Pages

রবিবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২২

৭ম পর্ব পাকিস্থান থেকে বাংলাদেশ ঳“চোখে দেখা রাজনীতি”র ৭ম পর্বে বঙ্গবন্ধু হত্যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিবাদ




বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ড ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়:-  অনেকে বলে থাকেন বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা নিরব ছিল। মুজিব হত্যার পর ঢাকার মত ঢাকা বিশ্ববিদ্যায়ও হতবম্ব ও কিংকর্তব্য বিমুড় হয়ে পড়েছিল একথা সত্যি। কিন্তু  ছাত্ররা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন এলাকায় প্রতিবাদের চেষ্টা করেন। সারা ঢাকা শহরে কার্ফূ জারী করায় এবং কড়া সেনা টহলের জন্য তা ব্যর্থ হয়, এরপর বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ট জন হিসাবে পরিচিত বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি প্রফেসর আব্দুল মতিনকেও গ্রেফতার করা হয়, তারপর তড়িঘরি করে ঈদ ও পুজার অজুহাত দেখিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষনা করা হয়। ফলে ছাত্ররা আর সংগঠিত হতে পারেনি।

       দীর্ঘ ছুটির পর আবার  বিশ্ববিদ্যালয় খুললে রাতের আঁধারে ছাত্ররা সারা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবন  মধূর কেন্টিন,  কার্জন হল সহ সারা বিশ্ব বিদ্যালয় এলাকা পোষ্টার ও দেয়াল লিখনে ভরে দেন। তাদের লিখনের ভাষা ছিল "জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু।" এক মুজিবের রক্ত থেকে লক্ষ মুজিব জন্ম নেবে।" এরপর ঢাকায় প্রথম প্রকাশ্যে ২০শে অক্টোবর বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রকাশ্য প্রতিবাদ হয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধূর কেন্টিনের সামনে। শুধু তারা প্রতিবাদ করে ক্ষান্ত হয়নি, প্রতিবাদ সমাবেশ শেষে ছাত্ররা সারা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসও  প্রদক্ষিন করে।  ছাত্র লীগ আর ছাত্র ইউনিয়নের নেতারা এ প্রতিবাদ সভা ও মিছিলের আয়োজন করে। (সাংবাদিক অজয় রায়, সাক্ষাৎকার, ডাইচে ভেলে ১৫/০৮/১৩)

২১ অক্টোবর আবার প্রতিবাদ সমাবেশ করতে গেলে পুলিশ হামলা চালায়। এরপর ২৯শে অক্টোবর আবার প্রতিবাদ সমাবেশের ঘোষনা দিলে ক্যাম্পাসে সেনা  টহল দেয়া শুরু করে।  বিশ্ববিদ্যালয়ে তখন এক ভীতিকর অবস্থার সৃষ্টি হয় কাকে কোন সময় গ্রেফতার করা হয় তার কোন ঠিক ছিল না।  এই নৈরাজ্যকর অবস্থায় ছাত্ররা হল ত্যাগ করে দেশের বাড়ীতে চলে যায়।

প্রান্তুও অন্যান্যদের মত হল ত্যাগ করে গ্রামে  বাড়ীতে চলে যায়। ঢাকা শহরের মত তার দেশের বাড়িতেও একিই অবস্থা সাধারন মানুষ এ হত্যাকান্ডে বিস্ময়ে বেদনায় শোকে পাথর হয়ে যায়। যারা মুজিব ভক্ত তাদের অনেকের চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়েছে অশ্রুর ধারা, যারা মুজিব আমলে দুঃখ কষ্টের শিকার হয়েছিল তারা তাঁর পতন চাইলেও কিন্তু মানুষ নামের পিচাসদের এই পৈচাশিক নারকীয়তা কখনো তারা কামনা করেনি। বঙ্গবন্ধুর প্রতি রুষ্টরাও বিস্ময়ে বিমূড় হয়ে গিয়েছিল এই নারকীয়তা দেখে। তারা এভাবে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা মেনে নিতে পারেনি। তবে এতদিন গর্তে লুকিয়ে থাকা স্বাধীনতা বিরুধী পরাজিত  শত্রুরা আবার আনন্দ উল্লাসে ডগমগ করতেও দেখেছে প্রান্ত।  রাজাকাররা আবার রাজাকার পরচয় দিয়ে স্বগর্বে মাঠে নামতে শুরু করে। অন্যদিকে প্রান্তের মত মুক্তিযুদ্ধারা মুক্তিযুদ্ধা পরিচয় দিতেও ভয় পাচ্ছিল। স্বাধীনতার পক্ষের মানুষেরা চোখ মেলে শুধু দেখতে থাকল কিন্তু করার কিছুই ছিল না। চারিদিকে শুধু রাষ্ট্রীয় পৃষ্টপোষকতায় আওয়ামীলীগ আর মুিজব নিন্দা আর সমালোচনার ঝড়। আরো চলছিল অত্যাচার অবিচার।

প্রান্ত অবাক হয়ে ভাবে কিভাবে এমনটি হল, বিশ্ববিদ্যালয়ে বন্ধুদের কাছ থেকে শুনেছে বঙ্গবন্ধু ডালিমকে পুত্রবৎ স্নেহ করতেন  যে ডালিমকে তিনি পুত্রের মত স্নেহ করতেন, বঙ্গবন্ধুর শিয়রে বসে যে ডালিম তার পারিবারিক জীবনের সুখ দুখের অনুভূতি তাঁর সাথে শেয়ার করতেন, সেই ডলিমের মনের অন্ধকার দিকটি খুঁজার তাগিদ সরল বঙ্গবন্ধু কোনদিন বোধ করেন নাই। তাকে অবিশ্বাস করার মত নীচুতা তিনি দেখাতে পারেন নি। শুধু সে নয় জিয়াসহ অন্য যাদের দ্বারা ক্যূ সংগঠিত হয়েছে তাদের ব্যপারেও বঙ্গবন্ধুকে অনেক বার সতর্ক করা হয়েছিল, কিন্তু বাঙ্গালীরা তাকে মারতে পারে তিনি তা কোনদিনই বিশ্বাস করতে পারেন নাই। এ সকল বিষয় বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধুদের মুখে মুখে। তারা সবাই বঙ্গবন্ধুর সরলতার জন্য তাঁকে দুষছেন।  বঙ্গবন্ধু মানুষকে বিশ্বাস করার মাশুল এত ছড়া মূল্যে দিতে হল যে ভাবতে ভাবতে প্রান্তর মন বেদনায় ভারাক্রান্ত হয়ে গেল। তার চোখে সে আবার বঙ্গবন্ধুকে দেখতে পাচ্ছে, তাঁর যেন মৃত্যু হয় নাই, তিনি যেন আবার  বাংলার জনপদে, মাঠে, ঘাঠে ধরাজ কন্ঠে ভাষন দিয়ে যাচ্ছেন, দুখী মানুষের জন্য সংগ্রাম করে যাচ্ছেন। প্রান্তের চোখে আরো ভাষছে সেই উত্তাল উণসত্তোর, ৭০ এর নির্বাচন, যখন সারা দেশ চষে বেড়িয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। সেই অসহযোগ আন্দোলন, সেই ৭ই মার্চের অমর কবিতা নিয়ে রেসকোর্সের মাঠে বঙ্গবন্ধুর দরাজ কন্ঠের আবৃত্তি। প্রান্তের সেই স্বপ্নীল চোখ আবার যখন তম্নয়তা থেকে বাস্তবে ফিরে আসে তখন ব্যথায় কুঁকড়ে যায় তার মন, বুঝতে পারে বঙ্গবন্ধু তো আর কোনদিন আমাদের মাঝে ফিরে আসবেনা আমাদের সুখে দুখের সাথী হবেনা।

        এদিকে  ষড়যন্ত্রকারীরা মুজিব হত্যার প্রেক্ষাপটটা এমন ভাবে তৈরী করেছিল যে আওয়ামীলীগের কর্মী সমর্থকরা বুঝতে পারছিলনা কে শত্রু কে মিত্র। কারন মুজিবকে হত্যা করে মুজিব অনুশারীরাই আবার সরকার গঠন করেছে। মুশতাক, তাহের উদ্দীন ঠাকুর, শাহ মুয়াজ্জেম ধিকৃত ষড়যন্ত্রকারীরা ছাড়া আওয়ামীলীগের সব নেতাই নিথর নিস্তব্দ মৃত মানুষ যেন।

২৪শে আগষ্ট মুশতাক সরকার শফিউল্লাকে হটিয়ে জিয়াকে সেনা বাহিনী প্রধান হিসাবে নিয়োগ দেন। এবং জেঃ এরশাদকে করা হয় উপ প্রধান সেনা প্রধান। সেনা প্রধান হওয়ায় জিয়ার অনেক দিনের স্বপ্নসাধ পূর্ণ হল, আর তার উচ্ছাকাঙ্খা পুরনের অভীষ্ট লক্ষের আরো অনেক কাছাকাছি এসে পৌঁছল। অন্যদিকে আওয়ামীলীগের অনেক শীর্ষ নেতা তাজউদ্দীন, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, কেপ্টেন মনসুর আলী, এম কামরুজ্জামান, আব্দুস সামাদ আজাদসহ অনেককে গ্রফতার করা হল। পরে ষড়যন্ত্রকারীরা জাতীয় চার নেতাকে সহ অনেককে তাদের সরকারে যোগ দেয়ার প্রস্তাব দেয়। কিন্তু তারা অনেকে প্রাণ ভয়ে, অনেকে ষড়যন্ত্রের সাথে যুক্ত থাকায়, আবার অনেকে লোভে পরে খুনী মুশতাকের মন্ত্রী সভায় যোগ দেয়। কিন্তু এ চার নেতা লোভ লালসা আর মৃত্যু  ভয় উপেক্ষা করে তাদের মন্ত্রীত্বের প্রস্তাব ঘৃনা ভরে প্রত্যাখ্যান করে কারা অভ্যান্তরে থাকাটাকে শ্রেয় মনে করেছিল। এদিকে খুনী মুশতাক ও জিয়া যথাক্রমে  প্রেসিডেন্ট ও সেনা প্রধান হয়েও স্বস্তিতে ছিলেন না। তাই তারা ২৬শে সেপ্টেম্বর নিজেদের এবং আত্ম  স্বীকৃত খুনীদের রক্ষা করার জন্য জারী করে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ। যার মূল কথা হল ১৫আগষ্টের হত্যাকান্ডের বিচার বাংলাদেশের কোন আদালতে করা যাবেনা।

 মুশতাক ক্ষমতায় আসার পর যতই দিন যাচ্ছে সেনা বাহিনীতে শুরু হতে থাকল বিশৃঙ্খলা। জুনিয়র অফিসারদের কাছে সেনা বাহিনীর সিনিয়র অফিসাররা ছিল কোণ ঠাসা।  খন্দকার মুশতাক আর জেনারেল জিয়ার আশ্রয়  প্রশ্রয়ে বঙ্গভবনে ফারুক-রশীদ-ডালিমদের ঔদ্বত্বপূর্ণ আচরন দিন দিন বেড়ে যেতে থাকল যা সেনাবাহিনীর উর্ধতন অফিসারা মেনে নিতে পারছিলনা। কর্নেল জামিল বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় ৪৪নং সাক্ষী হিসাবে বলেছিলেন, "জেঃ জিয়া ২৪শে আগষ্ট সেনা প্রধান হলেও সেনাবাহিনীর চেইন অব কমান্ড ফিরিয়ে আনতে কোন চেষ্টাই করেননি বরং আস্কারা দিয়েছেন।" এই বিশৃঙ্খল পরিস্তিতিতে সিনিয়র অফিসারা চেয়েছিল বিদ্রোহী জুনিয়র সেনা কর্মকর্তাদের কেন্টনমেন্টে ফিরিয়ে নিয়ে আর্মি চেইন অব কামান্ড ফিরিয়ে আনতে। আর সেই কারনে ৩রা নভেম্বরের সেনা অভ্যূত্থান অনিবার্য় হয়ে পড়ে। তাই ১৫ই আগষ্টের খুনী অফিসারদের আর্মি চেইন অব কমান্ডে ফিরিয়ে আনতে সিজিএস খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে একটি সামরিক অভ্যূত্থান সংগঠিত হয়। এ অভ্যূত্থানে মুশতাক - ডালিম-রশীদদের নিয়োগ দেওয়া সেনা প্রধান জিয়াকে গৃহ বন্দী করা হয়। ৩রা নভেম্বরের এ অভ্যূত্থানে মুশতাক ও তার খুনী চক্র মনে করেছিল এটা আওয়ামীলীগ দ্বারা সংগঠিত সেনা  অভ্যূত্থান। তারা ভেবেছিল এ পাল্টা অভ্যূত্থানে আওয়ামীলীগ আবার ক্ষমতায় এসে এ চার েতার নেতৃত্বে সংগঠিত হবে।  সে কারনে রশীদ ডালিম মুশতাক চক্র খালেদ মোশাররফের এই অভ্যূত্থানের পর পরই এ সিদ্ধান্ত নিল যে আওয়ামীলীগকে নেতৃত্ব শূন্য করতে এ চার নেতাকে হত্যা করতে হবে। যাতে নেতৃত্ব শূন্য আওয়ামী লীগ আর ক্ষমতায় যেতে না পারে। তাই খুনী মুশতাক-রশীদ-ডালিম-ফারুকের নির্দেশে ২রা নভেম্বর রাতে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে রিসালাদার মুসলেউদ্দীনের নেতৃত্বে একটি কিলিং মিশন পাঠানো হয়। জেলখানায় গিয়ে তারা বন্দী জাতিয় চার নেতাকে তাদের হাতে তুলে দিতে বলেন। জেল কতৃপক্ষ তা করতে অপারগতা প্রকাশ করলে, স্বয়ং প্রেসিডেন্ট খন্দকার মুশতাক টেলিফোনে তাদেরকে কিলিং মিশনের হাতে তুলে দিতে নির্দেশ দেন। তারপর কিলারা তাদের এক কামরায় জড়ো করে ব্রাশ ফায়ারে হত্যা করে পালায়ে যায়। এদিকে ফারুক রশীদরা যা ভেবেছিল এটা আওয়ামীলীগ সমর্থিত অভ্যূত্থান কিন্তু তাদের অনুমান সঠিক ছিল না। যদিও বিরুদ্ধবাদীরা ষড়যন্ত্র করে এরকমই প্রচার করেছিল যে এটা ভারত সমর্থিত আওয়ামীলীগের অভ্যূত্থান।

 এদিকে যখন খুনী চক্র দেখল যে এটা আওয়ামীলীগের অভ্যূত্থান নয়, তখন অভ্যূত্থানকারী নেতাদের সাথে মুশতাক আর তার খুনী চক্রের সাথে দীর্ঘ আলোচনার হয়। আলোচনায় পর সমঝোতার ভিত্তিতে প্রেসিডেন্ট মুশতাক বৃগেডিয়ার খালেদ মোশাররফকে মেজর জেনারেল পদে উন্নিত করে সেনা প্রধান নিয়োগ করেন। তার বিনিময়ে ১৫ই আগষ্ট ও ৩রা নভেম্বরের হত্যাকান্ডে জড়িত ফারুক, ডালিম, রশীদ, নূর, পাশা গংদের মুশতাকের উদ্যোগে বিদেশে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হয়। (তখনো খালেদ মোশারফরা চার নেতা হত্যার ব্যপারে কিছুই জানতেননা)  খুনী মেজরা পালিয়ে যাওয়ার পর খন্দকার মুশতাক আর প্রসিডেন্ট থাকতে চাইলেন না, কিন্তু খালেদ মোশাররফের অনুরোধে তিনি দায়িত্ব পালন করে যান। খালেদ মোশাররফ চেয়েছিলেন রক্তপাতহীন ভাবে তার অভিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছতে। তিনি তার ভয়ঙ্কর প্রতিদ্বন্দ্বী জিয়াকে বাঁচিয়ে রেখে কেন্টনমেন্টে জিয়ার নিজের বাসায় জামায় আদরে গৃহ বন্দী করে রাখেন। তাঁকে গৃহবন্দী করে রাখার দায়িত্ব দেন আনকোরা এক তরুন কেপ্টেন হফিজউল্লাহকে। তিনি জিয়াকে বন্দী করে তার বাসার টেলিফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন সত্যি কিন্তু হাফিজ একটি ভূল কারে বসেন। তিনি জানতেন না জিয়ার বাসার বেডরুমে আর একটি টেলিফোন সংযোগ আছে। তিনি সেখান থেকে সুকৌশলে কর্নেল তাহেরকে ফোন করে খুব সংক্ষেপে বলেন "সেইভ মাই লাইফ," তাহের তার আহ্বানে সাড়া দিলেন। আর এদিকে খালেদ মোশাররফরা রক্ত পাত এড়াতে বঙ্গ ভবনে বেহুদা আলোচনা করতে করতে কি করবে না করবে দ্বিধা দ্বন্দ্বে ভোগে অনেক সময় ক্ষেপন করে ফেলেন। এমন অবস্থার সুয়োগ নিয়ে জাসদ কর্নেল তাহেরের নেতৃত্বে গোপনে গঠিত সৈনিক সংস্থা গণবাহিনীর মাধ্যমে কেন্টনমেন্টে প্রচার পত্র বিলি করে খালেদের বিরুদ্ধে সৈনিকদের  উত্তেজিত করে তোলে । ওই প্রচার পত্রের ভাষা ছিল তীব্র ও আক্রমনাত্বক, সেখানে খালেদকে বানানো হয় ভারতের দালাল। জাসদের এই কুট চালে পরিস্তিতি সম্পূর্ণ পাল্টে যায়। নড়বড়ে হয়ে যায় খালেদ মোশাররফের ভিত। ৭ই নভেম্বর জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জাসদ কর্নেল তাহেরের নেতৃত্বে খালেদ মোশাররফের বিরুদ্ধে পাল্টা আর একটি অভ্যূত্থান পরিচালনা করে যা সিপাহী জনতার অভ্যূত্থান নামে পরিচিত ।  এ সিপাহী অভ্যূত্থানে কর্নেল তাহের তথা জাসদ জিয়াকে তাদের কিছু এজেনন্ডা বাস্তয়নের অঙ্গিকার নিয়ে বন্দী দশা থেকে মুক্ত করে আনেন। আর অন্যদিকে উত্তেজিত সৈনিকদের হাতে নির্মমভাবে নিহত হন মুক্তিযুদ্ধা মেজর জেনারেল খালেদ মোশারফ, কর্নেল হুদা এবং মেজর হায়দার।

জিয়া মুক্ত হওয়ার পর তাহের এবং হাসানুল হক ইনু তার সাথে দেখা করেন। তখন পরিস্তিতি অনেক পাল্টে গেছে বন্দী জিয়া আর মুক্ত জিয়ার মধ্যে অনেক তফাৎ। এখন সবকিছু তাঁর নিয়ন্ত্রনে।  তিনি তার প্রাণ রক্ষাকারী তাহেরকে দেয়া প্রতিশ্রুতি আর রক্ষা করতে প্রস্তুত নয়।  তাহের বুঝে গেলেন জিয়া তার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। তিনিও দমে যাওয়ার পাত্র নন। তিনি বগুড়া, যশোর, রংপুর কেন্টনমেন্টে অভ্যূত্থানের প্রচেষ্ট চালায়।

জিয়াও বুঝতে পারলেন ক্ষমতায় থাকতে হলে তাহের এবং জাসদকে নিশ্চিন্ন করে দিতে হবে। সেই অনুযায়ী গ্রেফতার করা হয় তাহের সহ জাসদের সব নেতা। শুরু হয় প্রহশনের বিচার। বিচারে জাসদের অনেক নেতাকে জাবজ্জীন সহ বিভিন্ন মেয়াদে কারদন্ডে দন্ডিত করা হয়। আর জীবন দাতা অনেক দিনের বন্ধু তাহেরকে প্রহসনের বিচারে দেয়া হয় মৃত্যুদন্ড। ১৯৭৬ সালের ২১জুলাই তাহেরকে ফাঁসীতে ঝুলিয়ে মৃত্যদন্ড কর্যকর করা হয়। এভাবে জীবন দিলেন ৭ই নভেম্বরের বিপ্লবের  করিগর । নিয়তি কতই নিষ্টুর! কর্নেল তাহেরের নেতৃত্বে সংগঠিত বিপ্লবকে আজ জিয়ার দল বি এন পি পালন করছে বিপ্লব ও সংহতি দিবস হিসাবে।  

এদিকে জিয়াকে মুক্ত করার পর  অভ্যূত্থান সংশ্লিষ্ট উর্ধতন সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাদের নিয়ে একটি বৈঠক হল। বৈঠকে বিচারপতি সায়েমকে রাষ্ট্রপতি রাখার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। তাছাড়া জিয়া সহ তিন বাহিনীর প্রধানদের  ডি সি এম এ করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। জিয়ার এ সিদ্ধান্ত মনপুতঃ হয়নি। কারন উচ্ছাভিলাসী জিয়া নিজেকে সিএমএলএ (Chief marshal law administrator) হিসাবে ভোরেই রেডিওতে ঘোষনা দিয়েছিলেন (ঐ ৭১ এর ২৮ মার্চের মত)

  আবার আসা যাক প্রান্তের কাছে, প্রান্ত এখনো দেশের বাড়ীতে তার চাচার বাসায়। দেশের বিশৃঙ্খল রাজনৈতিক অবস্থায় সে এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়াকে নিরাপদ মনে করছে না, চারিদিকে এখন আওয়ামী লীগ, কমিউনিষ্ট পার্টি সহ স্বাধীনতার পক্ষ শক্তির উপর ধর পাকর চলছে। এখন তার কোন কাজ নেই বন্ধু বান্ধবদের নিয়ে আড্ডা দেয়া আর গ্রামে ঘুরে বেড়ানো ছাড়া। কিন্তু সে ভিতরে ভিতরে রাজনীতির খবরাখবর রাখছেন।  ২রা নভেম্বর রাতে খালেদ মোশাররফের যে পাল্টা অভ্যূত্থান হয়েছিল সে এ অভ্যূত্থান সম্পর্কে  রেডিওতে অবহিত হয়েছিল। তার খুব খুশী লেগেছিল, হয়তো আবার আওয়ামীলীগ তথা স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি ক্ষমতা দখল করেছে। কিন্তু প্রায় দুই তিন দিন রেডিও ষ্টেশান বন্ধ দেশের পরিস্তিতি থমতমে। এ রকম বিরজমান পরিস্তিতিতে নিশ্চয় কোন একটা অঘটন না ঘটে পারেনা যদিও এ ব্যপারে সারা জাতির মত সেও তখনো অন্ধকারে।

    দেশে ক্যূ পাল্টা ক্যূ এসব নিয়ে মানুষ বিরক্ত, মানুষ চাই শান্তিতে থাকতে। এরকম পরিস্তিতিতে মানুষ পরতপক্ষে ঘরের বাইরে যেতে চাইনা, ঘরে বসে সময় কাটায়, এ সুযোগে প্রান্তুদের পাশের বাড়ীর পুকুরে টাকার বিনিময়ে বড়সী শিকারের আয়োজন চলছিল। প্রান্তুর এক মামা তাদের কাছ থেকে দুইটা সিট ভাড়া নিয়েছে মাছ শিকারের জন্য। একটাতে প্রান্তুর মামা আর একটাতে প্রান্তু বসল। প্রায় আরো অাট দশ জন মাছ শিকারী পুকুরের সারা পাড় জুড়ে মাছ শিকারে বড়সী ফেলেছিল। অন্তু যদিও মাছ শিকার করতে এসেছে কিন্তু তার মন ভাল নেই, সে বিষন্ন মনে ভাবছে কি হচ্ছে দেশে, কোন খবর পাচ্ছি না।

রেডিও ষ্টেশনও বন্ধ। পাশা পাশি বড়সী ফেলে বসা আরো অনেক মাছ শিকারী দেশের ঘটে যাওয়া রাজনীতি নিয়ে বলাবলি করছে , এক এক জন এক এক কথা বলতে লাগল। কেউ খালেদকে সমর্থন করছে, কেউ জিয়াকে সমর্থন করছে। কিন্তু তাহেরের কথা সাধারন মানুষের তখনও মুখে শুনা যাচ্ছিলনা। কে এক জন এসে বলল পাল্টা অভ্যুত্থানের নেতা খালেদ মোশাররফ সহ আরো তিন জন সেনা অফিসার সৈনিকদের হাতে নিহত হয়েছে , আর সৈনিকরা জিয়াকে বন্দী দশা থেকে মুক্ত করে এনেছে। খালেদ মোশারফসহ আরো দুই মুক্তিযুদ্ধার  মৃত্যু সংবাদ প্রান্তকে খুবিই শোকাহত করল, যেহেতু তারা সবাই মুক্তিযুদ্ধা ।

এখবর শুনে যারা আওয়ামী লীগ বিদ্বেষী তারা খুশী হল বেশ বুঝা যায়। তারা বলতে লাগল ভারতের হাত থেকে দেশ রক্ষা পেয়েছে। আরো বুঝা গেল এ দলের বেশীর ভাগ মুসলিম লীগ পন্তী পাকিস্থানী মনোভাবাপন্ন। আর যারা আওয়ামীলীগ পন্থী তারা অনেকটা হতাস হল। তারা দোষারোপ করতে লাগল খালেদ মোশাররফের পরিবারকে যারা ৩রা নভেম্বরের অভ্যূত্থানের পর ঢাকার রাজপথে অভ্যূর্ত্থানের পক্ষে আওয়ামীলীগকে সমর্থন জানিয়ে মিছিল করেছিল। এ মিছিলের ফলে পাল্টা অভ্যূত্থানকারীরা ভারতপন্তী এবং আওয়ামীলীগের বলে চিহ্নিত হয়ে গেল। এতে কর্নেল তাহেরের গনবাহিনী সাধারন সৈনিকদের খেপিয়ে তুলে খালেদ মোশাররফ সহ অনেক দেশ প্রেমিক মুক্তিযুদ্ধার প্রাণ সংহার করার সুযোগ করে দিয়েছিল। যার ফলে অভ্যূত্থানও ব্যর্থ হয়ে যায়। 

কিন্তু তখনো সাধারণ মানুষ জিয়াকে মুক্ত করার নেপথ্য নায়ক তাহেরের কথা জানে না। এ পাল্টা অভ্যূত্থানের মূল কুশিলব  জাসদের গণ বাহিনীর নায়ক তাহেরের নাম জানতে পারে অনেক পরে।

এদিকে খালেদ মোশাররফের হাতে বন্দী জিয়া মুক্ত হয়ে বেতার ঘোষনার পর সারা দেশে তিনি ৭ই নভেম্বর বিপ্লবের হিরো বনে গেলেন। সারাদেশে তিনি ব্যাপক ভাবে পরিচিত হয়ে গেলেন।

অন্যদিকে নেপথ্যে থাকা জাসদ তথা কর্ণেল তাহের সৈনিকদের মধ্যে যে মিথ্যা অপপ্রচার চালিয়ে  জিয়ার মাধ্যমে ক্ষমতায় আসীন হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন, সে লক্ষে গুড়ে বালি দিয়েছিলেন জেঃ জিয়া। শুধু তাই নয় জিয়ার উচ্ছাকাঙ্খার কাছে বলি হয়েছেন কর্ণেল তাহের তথা জাসদ। কিন্তু ভাগগ্যের নির্মম পরিহাস এ সত্যটা তখন জাসদ যেমন সাধারণ মানুষকে তুলে ধরতে পরেনি এখনো বেশীর ভাগ মানুষের নিকট এ সত্যটা অজানা।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

২৬ তম পর্ব ২০০৬ সালে বি এন পি'র তত্ত্বাবধায়ক সরকার নাটক:

 . ২০০৬ সালে বি এন পি'র তত্ত্বাবধায়ক সরকার নাটক:-২০০৬ সলের জোট সরকার মেয়াদ শেষ হলে ক্ষমতা ছাড়ার সময় অাবার দেখা দেয় দুই প্রধান দল তথা জোট...