Pages

বৃহস্পতিবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২২

১৪ তম পর্ব “চোখে দেখা রাজনীতি”র এ পর্বে আছে ঳ জিয়া হত্যার বিচার

 

জিয়া হত্যার বিচার :- '১৯৮১ সালে ৩০মে একটি সামরিক অভ্যূত্থান পরিচালনা করে জিয়াউর রহমানকে হত্যা করার পর, এর দায় পড়ে সেনা বাহিনীর চট্টগ্রাম ডিভিশনের  জিওসি মেজর জেনারেল মঞ্জুর  উপর। পুলিশের হাতে জেনারেল মঞ্জুর গ্রেফতার হওয়ার পর সেই সময়ের সেনা প্রধান লেঃ জেঃ এরশােদর পরামর্শে প্রেসিডেন্ট সাত্তার মঞ্জুকে সেনা হফাজতে দিতে নির্দেশ দেন। প্রসিডেন্টের নির্দেশ পেয়ে  চট্টগ্রাম পুলিশ, চট্টগ্রামের কমিশনার এবং জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে তাকে সেনাবাহিনীর হাতে হস্তান্তর করা হয়।সেনা হফাজতে নেয়ার পরের দিনই সরকার এক প্রেস নোট জারী করে বলে যে কিছু উশৃঙ্খল সেনা সদস্য তাকে হত্যা করেছে।

 জিয়া হত্যার জন্য জেনারেল মঞ্জুকে দায়ী করা হলেও তাকে বিচারের আওতায় না এনে সরাসরি হত্যা এবং তড়িঘড়ি করে কোর্ট মার্শালে বিচারের বিচারের মাধ্যমে তার অনুগত মুক্তিযুদ্ধা সেনা কর্মকর্তাদের ফাঁসী দেওয়া এবং পরবর্তীতে মঞ্জু হত্যাকারীদের বিচারের আওতায় না আনা, এসব বিভিন্ন প্রশ্নবিদ্ধ কর্মকান্ডের কারনে জনমনে অনেক সন্দেহ আর প্রশ্নের জন্ম দেয়। জিয়া হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী কে তা আজো রহস্যাবৃতই রয়ে গেল। এর

 যঠ কখনো খুলবে আর মনে হয়না। (সহায়ক সূত্র-,জিয়া হত্যাকান্ডের নেপথ্যে ষড়য়ন্ত্র-৩, জুন৪,২০১৭,on line)

   জিয়া হত্যাকান্ডের পর তাড়িঘড়ি করে তৎকালীন সেনা প্রধান এরশাদের নির্দেশে এবং তত্বাবদানে গঠিত হয় একটি কোর্ট মার্শাল। ওই কোর্ট মর্শালের ডিফেন্ডিং অফিসার কর্ণেল আয়েন উদ্দীন এবং এই হত্যাকান্ড নিয়ে গবেষনা করা সাংবাদিক জুলফিকার আলী মানিকের মতে বিচারটি ছিল নীল নক্সা বাস্তবয়নের বিচার। যার মূল উদ্দশ্য ছিল সেনা বাহিনী থেকে মুক্তিযুদ্ধা নিধন। জুলফিকার আলী মনিক 'জিয়া হত্যাকান্ড নীল নকসার বিচার' গবেষনা মূলক বইয়ে লিখেছেন "রাষ্ট্রপতি জিয়া হত্যাকান্ডকে কেন্দ্র করে  সেনাবাহিনীতে কোর্ট মার্শলে গোপন বিচারটি ছিল  পুরোপুরি প্রহসন ও সাজানো নাটক। সেনাবাহিনীতে মুক্তিযুদ্ধা নিধনের নীল নক্সার অংশ হিসাবে তা আগে থেকে নির্ধারন করে রাখা হয়েছিল কাদের বিচার হবে কি শাস্তি পাবে।"

এখানে লক্ষনীয় বিষয় হল কোর্ট মার্শালের বিচারের  জন্য যে সামরিক আদালত গঠন করা হয় তার সাত সদস্যের ছয় সদস্যই ছিল পাকিস্থান প্রত্যাগত। শুধু এক জন সদস্য কর্ণেল মতিউর রহমান ছিলেন মুক্তিযুদ্ধা। জানা যায় এই কোর্টের প্রধান ছিলেন মেজর জেনারেল আব্দুর রহমান তিনিও একজন পাকিস্থান প্রত্যাগত। শুধু তাই নয় তিনি মুক্তিযুদ্ধা বিদ্বষী লোক ছিলেন বলেও জানা যায়। (মানিক, পৃষ্টা-৫৯)

আর একটি লক্ষনীয় বিষয় ছিল কোর্ট মার্শালে অভিযুক্ত ছিল শুধু মুক্তিযুদ্ধা অফিসাররা। সেই সময় চট্টগ্রাম সেনানিবাসের চার ব্রিগেড কমান্ডের তিন জনই ছিলেন মুক্তি যুদ্ধা, ব্রিগেডিয়ার মহসীন, কর্নেল নোয়াজিশ ও কর্নেল রশীদ। এই তিন জনকেই কোর্ট মার্শালে ফাঁসী দেওয়া হয়। অপর ব্রিগেড কমান্ডার ছিলেন পাকিস্থান প্রত্যাগত কর্নেল লতিফ তাকে অভিযুক্তও করা হয়নি।

    দুঃখের বিষয় হলো এই কোর্টের সাত সদস্যের একজনও যদি এই রায়ের সাথে দ্বিমত পোষন করতেন তাহলে এ প্রহসনের বিচার থেকে আমাদের মুক্তিযুদ্ধা ভায়েরা বেঁছে যেতেন।  অন্তত সাত জনের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধা বিচারক কর্ণেল মতিউর রহমান যদি বলতেন ফাঁসী দেওয়ার ব্যাপারে আমি একমত নিই।  তাহলে ফাঁসী দেওয়া যেত না। তাই কতৃপক্ষ মুক্তিযুদ্ধাদের ভিতর থেকে এমন একজনকে বেছে নিয়েছেন যার কাছ থেকে মন মত ব্যবহার পাওয়া যাবে। (মানিক,পৃষ্টা-৪৯)

কোর্ট মার্শালে অভিযুক্তদের পক্ষে মামলার ডিফেন্ডার 'আইন উদ্দিন', এবং কোর্ট মর্শালে দশ বছরের কারাদণ্ড প্রাপ্ত মেজর রেজাউল করিম পরবর্তীতে উল্লেখ করেছেন, ব্রিগেডিয়ার মহসীন এবং কর্নেল মাহফুজের সারা দেহ এবং  হাতের নক উপড়ে ফেলে টর্চার করে তাদের কাছ থেকে স্বীকারোক্তিমূলক জবাব বন্দী আদায় করা হয়। যা মিলেটারী বা সিভিল কোন আইনে নাই।

 এখানে আরো একটি অবাক করা কান্ড হলো জিয়া হত্যাকান্ডকে কেন্দ্র করে যে কোর্ট মার্শাল গঠিত হয় তাতে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে জিয়া হত্যা কান্ডে জড়িত থাকার কোন অভিযোগ আনা হয়নি। তাদের বিরুদ্ধে যে তিনটি বিষয়ে অভিযোগ আনা হয়েছিল তাহল, ১) বাংলাদেশ সামরিক বাহিনীতে বিদ্রোহ ঘটানো ২) বাংলাদেশ সামরিক বাহিনীতে সংঘটিত বিদ্রোহে যোগদান। ৩) বাংলাদেশ সামরিক বাহিনীতে বিদ্রোহের উস্কানী দেওয়া।

১৯৮১ সালে জিয়া হত্যা কান্ডকে কেন্দ্র করে গঠিত মার্শাল ল কোর্টে মোট তের জন মুক্তিযুদ্ধা অফিসারকে ফাঁসী দেওয়া হয়। তার মধ্যে পাঁচজন ছিলেন খেতাব প্রাপ্ত মুক্তি যুদ্ধা। খেতাব প্রাপ্তদের মধ্যে তিনজন ছিলেন বীর বিক্রম, দুই জন ছিলেন বীর প্রতীক।

বিভিন্ন সূত্রের বরাত দিয়ে ---লেখক জুলফিকার আলী মানিক লিখেছেন, ওই বিচারের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধা নিধনের আর একটি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হয়েছে, সেক্ষেত্রে অভিযুক্তদের মধ্যে যারা বেঁচে থাকলে সমস্য হতে পারে তাদেরকে ফাঁসী দেয়া হয়। (সহায়ক সূত্র-চেনেলআই অন লাইন,২০শে অক্টোবর ২০১৭)   

(জিয়া হত্যার নয়, সেনা বিদ্োহের বিচার হয়। দন্ডিত বেশীর ভাগই মুক্তি যুদ্ধা, চেনেল আই,) (জিয়া হত্যাকান্ডের নেপথ্যে ষড়যন্ত্রের, নেপথ্যে ষড়যন্ত্র-২ চেনেল আই),(৩,অপন ভূবন অন লাইন/, সাখাওয়াত আল আমিন ) (জুলফিকার আলী মনিক, জিয়া হত্যাকান্ড, নীল নকসার বিচার।)

জিয়া হত্যার সম্ভাব্য কারণ :-মুক্তিযুদ্ধের পর কর্ণেল তাহেরের মত জিয়ার  সাথে  জেঃ মঞ্জুরও ঘনিষ্টতা ছিল। ৭ই নভেম্বেরর পর জিয়ার আস্থাভাজন জেঃ মঞ্জুকে সেনা বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ পদ  'সি জি এস' এর দায়িত্ব দেয়া হয়। এই পদে আগে ছিলেন ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ। খালেদ শাফাযাতের ব্যর্থ অভ্যূত্থানের পর তাদের অনুগত মুক্তিযুদ্ধা অফিসারদের চাকুরিচ্যুত করা হলেও, জেঃ মঞ্জু ও অন্যান্য মুক্তিযুদ্ধারা জিয়ার অনুগত হিসাবে সেনাবাহিনীতে  থেকে যান। এইভাবে দেখা যাচ্ছে সেনা বাহিনীতে মুক্তিযুদ্ধা অফিসাররা ঐক্যবদ্ধ থাকার পরিবর্তে বিভিন্ন সময়ে আলাদা আলাদা শিবিরে বিভক্ত হয়ে পরস্পরের সাথে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়েছেন।

জিয়ার জেড ফোর্সে থাকা মুক্তিযুদ্ধা লেঃ কর্ণেল নুরুননবী এবং লেঃ কর্ণেল দিদারুল আলম ৮০সালে অভ্যূত্থান পরিকল্পনা করে ব্যর্থ হয়ে ছিলেন। 

রাজনীতিতে শক্ত অবস্থান তৈরী করার জন্য জিয়া মুক্তিযুদ্ধা হয়েও মুক্তিযুদ্ধ বিরুধীদের তার রাজনৈতিক দলে স্থান দিয়েছিলেন। একাত্তরে পাকিস্থানের দালাল ডান পন্তী নেতা শাহ আজিুর রহমানকে  কি করে প্রধান মন্ত্রী করা হল জিয়া নিহত হবার দুই মাস আগে ঢাকায় সেনাবাহিনীর এক অনুষ্টানে মুক্তিযুদ্ধা অফিসাররা রাষ্ট্রপতি জিয়াকে সরাসরি প্রশ্ন করেছিলেন। (সহায়ক সূত্র-,ত্রিশোনকু মল্লিক, চট্টগ্রাম বিদ্রোহ,পৃষ্টা ৮)  এছাড়া পাকিস্থান প্রত্যাগত জেঃ এরশাদকে সেনা প্রধান করায়ও তারা মনক্ষুন্ন হন।

এর আগেও ১৯৭৭সালে আর এক ব্যর্থ অভ্যূত্থানের পর দুই জৈষ্ট মুক্তিযুদ্ধা অফিসার আবুল মঞ্জুর আর মীর শওকত আলীকে যথাক্রমে চট্টগাম আর যশোর সেনানিবাসে জি ও সি করে দূরে সরিয়ে দেওয়া হয়। তখন ঢাকা সেনা সদরের গুরুত্বপূর্ণ পদসমূহ চলে আসে পাকিস্থান প্রত্যাগতদের দখলে।

এছাড়া জিয়া সেনা বাহিনীর সমর্থনে ক্ষমতায় গিয়েও ক্রমশ সেনা বাহিনী থেকে দূরে সরে দলীয় রাজনীতির দিকে ঝুঁকে পড়া পার্ব্বত্য এলাকার শান্তি প্রতিষ্টা নিয়ে মতবিরোধ, সামরিক বাহিনীর কিছু কর্মকর্তা এবং তার দল বি এন পি'র কিছু নেতার দূর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়া ইত্যাদী বিষয়ও সেনাবাহিনী তথা জেঃ মঞ্জুর জিয়ার প্রতি ক্ষুদ্ধ হয়েছিলেন বলে জানা যায়। (সহায়ক সূত্র-পৃ১৫৪-১৫৫,জুফিকার আলী মানিক, জিয়া হত্যাকান্ড,)

এরশাদের সাথেও মঞ্জুর ভাল সম্পর্ক ছিল না। এরশাদের অনুগত পাকিস্থান প্রত্যাগত অফিসার আর মঞ্জুর অনুগত মুক্তিযুদ্ধা অফিসারদের মধ্যে একটি বৈরী সম্পর্ক বিরাজ করছিল বলে মনে করা হয়। জিয়া মুক্তি যুদ্ধা অফিসারদের নিকট প্রিয় হলেও তাঁর পাকিস্থান প্রত্যাগতদের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ মুক্তিযুদ্ধা অফিসাররা তা পছন্দ করেননি। তারা এতে তাঁর প্রতি অসন্তুষ্ট ছিলেন।

আর একটি বিষয় লক্ষনীয় যে জিয়া হত্যার কিছুদিন আগে জেঃ মঞ্জুকে বদলী করা হয় ঢাকায় ডিফেন্স সার্ভিসেস কমান্ড এন্ড ষ্টাফ কলেজে কমানডেন্ট হিসাবে। এর অর্থ মঞ্জু আর পদাতিক ডিভিসনের সক্রিয় কমান্ডে থাকবেন না। উপরন্তু ষ্টাফ কলেজের কমানডেন্ট হিসাবে তাকে সি জি এসের নির্দেশ মানতে হবে। সি জি এস পদে মঞ্জু কয়েক বৎসর আগেই ছিলেন। ফলে বদলীর এই আদেশ মঞ্জুর সহ তার অনুরক্ত মুক্তিযুদ্ধা অফিসাররা মেনে নিতে পারেননি।  এতেও মঞ্জু এবং তার অনুরক্তরা রাষ্ট্রপতি জিয়ার প্রতি ক্ষুদ্ধ ছিলেন।

জিয়া যে রাতে নিহত হয়েছেন সে রাতেও আইন শৃঙ্খলা পরিস্তিতি নিয়ে আলোচনায় চট্টগ্রামের পুলিশ কমিশনাররা জিয়াকে  জানান, বি এন পি'র চল্লিশ নেতা কর্মীর বিরুদ্ধে বেআইনী জমি দখল, বেআইনী অস্ত্র বহন, শহরে সন্ত্রাসের সাথে  জড়িত থাকার কথা। 

তার দলের নেতাদের এসকল দূর্নীতি, সন্ত্রাস, বেআইনী দখল সব বিষয়ও সেনা বহিনীকে ক্ষুদ্ধ করেছিল।

এসব কারনে সম্ভবত জিয়ার বিরুদ্ধে অভ্যূত্থান সংগঠন এবং হত্যার প্রক্ষাপট তৈরী হয়।

প্রান্তের ভাবনা:-প্রান্ত  পাকিস্থানী স্বৈরাচারী শাসন, মুক্তিযুদ্ধ,  মুক্তি যুদ্ধকে ঘিরে লক্ষ লক্ষ বাঙালীর মত তার জীবনের করুন ট্রেজেডী, তারপর ৭৫এ বঙ্গবন্ধুকে স্বপরিবারে হত্যার পর একে একে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে সেনাবাহিনী থেকে  মুক্তিযুদ্ধাদের নিধন করে মুক্তিবাহিনী শূন্য সেনাবাহিনী করা। এসব দেখে দেখে অন্যান্য মুক্তিযুদ্ধাদের মত তারও আক্ষেপ করা ছাড়া আর কিছুই করার ছিল না। সে প্রায়ই  ভাবে বঙ্গবন্ধু কি জীবনের ওপার থেকে আমাদের অভিশাপ দিচ্ছে ?  আমরা কেন এক মুক্তিযুদ্ধা ভাই আর এক মুক্তিযুদ্ধা ভাইয়ের রক্ত নিয়ে হুলি খেলছি? সে স্তির করল একদিন টুঙ্গীপাড়ায় বঙ্গবন্ধুর মাজারে যাবে, মুক্তিযুদ্ধা তথা বাঙালী জাতির হয়ে  তাঁর কাছে ক্ষমা চাইবে। বঙ্গবন্ধুর কবর জিয়ারত করে তার আত্মার শান্তি কামনা করবে।


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

২৬ তম পর্ব ২০০৬ সালে বি এন পি'র তত্ত্বাবধায়ক সরকার নাটক:

 . ২০০৬ সালে বি এন পি'র তত্ত্বাবধায়ক সরকার নাটক:-২০০৬ সলের জোট সরকার মেয়াদ শেষ হলে ক্ষমতা ছাড়ার সময় অাবার দেখা দেয় দুই প্রধান দল তথা জোট...