Pages

শনিবার, ২৭ আগস্ট, ২০২২

৯ম পর্বে পাকিস্থান থেকে বাংলাদেশ “চোখে দেখা রাজনীতি”র ৯ম পর্বে আছে জিয়ার রাজনীতিতে পদার্পন

 

তারপর শুরু হয় জিয়ার রাজনীতিতে পদার্পন। প্রথমে তিনি দুই জন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এবং একজন অধ্যাপককে তার উপদেষ্টা পদে নিয়োগ দেন, এরপর রাজনীতিবিদদের সাথে যোগাযোগ শুরু করেন। তাদের মধ্যে প্রথম ছিলেন ভাসানী ন্যাপের মুশিউর রহমান যাদুমিয়া। '

'জিয়া রাজনৈতিক দল গঠনের আগে সমমনাদের নিয়ে একটি রাজনৈতিক ফ্রন্ট গঠনের চিন্তা করেন। যাতে ক্ষমতাচ্যূত রাজনৈতিকদল আওয়ামীলীগের বিপরীতে একটি বড়সড় রাজনৈতিক মঞ্চ তৈরী করা যায়। এরপর তিনি দেখলেন জোটের মধ্যে তার নিজস্ব রাজনৈতিক দল না থাকলে জোটকে নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হবেনা। সে লক্ষে তিনি নিজেকে নেপথ্যে রেখে গঠন করলেন জাগদল। জাগদল রাজনীতিতে তেমন ঢেউ তুলতে পারেনি। পরে জিয়া ১৯৭৮ সালে নিজেকে নিজে পদোন্নতি দিয়ে  লেঃ জেনারেল বনে গেলেন। ১৯৭৮ সালে ১লা মে সেনাবাহিনীর প্রধান থাকা অবস্থায় জেঃ জিয়া নিজেকে আহ্বায়ক করে জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট ঘোষনা করেন।  সেনাবাহিনীর উর্দীপরা অবস্থায় জিয়া পুরাদস্তুর রাজনীতিবিদ বনে গেলেন।' যদিও তিনি বলে ছিলেন " I will make politics difficult for politician. জিয়া নানা বিধি নিষেধের জালে পলিটিক্সকে অনেক পলিটিশিয়ানের জন্য ডিফিক্যাল্ট করলেও তিনি 
রাজনীতিতে নিজের উত্তোরন ঘটান সহজেই।

 গবেষক মহিউদ্দিন আহাম্মদ তাঁর বইতে বি এন পি নামক দলটির সম্পর্কে লিখেছেন এভাবে, -" বি এন পি এমন একটি দল যার জন্ম স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় হয়নি। এ অঞ্চলের সব দলের জন্ম হয়েছে ক্ষমতার বৃত্তের বাইরে। রাজপথে বা আলোচনার টেবিলে। বি এন পি সেদিক থেকে ব্যতিক্রম। বি এন পি দলটি তৈরী হলো ক্ষমতার শীর্ষে থাকা একজন অরাজনৈতিক ব্যক্তি দ্বারা। "

জিয়া হলেন  সমর নায়ক থেকে সদ্যাগত রাজনীতিবিদ, রাজনীতিবিদদের তৃণমূল পর্যন্ত সম্পর্ক রাখতে হয়। মাঠে ঘাঠে পথে বক্তৃতা দিয়ে বেড়াতে হয়, জিয়া ছিলেন সে ব্যপারে একেবার আনকোরা,  রাজনীতিতে পারঙ্গম হতে হলে তাকে জনগনের কাছে যতে হবে জনগনের সাথে মিশে যেতে হবে।

লেখক গবেষক মহিউদ্দীন আহমেদ 'মশিউর রহমান যাদু মিয়া'র ভাই মুখলেসুর রহমানের একটি সাক্ষাতকারের উদ্ধৃতি দিয়ে লিখেছেন, -"জিয়া বাংলা লিখতে পড়তে জানতেননা, প্রথমে তিনি বাংলায় যে বক্তৃতা দিতেন তা  উর্দূতে লিখতেন। সেটি দেখে বক্তৃতা দিতেন। তিনি বক্তৃতাই দিতে জানতেন না, দিতে গেলে খালি হাত পা ছুঁড়তেন।"

মুখলেসুর রহমানের সাক্ষাৎকারের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি আরও লিখেন, ''এ রকম দেখে টেকে যাদু মিয়া আমাকে একদিন বললেন এরকম হলে আমি কিভাবে তাকে চালিয়ে নেব? আমি বললাম জিয়া বক্তিতা দিতে পারেনা ঠিক আছে, তিনি সবচেয়ে ভাল কি করতে পারেন সেটা খুঁজে বের করো। জবাবে যাদু বললেন  তিনি হাঁটতে পারেন এক নাগারে ২০ থেকে ৩০ মাইল পর্যন্ত। আমি বললাম এইতো পাওয়া গেল ভাল একটা উপায়। তুমি তাকে নিয়ে পাড়া গাঁয়ে হাঁটাও, গাঁও গেরামের রাস্তা দিয়ে যাবে আর মানুষকে জিজ্ঞেস করবে কেমন আছেন? প্রেসিডেন্ট দেশের মিলিটারী লিডার, তিনি গ্রামের আনাচ কানাচ দিয়ে ঘোরাঘুরি করছেন আর লোকজনের ভাল মন্দের খুঁজ খবর করছেন তাতেই তিনি জনপ্রিয় হয়ে উঠবেন।"

'মুখলেছুর রহমানের ভাষ্য মতে 'এভাবে দেখতে দেখতে জিয়া উর রহমান বক্তৃতা দেওয়াটাও রপ্ত করে ফেললেন। আর যেখানে কোনদিন ইউনিয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান যাননি সেখানে খোদ দেশের প্রসিডেন্ট যাচ্ছেন, সেটা সাধারন মানুষের নিকট এক বিশাল ব্যপার, এভাবে জিয়াকে তারা সাধারন মানুষের কাছে জনপ্রিয় করে তুলেন।''

হাঁ না ভোটে প্রেসিডেন্ট হওয়ার আরো এক বৎসর পর প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী (সেনা বাহিনীর সর্বাধিনায়ক) থাকা অবস্থায় তিনি নিজের অবস্থান সংহত ও সুনিশ্চিত করার জন্য নিজ কতৃক পুনর্বাহাল করা শেখ মুজিবের চতুর্থ সংশোধনীর অধীনে ১৯৭৮ সালে ৩রা জুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করেন। সে নির্বাচনে তিনি ৭৬.৩৩%ভোট পেয়ে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। যেখানে জেঃ ওসমানী সহ দশজন প্রার্থী ছিলেন। (এখানে উল্লেখ্য যে, তিনি যেহেতু প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী ছিলেন, তার নির্বাচনে অংশগ্রহন ছিল সম্পূর্ণ অবৈধ, আর এই অবৈধ কাজটিকে বৈধ করার জন্য আর একটি অবৈধ ও অনৈতিক কাজ করে করে বসেন তাহল ১৯৭৯সালে ২৮এপ্রিল back date দিয়ে ১৯৭৮ সালের ২৯শে এপ্রিল থেকে নিজেকে অবসর দেখিয়ে একটি অধ্যাদেশ জারী করেন।) (মুক্তিযুদ্ধ ও তারপর, গোলাম মুরশীদ) ১৯৭৯ সালে তিনি রাষ্ট্রপতি থাকা অবস্থায় ২য় সংসদ নির্বাচন আয়োজন করেন। এ নির্বাচনে তাঁর নব গঠিত বি এন পি ২৯৮টি আসনের মধ্যে ২০৭টি আসনে জয় লাভ করে। নির্বাচনে অংশ নিয়ে আব্দুল মালেকের নেতৃত্বে আওয়ামীলীগ ৩৯টি আসনে, মিজানুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামীলীগ ২টি আসনে জয় লাভ করে। এছাড়া জাতীয় সমাজ তান্ত্রিক দল ৮টি, ন্যশনাল আওয়ামী পার্টি ১টি, মুসলীম ডেমক্রেটিক লীগ ২০টি আসনে জয়লাভ করে। এ মুসলিম ডেমক্রেটিভ লীগ মানে সদ্য গঠিত জামাতসহ রাজাকার আর স্বাধীনতা বিরুধীরদের সংগঠন।

১৯৭৬ সালের কর্নেল তাহেরকে ফাঁসীতে ঝুলিয়ে হত্যার দু সাপ্তাহ পর জুলায়ের শেষে আগষ্টের প্রথম সাপ্তাহে রাজনৈতিক দলবিধি জারী করে রাজনৈতিক তৎপরতা চালু করেন জিয়া।  মোট ৫৭টি দল আবেদন করে, আওয়ামীলীগও ৩রা সেপ্টেম্বর ১৯৭৬ সালে সরকারী অনুমোদনের জন্য আবেদন করে,  সামরিক সরকার আওয়ামীলীগকে ঠেকানোর জন্য রাজনৈতিক দলবিধি সংশোধন করে ১০নং উপধারা জারী করে বলা হয় যে, "কোন জীবিত বা মৃত ব্যক্তির প্রতি শ্রদ্ধাবোধ সৃষ্টি বা পরিকল্পিত হয় বা উৎসাহিত করিবার সম্ভাবনা থাকে এমন কোন শব্দ ব্যবহার করলে ঐ রাজনৈতিক দল অনুমোদের যোগ্য হবে না।" এটা করা হয়েছিল মূলতঃ বঙ্গবন্ধু শব্দটি বাদ দিতে। পরে আওয়ামীলীগ তাদের ঘোষনা পত্র থেকে বঙ্গবন্ধু শব্দটি বাদ দিয়ে আবার আবেদন করলে ৪ঠা নভেম্বর ১৯৭৬ সালে অনুমোদন পায়। এভাবে রাজনৈতিক দল বিধির অধীনে ২৩টি দলকে রাজনীতি করার অনুমোদন দেয় জিয়ার সামরিক সরকার। 

এর প্রায় দুই বৎসর পর ১৯৭৮ সালের পহেলা মে রাজনৈতিক দলবিধি উঠিয়ে দিয়ে সবাইকে রাজনীতি করার সুযোগ দেন জিয়া। এখানে লক্ষনীয় ব্যপার হলো যেখানে বঙ্গবন্ধু বাকশাল করে রাজনীতি করার সুযোগ সীমিত রাখতে পেরেছিলেন নয় মাস, (২৫শে জানুয়ারী ১৯৭৫- ১৫আগষ্ট ১৯৭৫)আর জিয়া রেখেছিলেন প্রায় আড়ায় বৎসর। (৮ই নভেম্বর,১৯৭৫-১মে১৯৭৮)

  এবার আসি প্রান্তের কাছে,  ৩রা ও ৭ই নভেম্বর  খালেদ  মোশাররফ জিয়াউর রহমানের  ক্ষমতা দখলের পালাবাদলের  সময়েও  কয়মাস দেশের অস্তির রাজনৈতিক পরিস্তিতির জন্য  প্রান্ত গ্রামে অবস্থান করছিল।  মাঝে মাঝে গোপনে ঢাকায় গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘুরে আসত তবে হলে অবস্থাব করত না, কারন তখনো আওয়ামী পন্তী ছাত্র তথা স্বাধীনতার পক্ষের শক্তির প্রতি জিয়ার সামরিক সরকার ছিল খড়ক হস্ত।

        প্রান্ত যদিও বিশ্ববিদ্যালয়ে অবস্থান করত না তবু সে শুনেছে মুশতাক চক্রকে হটিয়ে খালেদ মুশাররফের ৩রা নভেম্বর পাল্টা অভ্যূত্থানের পর ৪ঠা নভেম্বর ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয়ের হাজার হাজার ছাত্র প্রতিবাদ মিছিল নিয়ে বঙ্গবন্ধুর ৩২ নম্বর বাড়ীর দিকে যায়,। সেখানে বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের নিহত সদস্যদের জন্য গায়েবানা জানাজা পড়ানো হয়। করা হয় প্রতিবাদ সভা।  আবার ৩রা নভেম্বর রাতে ঢাকা কেন্দীয় কারাগারে বন্দী জাতীয় চার নেতাকে মুশতাক রশীদ ডালিম চক্র কতৃক খুন করার খবর শুনে শোকে ও ক্ষোভে ফেটে পড়ে ছাত্ররা। মধূর কেন্টিনে তারা সমাবেশ করে। এ চার নেতা হত্যার প্রতিবাদে ঢাকায় আধবেলা হরতালও ডাকা হয় এবং হরতাল শেষে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে গিয়ে তারা গায়বানা জানাজা পড়ে।

 প্রান্ত বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের পর সেনা বাহিনীর মধ্যে যে রক্তারক্তি ঘটছে তা দেশের জন্য যে এক ভয়াবহ অভিশাপ বয়ে এনেছে তা দেখে সে খুবই চিন্তিত হয়ে পড়ল। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর যে অসংবিধানিক পথে রাষ্ট্র ক্ষমতা পরিবর্তনের ধারা শুরু হয়েছে তাতে এপর্যন্ত জাতীয় চার নেতাসহ, কর্ণেল শাফায়াত জামিল, খালেদ মোশাররফ, হায়দার, নূর সহ আরো কত মুক্তিযুদ্ধা প্রাণ বলি দিয়েছে আর সামনে আরো কত প্রান বলি হবে কে জানে!!

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

২৬ তম পর্ব ২০০৬ সালে বি এন পি'র তত্ত্বাবধায়ক সরকার নাটক:

 . ২০০৬ সালে বি এন পি'র তত্ত্বাবধায়ক সরকার নাটক:-২০০৬ সলের জোট সরকার মেয়াদ শেষ হলে ক্ষমতা ছাড়ার সময় অাবার দেখা দেয় দুই প্রধান দল তথা জোট...