধাদের মত তারও আক্ষেপ করা ছাড়া আর কিছুই করার ছিল না। সে প্রায়ই  ভাবে বঙ্গবন্ধু কি জীবনের ওপার থেকে আমাদের অভিশাপ দিচ্ছে ?  আমরা কেন এক মুক্তিযুদ্ধা ভাই আর এক মুক্তিযুদ্ধা ভাইয়ের রক্ত নিয়ে হুলি খেলছি? সে স্তির করল একদিন টুঙ্গীপাড়ায় বঙ্গবন্ধুর মাজারে যাবে, মুক্তিযুদ্ধা তথা বাঙালী জাতির হয়ে  তাঁর কাছে ক্ষমা চাইবে। বঙ্গবন্ধুর কবর জিয়ারত করে তার আত্মার শান্তি কামনা করবে।


সোমবার, ৫ সেপ্টেম্বর, ২০২২

১৩ তম পর্ব “চোখে দেখা রাজনীতি”র এ পর্বে আছে ঳ ৩০শে মে ১৯৮১ জিয়ার মৃত্যু ঳ জিয়া ও বঙ্গবন্ধু হত্যায় কিছু মিল

                             

৩১মে'র অভ্যূত্থান ও জিয়ার মৃত্যু :-

 ১৯৭১ সালে ২৮ মার্চ স্বাধীনতার ২য় ঘোষনা (যে ঘোষনায় নিজেকে Head of the Government বলেছিলেন)পাঠের মধ্য দিয়ে উচ্ছাকাঙ্খী জিয়া যে স্বপ্নের সোপানে উঠা মনে পোষেছিলেন, ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগষ্টের সামরিক অভ্যূত্থানের পর  প্রধাণ সেনাপতি হওয়ার মধ্য দিয়ে  স্বপ্নের যাত্রার প্রথম ধাপে পা রেখেছিল, ৭ই নভেম্বরের আর এক অভ্যূত্থানে তিনি তার অভিষ্ট স্বপ্নের প্রায় কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিলেন, পরে হাজার হাজার সৈনিকের রক্তের সিঁড়ি বেয়ে সেই স্বপ্নকে হাতের মুঠোয় নিয়ে এসেছিলেন, সেই উচ্ছাভিলাসী সুচতুর সেনা নায়ক নিজেকে শেষ পর্যন্ত আর নিজেকে রক্ষা করতে পারলেন না,  ১৯৮১ সালের ৩০শে মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে এক সেনা অভ্যূত্থানে নির্মমভাবে তার  অতি ঘনিষ্ট সেনা অফিসারের হাতে প্রাণ হারান। আর এভাবে ব্যর্থ এক সামরিক অভ্যূত্থানে নিহত হয়ে যবনিকা পাত ঘটে বঙ্গবন্ধুর পরে সবচেয়ে আলোচিত সমালোচিত এই উচ্ছাকাঙ্খী সেনা তথা বিতর্কিত রাজনৈতিক চরিত্রের।

লক্ষ করলে দেখা যাবে বঙ্গবন্ধুর হত্যার সাথে তার হত্যার কিছু মিল। বঙ্গবন্ধু নিহত হয়েছিলেন কতিপয় সেনা অভ্যুত্থানে তার ঘনিষ্ট জনের হাতে, তিনিও নিহত হয়েছিলেন তার ঘনিষ্ট সেনা অফিসারদের হাতে। চট্টগ্রাম সেনানিবাসে যে সেনা অফিসাররা ছিলেন তাদের প্রায় সবাই ছিলেন তার ঘনিষ্টজন। হত্যা কারীরা যখন জিয়াকে হত্যা করতে তার  দরজায় এসে দাঁড়ায় তিনি তাদের জিজ্ঞেস করেছিলেন, "তোমার কি চাও", ঠিক বঙ্গবন্ধুকে যারা খুন করেছিলেন সেই খুনিদেরকেও তিনি বলেছিলেন "তোমারা কি চাও?"  কি অপূর্ব মিল ! কিন্তু একটা ব্যপারে জিয়ার সাথে বঙ্গবন্ধুর মিল খুঁজে পাইনা, জিয়া নিহত হওয়ার সময় যদি বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকতেন, তার মৃত্যুর খবর শুনে তিনি কোনদিন বলতে পারতেন না, President is dead, so what? কারন জিয়াকে বঙ্গবন্ধু খুবিই ভালবাতেন, দেশী বিদেশী গোয়েন্দারা জিয়ার ষড়যন্ত্রের ব্যপারে বঙ্গবন্ধুকে বার বার শতর্ক করলেও তা তিনি বিশ্বাসই করতে পারেননি। কিন্তু সেই জিয়া তার প্রিয় ভাজন, পৃত্বিতুল্য, তার উপর দেশের প্রসিডেন্ট ও স্বাধীনতার স্থপতি, এমন এক ব্যক্তির হত্যাকান্ডের খবর শুনার পর উপ প্রধান সেনাপতি হয়েও শোকাহত দূরে থাক একটু বিচলিত হলেন না, কোন দয়িত্ববোধ দেখালেন না। বঙ্গবন্ধু যদি জিয়ার এরকম করুন মৃত্যু দেখতেন। তাহলে  কি তিনি বলতে পারতেন President is dead so what? 

 

        যাই হউক মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে স্বাধীনতার ঘোষনা পত্র পাঠ, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে ভারতে জিয়ার ভূমিকা, স্বাধীনতা পরবর্তী উপপ্রধান সেনাপতি হিসাবে বঙ্গবন্ধু কতৃক নিয়োগে অসন্তুষ্টি , তারপর বাকশালের সদস্য হওয়া, ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগষ্টে বঙ্গবন্ধু হত্যা কান্ডে জড়িত থাকার বিতর্ক থেকে শুরু করে ৭ই নভেম্বরের সেনা অভ্যূত্থান, কর্নেল তাহেরের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা  সবকিছুতে আলোচিত সমালোচিত ও বিতর্কিত ভূমিকা তাকে বাংলাদেশ নামক ভূখন্ডের রঙ্গমঞ্চে কখনো উচ্ছাকাঙ্খী, কখনো বিশ্বাসঘাতক কখনো নায়ক কখনো খল নায়ক নানা ভাবে আবির্ভূত হতে দেখেছেন বাংলাদেশের মানুষ।  যেভাবে তিনি আবির্ভূত হউন না কেন বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে  এবং ইতিহাসবিধদের কাছে তিনি আলোচিত সমালোচিত হতে থাকবে যুগ যুগ ধরে। 

১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যার মাধ্যমে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর মধ্যে বিশৃঙ্খলা, অভ্যূত্থান পাল্টা অভ্যূত্থান এবং খুনাখুনীর মধ্য দিয়ে ক্ষমতার কাঁড়াকাঁড়ির যে প্রক্রিয়া চলে  তার পর থেকে ষড়যন্ত্রকারীদের পরিকল্পনা অনুযায়ী সেনাবাহিনীতে মুক্তিযুদ্ধা সেনা অফিসার শূন্য করার কাজ শুরু হয়, মুক্তিযুদ্ধা খালেদ মোশারফ, মেজর হায়দার, কর্নেল হুদা থেকে শুরু করে ১৯৮১ সালের ৩০শে মে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকান্ড, তার পর মুক্তিযুদ্ধা মঞ্জু হত্যা, জিয়া হত্যার বিচারের নামে কোর্ট মার্শাল করে আরো ১৩ জন মুক্তিযুদ্ধার ফাঁসী, এ সব ধারাবহিকভাবে মুক্তিযুদ্ধা হত্যার সূদূরপ্রসারী পরিকল্পনাই অংশ। এভাবে বঙ্গবন্ধু হত্যার পর এ হত্যার অভিশাপ থেকে মুক্ত হতে সেনা বাহিনী, মুক্তিযুদ্ধা তথা সারা জাতিকে অনেক মূল্য দিতে হয়েছে। এ অপুরনীয় ক্ষতি জাতিকে যুগ যুগ ধরে বয়ে বেড়াতে হয়েছে।

  এখন আসা আবার প্রান্তের কাছে। প্রান্তের এখনো মনে আছে জিয়াকে যে রাতে হত্যা করা হয় সে রাত্রে সারা চট্টগ্রামে ঝড়ো হাওয়া এবং বৃষ্টিপাত হয়েছিল, প্রান্ত তার বাসা থেকে সকালে বের হয়ে কলেজে যাচ্ছিলেন। তখনো তিনি জানতেন না চট্টগ্রাম সর্কিট হাউজে সামরিক বাহিনীর সদস্যদের দ্বারা একটা অভ্যূত্থান সংগঠিত হয়েছে যে অভ্যূত্থানে জিয়া নিহত হয়েছেন। বৃষ্টি ভেজা রাস্তায় গাড়ী চলাচলও সীমিত। দূ একটা সামরিক যান রাস্তার মধ্যে টহল দিচ্ছিল। তেমন কোন অস্বাভিকতাও  পরিলক্ষিত হচ্ছিলনা।  কিছুক্ষন দাঁড়ানোর পর একটি বাস আসল। প্রান্ত বাসটাতে উঠল। উঠে দেখে যাত্রীদের কেউ কেউ বাসে ফিস ফাস করে একে অন্যের সাথে কি যেন বলা বলি করছে। প্রান্ত এত কিছু খেয়াল করেনি। সে যখন তার কর্মস্থল কলেজে  গেল তখন ছাত্রদের এদিক ও দিক জটলা লক্ষ করল।  শিক্ষক মিলনায়তনে যখন ঢুকল তখন দেখল শিক্ষদের সবাই বলাবলি করছে চ্ট্টগ্রাম সর্কিট হাওজে  একটা সামরিক অভ্যূত্থান হয়েছে কেউ বলছে জিয়াা নিহত হয়েছে কেউ বলছে উনি পালিয়ে গেছেন।

 

 

 সব কিছু গুজব সঠিক খরবর কেউ দিতে পারছেনা। রাস্তায় রাস্তায় সেনা বাহিনীর কনভয় টহল দেওয়াতে মানুষের মনে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে  তাই মানুষ ভয়ে ভয়ে চলাচল করছে। বেলা যখন বাড়তে থাকে তখন জিয়া নিহত হওয়ার বিষয়টি ধীরে ধীরে খোলাসা হয়ে উঠে। তবে জিয়া হত্যার খবর যখন নিশ্চিত হলেও সারা চট্টগ্রামের কোথাও দেখা যাইনি জিয়া হত্যার প্রতিবাদে একটা মিছিল। বি এন পি নেতারা ভয়ে ভয়ে আত্মগোপন করে পরিস্তিতি পর্যেক্ষন করছেন। 

এদিকে অভ্যূত্থানকারীরা জেনারেল জিয়ার লাশ কোথায় নিয়েছে তা কেউ জানত না, পরে জানা গেল সার্কিট হাউস থেকে তার লাশ নিয়ে রাঙ্গুনিয়ায় পাহাড়ের পাদদেশে কবরস্থ করা করেছে।       

         চট্টগ্রাম নগরী তখন ঢাকা থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন, চারিদিকে শুধু গুজব আর গুজব, গুজব ডাল পালা মেলে সারা নগরীকে আতঙ্কিত করে তুলছিল। বিদ্রোহী সেনারা চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্র দখলে নিয়ে প্রচার করতে থাকে চট্টগ্রাম কেন্টনমেমন্টের কমান্ডিং অফিসার মেজর জেনারেল মঞ্জুরের নেতৃত্বে একটি বিপ্লবী পরিষদ গঠন করা হয়েছে। দূপুরে জেঃ মঞ্জু কোর্ট বিল্ডিংএ সাংবাদিক, সরকারী, আধাসরকারী কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে ভাষন দেন। তিনি সেনা বাহিনীর জেনারেল ষ্টাফ প্রধান জেঃ নূরুদ্দীনকে চারদফা দাবীনামা পেশ করেন যাতে অবিলম্বে তাদের চারদফা প্রস্তাবনা বাস্তবায়ন করা হয়। তার দাবী গুলা ছিল, ১) সারা দেশে সামরিক আইন জারী। ২) দেশের প্রধান বিচারপতিকে প্রেসিডেন্ট নিয়োগ। ৩) জাতীয় সংসদ বাতিল। ৪) তাদের বিপ্লবী পরিষদকে স্বীকৃতি প্রদান। 

জেঃ নুরুদ্দিন বিদ্রোহীদের দাবীসমূহ প্রত্যাখ্যান করে তাদের অবিলম্বে আত্মসমর্পনের নির্দেশ দেন। পরিস্তিতি গুরতর দেখে বিদ্রোহীরা চট্টগ্রাম নিয়ন্ত্রনে রাখার চেষ্টা চালান। সেজন্য কুমিল্লা এবং ঢাকা কেন্টমেন্ট থেকে আগত সেনাবাহিনীকে প্রতিহত করার জন্য শুভপুর ব্রীজের কাছে সেনা বাহিনী প্রেরন করেন। কিন্তু সেনাদল স্বপক্ষ ত্যাগ করে সরকারী বাহিনীতে যোগ দিলে বিদ্রোহীদের মনোবল ভেঙ্গে যায়।

এ পরিস্তিতিতে বিদ্রোহের কথিত নেতা জেঃ মঞ্জু ফটিকছড়ি পায়দং খৈয়াপাড়া একটি চা বাগানে এক উপজাতি কুলীর ঘরে আশ্রয় নেন। পরের দিন বিকেলে হাটহজারী থানার ওসি গোলাম কুদ্দূছ তাকে গ্রফতার করেন এবং সেনবাহিনীর হাতে হস্তান্তর করেন।  পরের দিন রহস্যজনক ভাবে তিনি নিহত হন।

         এদিকে যখন বিদ্রোহীদের অভ্যূত্থান ব্যর্থ হয়ে গেল এবং বি এন পি রাষ্টীয় ক্ষমতায় আসীন রইল। তখন চট্টগ্রাম সহ সারা দেশে শুরু হয়ে গেল জিয়ার জন্য মাতম। অনেকে চোখের পানি পর্যন্ত ফেলা শুরু করল। অথচ যে কয়দিন চট্টগ্রাম বিদ্রোহীদের কবলে ছিল প্রান্তর চোখে পড়েনি জিয়ার জন্য প্রকাশ্যে কেউ কোন টু শব্দ করতে। প্রান্ত ভাবে ইতিহাসের দিকে তাকালে বাঙ্গালীর মধ্যে কিছু সুবিধাবাদী চরিত্র বার বার লক্ষ করা যায়। প্রতিকূল অবস্থায় তারা যে দিকে ঝড় সেদিকে ছাতা ধরে পরিস্তিতি পর্য়বেক্ষন করে, পরিস্তিতি যেদিকে অনুকূলে সেদিকের জয়গানে মত্ত হয়ে যায়। সেটা নবাব সিরাজুদ্দৌলা থেকে শুরু করে, ৭১এর মুক্তিযুদ্ধ, ৭৫এ বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ড এবং ১৯৮১সালে জিয়াউর রহমান হত্যাকান্ডে সমভাবে প্রযোজ্য। নবাব সিরাজুদৌলার পরজয়ের পর ইংরেজরা তাকে বন্দী করে হত্যার পর তার লাশ ঘোড়ার গাড়ীর পিছনে রাজধানী মুর্শীদাবাদের রাজপথে অমর্যাদাকর ভাবে টেনে হিঁছড়ে নিয়ে যাচ্ছিল তখন রাজপথের দু ধারে রাজধানীবাসী খুশীতে হাততালী দিয়ে আনন্দ প্রকাশ করেছিল। সেই সিরাজুদৌল্লা আজ বাঙালীর কাছে কত সম্মানীয়। অনেক দিন পর পরিস্তিতি আবার অনকূলে আসলে বাঙ্গালী নবাব সিরাজুদ্দৌলাকে চিনতে পারল। তার জন্য আজ বাঙালীর কত  দুঃখ, ব্যথা, বেদনা। ৭১এ ২৫শে মার্চের পর যখন পাকিস্তানীরা বাংলাদেশ তাদের নিয়ন্ত্রনে নিয়ে গেল অনেক বাঙ্গালী রাজাকার হয়ে পাকিস্তান রক্ষায় নিয়োজিত হয়ে গেল। পাকিস্থান রক্ষায় কত মায়া কান্না জুড়ে দিল। যদি আজ বাংলাদেশ স্বাধীন না হয়ে পাকিস্তানীদের পদানত থাকত তাহলে সারা বাংলাদেশের পরিস্তিতি অন্য রকম হয়ে যেত, মুক্তিযুদ্ধারা দুষ্কৃতকারী এবং পাকিস্থানের শত্রু, এমনকি বাঙ্গালীরও শত্রু হয়ে যেত। বঙ্গবন্ধুকেও পাকিস্তানীদের মত বাঙ্গালীরাও বিশ্বাসঘাতক বলত। আজ বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ায় সবাই বাংলাদেশের জয়গান গাইছে। বঙ্গবন্ধুকে জাতির পিতা রূপে স্বীকৃতি দিয়েছে। তদ্রুপ  ৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর খুনীরা যদি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ধরে রাখতে না পারত তাদের অভ্যূত্থান যদি ব্যর্থ হত তাহলে তখন বঙ্গবন্ধুর জন্য কতজন মায়া কান্না জুড়ে দিত, কত লক্ষ লক্ষ লোক জানাজায় অংশ নিত তা বলে শেষ করা যাবেনা। কিন্তু অভ্যূত্তান সফল হওয়ায়, বঙ্গবন্ধুর খুনিরা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধীষ্টিত থাকার কারনে, বঙ্গবন্ধু হয়ে গেলেন অপাংতেয় এবং রাতারাতি নিষিদ্ধ এক গোন্ধম ফলের মত। তার নাম নেয়া যাবেনা। তার কথা বলা যাবেনা, তাকে জাতির পিতা দূরে থাক বঙ্গবন্ধুও বলা যাবেনা। প্রান্তু এসব ভাবতে ভাবতে জিয়ার জন্যও দুঃখিত হল। প্রান্ত একজন মুক্তিযুদ্ধা, তিনি তারমত আর একজন মুক্তিযুদ্ধা ভায়ের হত্যা কান্ডে  মর্মাহত  হবে এটাই তো স্বাভাবিক। তিনি তার আত্মার শান্তি কামনা করলেন।  আল্লার কাছে,  তার জন্য দোয়া চাইলেন।


২৬ তম পর্ব ২০০৬ সালে বি এন পি'র তত্ত্বাবধায়ক সরকার নাটক:

 . ২০০৬ সালে বি এন পি'র তত্ত্বাবধায়ক সরকার নাটক:-২০০৬ সলের জোট সরকার মেয়াদ শেষ হলে ক্ষমতা ছাড়ার সময় অাবার দেখা দেয় দুই প্রধান দল তথা জোট...