Pages

মঙ্গলবার, ১৬ আগস্ট, ২০২২

৩য় পর্ব /“চোখে দেখা রাজনীতির” ৩য় পর্বে মুক্তি বাহিনী গঠন থেকে আত্মসমর্পন,১৬ই ডিসেম্বর




 

১৯৭১ সালে পাকিস্থানীরা বাঙালী নিধনে ঝাঁপিয়ে পড়লে জণযুদ্ধের আদলে শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ তথা স্বাধীনতা যুদ্ধ। এ স্বাধীনতা যুদ্ধে যোগ দেয় সেনাবাহিনী, পুলিশ, ইপিআর,সহ স্বাধারন জনগন। কয়েক মাসের মধ্যে গঠিত হয় মুক্তি বাহিনী। এ মুক্তি বাহিনী গেরিলা কায়দায় আক্রমন চালিয়ে পাকিস্থানী সেনাদের ব্যতিব্যস্ত করে তুলে। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে ভারত আমাদের অর্থনৈতিক সামরিক এবং কূটনৈতিক সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়। গণ হত্যার হাত থেকে বাঁচতে প্রায় এককৌটি মানুষ ভারতে আশ্রয় নিলে তাদের যাবতীয় ভার ভারত সরকার  বহন করে। 

অন্যদিকে পাকিস্তানী সৈন্যরা সারা দেশজুড়ে যখন তান্ডব চালাচ্ছিল তখন পাকিস্থানীদের সহযোহিতা করতে এগিয়ে  আসে এদেশের কিছু কুলাঙ্গার মুসলীম লীগ, জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলামী, সহ প্রতিক্রিয়াশীল সাম্প্রদায়িক শক্তি। তােদর সহযোগিতায় গঠন করা হয় শান্তি কমিটি, রাজাকার, আলবদর, আল সাম্স বাহিনী। অন্যদিকে আওয়ামীলীগ সহ সকল প্রগতিশীল দল ছাত্র কৃষক শ্রমিক জনতা পালিয়ে ভারতে চলে যায় হানাদারের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রশিক্ষণ নিতে।  আওয়ামী লীগ সহ স্বাধীনতার পক্ষের দল সমূহের সকল নেতা ভারতে পালিয়ে দীর্ঘ মুক্তিযুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য সংগঠিত হয়। এর ফল স্বরূপ ১৯৭১ সালের ১৭ই এপ্রিল কুষ্টিয়ার ঐতিহাসিক মুজিব নগরের অম্র কাননে গঠিত হয় অস্থায়ী মুজিব নগর সরকার। আর সারা দেশকে আটটি রনাঙ্গনে ভাগ করে কর্নেল ওসমানীকে সর্বাধীনায়ক করে সার্বিক যুদ্ধ পরিচালনা করা হয়।                 (মুক্তিযুদ্ধে অস্থায়ী সরকার,উইকিপিডিয়া) (স্বাধীনতা যুদ্ধ উইকিপিডিয়া)(একাত্তরে দৈনিক সংগ্রামের ভূমিকা,সুব্রত শুভ)

  প্রান্তের খবর:- এদিকে সারাদেশব্যপী চলছিল পাকিস্থানী হানাদারদের অত্যাচার, হত্যাকান্ড, তাদের সহযোগিতা করে যাচ্ছিল এ দেশের কিছু কুলাঙ্গার আলবদর আল্ সামশ আর শান্তি কমিটির সদস্যরা। তারা কে আওয়ামী লীগার, কার ছেলে মুক্তি বাহিনীতে যোগ দিয়েছে, কার ঘরে সুন্দরী কন্যা আছে এ সকল কিছুর খবর পাকিস্থানী সৈন্যদের কাছে পৌঁছে দিত। প্রান্তর বাবা একে তো মুসলীম লীগার, তার উপর এলাকার মেম্বার, তাই তাকে তার এলাকার  শান্তি কমিটিরও মেম্বার করা হল। এলাকার মানুষ তিনি শান্ত কমিটির মেম্বার হওয়ায় দারুনভাবে অসন্তুষ্ট ছিল। প্রান্ত ও তার বোন রুশনী এবং তাদের মা'ও তার দেশের বিরুদ্ধে গিয়ে পাকিস্থানীদের হয়ে শান্তি কমিটির মেম্বার হওয়ায় তার প্রতি খুবই রুষ্ট হলেন। 

       এদিকে ধীরে ধীরে সারাদেশে পাকিস্তানী সৈন্যরা ছড়িয়ে পড়ল, অন্যদিকে ভারতে পালিয়ে যাওয়া আওয়ামীলীগ সহ অন্যান্য দলের নেতারাও বসে নেই, পাকিস্থানী হানাদার কতৃক ২৫শে মার্চ গণ হত্যা ও বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষনার পর জনগন যেভাবে পাকিস্তানীদের বিরুদ্ধে বিক্ষিপ্তভাবে প্রতিরোধ  যুদ্ধ শুরু করে  তাকে সুষ্টুভাবে পরিচালনার জন্য,  আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন আদায়,  মুক্তিযুদ্ধে প্রত্যক্ষ সহায়তাকারী ভারতের সরকার ও তার সেনাবাহিনীর সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার জন্য একটি মুক্তিযুদ্ধকালীন সরকার গঠন অপরিহার্য প্রয়োজন বলে মনে করেন আওয়ামীলীগ নেতৃত্ব।  সেই অপরিহার্যতার পরিপ্রেক্ষিতে আওয়ামীলীগের প্রথম সারীর প্রবীন নেতাদের সমন্বয়ে  ১৯৭১ সালের ১০ই এপ্রিল মুজিব নগর সরকার গঠিত হয়। ১৯৭১ সালের ১৭ই এপ্রিল কুষ্টিয়ার তৎকালীন বৈদ্যনাথ তলার অম্রকাননে আজকের মুজিব নগরে মুজিব নগর সরকারের মন্ত্রী পরিষদের সদস্যরা শপথ গ্রহন করেন।  এ সরকার গঠনের পর পরই পাকিস্থানীদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ যুদ্ধ প্রবল থেকে প্রবলতর যুদ্ধের রূপ নেয়।

এ সদ্য গঠিত মুজিব নগর সরকার ১৯৭১ সালের ২৯শে এপ্রিল মন্ত্রী পরিষদের এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করে। এ বৈঠকে বলা হয়, "সশস্ত্রবাহিনী সম্পর্কে সিদ্ধান্ত হল যে, প্রধান সেনাপতি অফিসারদের একটি তালিকা প্রস্তুত করবেন, কমান্ডকে সমন্বিত করে কঠোর শৃঙ্খলার মধ্যে আনতে হবে। বাংলাদেশ সেনা বাহিনীতে প্রশিক্ষনার্থীদের বাছায় পর্বে যথেষ্ট সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।"

এরপর ১০ থেকে ১৭ই জুলাই সেক্টর কমান্ডারদের একটি সম্মেলন অনুষ্টিত হয়। তাতে মুক্তিবাহিনীর যুদ্ধাঞ্চল ও যুদ্ধ কৌশল সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা হয় এবং কর্ণেল আতাউল গনি ওসমানীকে মুক্তি যুদ্ধের সর্বাধিনায়ক  নিয়োগ করা হয়। এবং বাংলাদেশের সকল যুদ্ধাঞ্চলকে এগারটি ভাগে ভাগ করা হয়।

 অন্যদিকে ২৫শ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষনার পর ৪ঠা এপ্রিল নুরুল আমিন, গোলাম আজম, খাজা খাইরুদ্দিন সহ বারজন পাকিস্থান পন্তী নেতা পাকিস্থান সেনা বাহিনীর জেনারেল টিক্কা খানের সাথে দেখা করে বিদ্রোহীদের (মুক্তি বাহিনীর) বিরুদ্ধে সহযোগিতার  নিশ্চয়তা প্রদান করেন। টিক্কা খানের সাথে আলোচনার পর এই ডানপন্তী নেতারা পূর্ব পাকিস্থানের শান্তি পুনরুদ্ধারে ১৪০ সদস্য বিশিষ্ট শান্তি কমিটি গঠন করেন। ৯ই এপ্রিল খাজা খায়রুদ্দীন ঢাকায় এক বৈঠকে প্রথম ৯৬ জন রাজাকার নিয়োগ দেন। খুলনার খান জাহান আলী রোডের এক আনসার প্রশিক্ষন কেম্পে তাদের প্রশিক্ষন দেয়া হয়।  স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধরত মুক্তি বাহিনীকে প্রতিরোধ করতে জামাত কর্মী সমন্বয়ে পূর্ব পাকিস্থান জামাতের সহকারী আমির মৌলানা ইউসুফের নেতৃত্বে প্রথম রাজাকার বাহিনী গঠিত হয়।

আল বদর বাহিনী জেনারেল নিয়াজীর  পৃষ্টপোষকতায় পাকিস্থান সেনা বাহিনীকে সহায়তা করার জন্য গঠিত হয়।

এই আলবদর বাহিনী ছিল সাক্ষাত যমদূত। এদের কাজ ছিল মুক্তি বাহিনীকে ধরে পাকিস্থানী বাহিনীর হাতে তুলে দেয়া আর নারী ধর্ষন, আর পাকিস্থানী বাহিনীকে নারী ধর্ষনে সহায়তা করা। তাছাড়া তাদের আরো কাজ ছিল সন্ত্রাস আর রাজনৈতিক গণ হত্যার মাধ্যমে জন গনের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্ট করা। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, স্বাধীনতার অব্যবহিত আগে দেশের শ্রেষ্ট সন্তান বুদ্ধিজীবিদের বাসা থেকে ধরে নিয়ে হত্যার মূল হোতাও ছিলেন এই আল বদর বাহিনী।

  আল সামস গঠিত হয় তৎকালীন ছাত্র সংঘের কর্ণধার মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মুজাহেদী ও কাদের মোল্লার নেতৃত্বে। এরা সারা দেশে প্রচরনা এবং সামরিক বাহিনীর সাথে যোগাযোগের কাজ করতেন। কাদের মোল্লার নেতৃত্বে এরা ধৃত মুক্তিযুদ্ধাদের অত্যাচারের মাধ্যমে নানা গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্ব আদায় করতেন।

        সারাদেশের মত মুক্তিযুদ্ধারের হঠাতে প্রান্তদের এলাকাতেও ঘাটি গাড়ে পাকিস্থানী সৈন্যরা। এলাকার জামাতে ইসলামী, মুসলিম লীগ সহ পাকিস্থান পন্তী স্বাধীনতা বিরুধী শক্তিসমূহ তাদের সার্বিক সহযোগিতা করে যেত।  তারা স্থানীয় জামাত, মুসলীম লীগ সহ স্বাধীনতা বিরুধী দল সমূহের কর্মীদের সমন্বয়ে গড়ে তুলেছিল রাজাকার বাহিনী। এ রাজাকার বাহিনীর সার্বিক তত্ত্বাবধানে ছিল তাদের নেতাদের নিয়ে গঠিত শান্তি বাহিনী। প্রান্তর বাবাও ছিলেন শান্তি বাহিনীর একজন সদস্য। তারা সব সময় চোখ কান খোলা রাখতেন যাতে তথাকথিত দোষকৃতকারী ভারতীয় চররা এলাকায় হানা দিয়ে যেন কোন বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে না পারে। কিন্তু রাজাকার আর পাকিস্থানী সৈন্যদের নিপীড়ন অত্যাচার আর স্ত্রাস তাদের চোখে পড়ত না তারা এ সকল অনৈতিক কার্য কলাপে বরং সাহায্য করে যেত।

     আজ প্রান্তর বাবা এলাকায় অবস্থান রত পাক সেনা কমান্ডার, এলাকার শান্তি কমিটির চ্যেয়ারম্যান সদস্যসহ নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের  সবাইকে তার ঘরে দাওয়াত দেয়। উদ্দেশ্য পাক সৈন্যদের সুনজরে থাকা এবং এলাকার সার্বিক আইন শৃঙ্খলা পরিস্তিতি নিয়ে আলোচনা করা। যাতে মুক্তিফৌজরা এলাকায় হানা দিয়ে এলাকার আইন শৃঙ্খলা পরিস্তিতির অবনতি ঘটাতে না পারে। কারন কিছুদিন আগে শান্তি কমিটির একজন সদস্যের বাড়ীতে রাত্রে হানা দিয়ে মুক্তি বাহিনীর ছেলেরা তার কান কেটে নিয়েছে, আর শাসিয়ে গেছে পাকিস্তান প্রীতি যদি বন্ধ না করে তা হলে তাকে হত্যা করা হবে। আর একজন সদস্যকে কাফনের কাপড় পাঠিয়ে সতর্ক করে দিয়েছে এই বলে যে, সে যদি আর পাকিস্থানের পক্ষ নিয়ে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে কাজ করে তাহলে তাকে গুলির আগায় প্রাণ দিয়ে মরতে হবে। তাছাড়া কিছুদিন আগে এই মুক্তি বাহিনী তাদের দুজন রাজাকার সদস্যকে হত্যা করে তাদের রাইফেল ছিনিয়ে নিয়ে গেছে। তাদের স্পর্ধা দিন দিন  এমন বেড়ে যচ্ছে যে, যে কোন সময় তারা এলাকায় অবস্থানরত দেশ প্রেমিক সৈন্যদেরও আক্রমন করতে পারে। যাই হউক সেদিন সারা দূপুর প্রান্তর বাবা অমিনুর রহমানের বাড়ীতে দূপুরের দাওয়াত সেড়ে খোশ গল্প করে কাটান পাক সেনা কমান্ডার। এবং সিদ্ধান্ত হয় মুক্তিবাহিনীর যে কোন নাশকতামূলক কার্যকলাপ কঠোর হাতে দমন করা হবে।

      প্রান্ত তার বাবার এ সকল স্বাধীনতা বিরুধী কার্যকলাপ কিছুতেই সহ্য করতে পারছিলনা। চারিদিকে পাক বাহিনী ও রাজাকার আলবদরদের অত্যাচার, নারী ধর্ষন, লুঠপাট প্রান্তকে এমন বিদ্রোহী করে তুলেছিল যে, সে সিদ্ধান্ত নিল যে কোন ভাবেই হোক ভারত চলে যাবে। সেখানে গিয়ে মুক্তি যুদ্ধে অংশ গ্রহন করে এর প্রতিশোধ নেবে।

প্রান্ত কাউকে কোন কিছু না বলে গোপনে চেষ্টা করে যাচ্ছিল কিভাবে মুক্তি যুদ্ধে অংশ গ্রহন করা যায় খবর পেল  তাদের পাশের বাড়ীর এক আওয়ামীলীগ নেতা গোপনে অনেক ছেলেকে মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহন করতে ভারতে  নিয়ে যাচ্ছে। একদিন গোপনে সেও লোকটির সাথে দেখা করে তাকে ভারতে নিয়ে গিয়ে মুক্তি যুদ্ধে অংশ গ্রহনের  সুযোগ করে দেওয়ার জন্য অনুরোধ করল। তিনি প্রথমে ইতস্ততঃ করলেন, কারন প্রান্তর বাবা একজন মুসলিম লীগার এবং শান্তি বাহিনীর সদস্য, সে কিভাবে মুক্তি বাহিনীতে অংশ গ্রহন করবে। পরে চিন্তা করল সে শান্তি কমিটির সদস্যের ছেলে হলেও সে স্বাধীনতার পক্ষের। সত্তরের নির্বাচনে সে আওয়ামীলীগের পক্ষে ভিতরে ভিতরে অনেক কাজ করেছে। এ সকল বিষয় এ নেতার মনে আছে। তাই সে তাকে প্রতিশ্রুতি দিল নিয়ে যাবার। তবে তাকে সতর্ক করলেন বিষয়টা যেন গোপন থাকে  যাতে কাক পক্ষীও টের না পায়। নেতা বলল, তুমি প্রস্তুত হয়ে থাক যাতে আমি বলার সাথে সাথে তুমি যেতে পার।

সাপ্তাহ খানেক পরে নেতার সহযোগিতায় সে সীমান্ত পেরিয়ে অন্যান্য অনেক যুবকের সাথে ভারত গিয়ে পৌঁছল।  সেখানে হাজার হাজার ছেলে দেশ মাতৃকার জন্য যুদ্ধ করতে শসস্ত্র ট্রেনিং নিয়ে প্রস্তুত হচ্ছে। সে অবাক হয়ে দেখল সবার চোখে মুখে প্রতিশোধের আগুন বারুদের মত দাউ দাউ করে জ্বলছে, মুক্তির কি এক অনন্য নেশা সকলের মধ্যে। দেখল 'পাতলা ডাল' আর 'মোটা চালের ভাত' খেয়ে 'কোঁচ মারা লুঙ্গী' আর গেঞ্জী পরে বনে জঙ্গলে পালিয়ে পালিয়ে হাজার হাজার বাংলার তরুন যুবা প্রৌড় নারী পুরুষ যুদ্ধ করেছে শত্রুর বিরুদ্ধে।   মৃত্যু যে সব সময় তাদের তাড়া করে ফিরছে সে দিকে তাদের কোন ভ্রক্ষেপ নেই। মুক্ত বাংলাদেশ তথা স্বাধীনতাই যেন তাদের সবার কাম্য।124

   এদিকে প্রান্তকে খুঁজে না পেয়ে তার বাবার বুঝতে বাকী রইলনা সে মুক্তি যুদ্ধে অংশ গ্রহন করতে ভারতে পালিয়ে গেছে। ছেলের মুক্তি যুদ্ধে অংশ গ্রহন তাকে খুবিই বেকায়দা ফেলে দিয়েছে। সে এখন তার এলাকায় অবস্থানরত পাক বাহিনীকে  কি জবাব দেবে?  কি জবাব দেবে শান্তি কমিটিকে? সে বিষম চিন্তায় পড়ে গেল, সবার কাছে তার বিশ্বাসের ভিত অনেক আলগা হয়ে যাবে। তাছাড়া পাক সেনা কমান্ডারও তার ছেলে মুক্তি বাহিনীতে যোগ দেয়ার খবর শুনলে কি রকম প্রতিক্রিয়া দেখায় তাও তিনি ভেবে কুল পাচ্ছিলনা। তিনি ভয়ে ভয়ে বিষয়টা বেশ কয়দিন গোপন রাখলেও পরে ছেলের মুক্তি বাহিনীতে যোগ দেয়ার কথাটা চারিদিকে ফাঁস হয়ে গেল।

শান্তি কমিটির সদস্য আমিনুর রহমানের ছেলে কি ভাবে মুক্তি বাহিনীতে যোগ দিল বিষয়টা তার বন্ধু স্থানীয় পাক কমান্ডার খুব গুরুত্বের সাথে নিল এবং শান্তি কমিটির এক বৈঠক ডাকল। বৈঠকে এব্যপারে সিদ্ধান্ত হল এক সাপ্তাহের মধ্যে আমিন সাহেব যদি তার ছেলেকে মুক্তি সংগ্রাম থেকে ফিরিয়ে আনতে না পারেন তাহলে তাকে আর শান্তি কমিটির সদস্য হিসাবে রাখা হবেনা এবং ঘোরতর পরিনতি ভোগ করতে হবে। তাকে তাদের শত্রু বলে গন্য করা হবে। আমিন সাহেব তাদের অনেক বুঝাতে চেষ্টা করলেন এব্যপারে তার কোন হাত নেই, আওয়ামীলীগের ছেলে পিলেরা তাকে ফুসলিয়ে নিয়ে গেছে। কথা দিলেন, তিনি চেষ্টা করে দেখবেন ছেলেকে ফিরিয়ে আনতে।

আমিনুর রহমান অনেক কাঠ খড় পোড়ালেন, অনেক চেষ্টা করলেন, সাপ্তাহের বেশী পার হয়ে গেল, কিন্তু ছেলেকে ফিরিয়ে আনার সব চেষ্টায় তার বিফলে গেল। সে এখন আর পাক বাহিনীর সাথে যোগাযোগ রক্ষা করার সাহস পর্যন্ত করছে না। পাক বাহিনীর কাছে বৈরী ঘোষিত হবার পর এতদিনে সে উপলব্দী করতে পারছে সারাদেশ কিভাবে এক ভীতিকর অবস্থার মধ্যে কালাতিপাত করছে সাধারণ মানুষ। এদিকে পাক বাহিনীর ভয়ে তার রাজনৈতিক সহ কর্মীরাও তাকে আর কোন সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে না। কোন যোগাযোগও রাখছেনা। তার থেকে দূরে দূরে থাকছে।

  এইভাবে তার দিন অতিবাহিত হচ্ছিল ভয়ে ভয়ে।            হঠাৎ একদিন গভীর রাতে আমিন সাহেবের বাড়ী ঘিরে ফেলল পাক বাহিনী। অস্ত্র নিয়ে ঘরে ঢুকে সেনা কমান্ডারসহ চার পাঁচ জন সেনা। তারা নাকি খবর পেয়েছে প্রান্ত আজ রাতে গোপনে বাড়ীতে এসেছে, সে জন্য তারা তল্লাসী করতে এসেছে। আমিন সাহেব অসহয়ের মত এ তল্লাসী প্রত্যক্ষ করছেন অস্ত্রের মুখে। কিন্তু বলার কিছুই ছিল না। অবাক লাগে কিছুদিন আগে যে কামান্ডার সাহেবকে জামাই আদর দিয়ে তার বাসায় এনে দাওয়াত খাওয়ায়েছেন, সেই কমান্ডার আজ চক্ষু লজ্জার মাথা খেয়ে অসম্মান জনকভাবে তার ঘর তল্লাসী করছে। কি ঠৌঁট কাটা এ পাকিস্থানীরা।

এদিকে চরিত্রহীন সেনা কমান্ডার মেজর জোয়ারদার তল্লাসী চালাতে গিয়ে তার  মেয়ে রোশনীর দিকে চোখ পড়ে। সেদিন রুশনীকে দেখে সে মনে মনে ফন্দী আঁটে যেভাবেই হউক রুশনীকে তার চাই।

শ্বাস করতে পারছেনা। তারাও তার কাছ থেকে দূরে দূরে অবস্থান করছে। আমিন সাহেব এখন চিন্তায় চিন্তায় অসহায়ভাবে দিন কাটাচ্ছে, তার ঘরে যুবতী কন্যা তিনি জানেন পাক সৈন্যরা  সুযোগে পোলে যে কোন সময় তার কন্যার উপর লুলুপআমিন সাহেব এখন পাকিস্থানের একনিষ্ট সেবক একথা আর পাক সেনারা বিশ্বাস করে না। যেহেতু তারা বিশ্বাস করে না সেহেতু তাদের পদলেহী চাঁটার দল মুসলীম লীগার, জামাত বন্ধুরাও আমিন সহেবকে বি দৃষ্টি ফেলবে। এ রকম বৈরী পরিবেশে তার এলাকায় অবস্থান করা খুবই ঝুঁকির ব্যপার। সে চিন্তা করল পরিবারসহ শহরে গিয়ে কোন এক অজ্ঞাত স্থানে আত্মগোপন করে নিজের জান আর পরিবারের মান বাঁচাবেন।

আমিন সাহেব তার চিন্তা কর্যকরী করার আগেই পরের দিন রাত এগারটা বারটার দিকে পাক সৈন্যরা এসে  অস্ত্রের মুখে তাকে ও তার কন্যা রোশনীকে ধরে নিয়ে গেল সেনা কেম্পে। রাতেই জিজ্ঞাসাবাদ করা হল আমিন সাহেকে। তার ছেলে কোথায়? সে কেন পাকিস্থান রক্ষার মুখোস পরে ভিতরে ভিতরে বাংলাদেশের জন্য কাজ করছে? কমান্ডার তাকে  বলল,

"সঠিক কথা যদি স্বীকার না কর তাহলে তোমার সামনেই তোমার মেয়েকে ধর্ষন করা হবে।"

আমিন সাহেব কান্না করতে করতে বলে,

 "স্যার আমি সারা জীবন পাকিস্থানের সেবা করে আসছি, এ পর্যন্ত পাকিস্থান রক্ষার জন্য যা কিছু প্রয়োজন তা করছি। আমি কোনদিন পাকিস্থানের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করিনি। আমার ছেলে পাড়ার ছেলেদের পাল্লায় পরে মুক্তি যুদ্ধে গেছে আমি তা গুনাক্ষরে জানিনা, জানলে আমি তাকে যেতে দিতাম না।"

 আমিন সাহেবের এক সময়ের জানে দোস্ত  তার কথা বিশ্বাস করল না।  আমিন সাহেব কমান্ডারকে অনেক অনুরোধ করে বললেন,  "আপনি যদি আমাকে বিশ্বাস না করেন আমরা বাপ বেঠীকে একসাথে গুলি করে মেরে ফেলেন, তবুও আমার মেয়ের ইজ্জত নষ্ট করবেন না, আমাকে এত রড় শাস্তি দিবেন না।"

কমান্ডার তার কোন কথায় শুনলেন না।  তার সমনেই বিবস্ত্র করে ধর্ষন করল তার মেয়েকে রুশনীকে। তারপর মেয়ের সামনে গুলি করে মেরে ফেলা হলো আমিন সাহেবকে।

আমিন সাহেবের মৃত্যুর কথা শুনে স্ত্রী পাগলিনীর মত তার রাজনৈতিক বন্ধু মুসলিম লীগার, জামাতীদের দুয়ারে দুয়ারে ধর্ণা দেয় তার স্বামীকে তো মেরে ফেলা হয়েছে অন্ততঃ এখন তার মেয়েটাকে যেন মুক্তি দেয়া হয়। কিন্তু এখন সকলে তার পর হয়ে গেছে, যারা একদিন তাদের তোষামোদ করত তারা সবাই আজ বিপদের দিনে দূরে সরে গেছে। এত চেষ্টার পরও যখন তিনি কিছুই করতে পারছিলেননা তিনি সরাসরি পাক কমান্ডারের কাছে গিয়ে তার মেয়েকে ছাড়ে দিতে অনুরোধ করলেন। কিন্তু তার সব চেষ্টা বিফল হল। তিনি স্বামী হত্যার শোক আর মেয়ে ধর্ষিত হবার লজ্জায় অল্প দিনেই এ পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে পরপারে চলে গেলেন।

 প্রান্ত ভারতে মুক্তি যুদ্ধের ট্রেনিংরত অবস্থায় তার পরিবারের এ করুন বিয়োগান্ত পরিনতির কথা শুনে প্রছন্ড ব্যথা পেলেন, তার ক্রোধের আগুন দাউ দাউ করে জ্বলতে লাগল, সে পণ করল জীবন দিয়ে হলেও সে তার প্রিতৃ হত্যা ও বোনের ইজ্জত হরনের প্রতিশোধ নিয়েই ছাড়বে।

প্রান্তর বাবা মা'র মৃত্যুর পর আরো প্রায় মাস দুই চলে গেছে। প্রান্ত এখন প্রশিক্ষন নিয়ে একটি গেরিলা বাহিনীর কমান্ডার। তাকে দলবল নিয়ে বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছে অপারেশন পরিচালনার জন্য। জুন জুলাই সে চট্টগ্রাম শহরও আশ পাশে বেশ কয়েকটি দুঃসাহসিক আক্রমন পরিচালনা করে। এতে পাকিস্থানী সেনাবাহিনীর বেশ ক্ষয় ক্ষতি হয়। ১৪ই আগষ্ট পাকিস্থানের স্বাধীনতা দিবস। ওই দিন পাকিস্থানী সেনা বাহিনী অন্যান্য এলাকার মত তাদের এলাকায়ও জাঁকঝমকপূর্ণ ভাবে দিবসটি পালনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। মোক্ষম সুযোগ, যে পাকিস্থানী সেনারা তার বাবাকে হত্যা করছে, তার বোনের ইজ্জত লুন্ঠন করে বন্দী করে রেখেছে,  তার মাকে তিলে তিলে দগ্ধ করে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছে তাদের কমান্ডার মেজর জোয়ারদার সহ সবাইকে উচিৎ শিক্ষা দেয়ার উপযুক্ত সময়।

১৩ই আগষ্ট রাতে অতি সন্তর্পনে পাক সৈন্যদের চোখ ফাঁকি দিয়ে ২০ জনের একটি গেরিলাদল প্রান্তর নেতৃত্বে তাদের এলাকায় অতি নির্জন স্থানে এক পরিত্যক্ত ঘরে এসে অবস্থান নেয়। সারা রাত তারা পাক সৈন্যদের ঘাটি এবং গতিবিধি পর্যবেক্ষন তথা রেকী করে। আগামীকাল চৌদ্দই আগষ্ট তাদের স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্টানের ব্যস্ততায় অতর্কিতে আক্রমনের জন্য সব কিছু প্রস্তুত করে রাখা হয়েছে। এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা। অাসল ১৪ই আগষ্ট। তখন রাত দশটা।  তারা সবাই স্বাধীনতা দিবসের আনন্দে মশগুল। বাইরে রাজাকাররা তাদের পাহাড়া দিচ্ছে। এমনি সময় অতর্কিতে উপর্যপরি আক্রমনে পাকিস্থানী বাহিনী দিশেহারা। তাদের পাল্টা আক্রমনের সুযোগ না দিয়ে  মুক্তিযুদ্ধারা ঢুকে পরে তাদের কেম্পে। এমনি এক অপ্রস্তুত অবস্থায় তারা কিছু বুঝে উঠতে না পেরে দিশেহারা হয়ে ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। প্রান্তর নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধারা কামান্ডার সহ পাক সেনাদের বেশীরভাগকে হত্যা করে আর বাকী গুলা এদিক ওদিক পালিয়ে প্রাণে বাঁচে। প্রান্তরা রুশনী সহ যারা বন্দী অবস্থায় ছিল সবাইকে মুক্ত করে নিয়ে পালিয়ে যায়।

   দিন যত যেতে থাকে মুক্তিবাহিনী সারা দেশে সংগঠিভাবে আক্রমন চালাতে থাকে। সীমান্ত এলাকার পাক ঘাটিগুলো একটার পর একটা মুক্তি বাহিনীর দখলে চলে আসে। পাশা পাশি গেরিলা আক্রমনও তীব্র থেকে তীব্রতর হতে থাকে। এমনিতে পাকিস্থানী বাহিনী এবং তাদের সহযোগী বাহিনীর কাজ ছিল সাধারন মামুষের উপর অত্যাচার করা। দেশ প্রেমিক বাঙ্গালীদের নির্য়াতন করা। সীমান্তে ও দেশের অভ্যন্তরে মুক্তিযুদ্ধাদের প্রচন্ড আক্রমনের জবাবে তারা অত্যাচারের মাত্রা আরো বাড়িয়ে দেয়। মুক্তি বাহিনীর প্রবল প্রতিরোধের মুখে তারা দিনের বেলায়ও নিজেদের সামরিক ঘাঁটি থেকেও বের হতে ভয় পেতে লাগল। এমনি পরিস্তিতিতে পশ্চিম পাকিস্থান থেকে আরো সৈন্য তলব করা হয়।

  মুক্তিযুদ্ধ যখন চরম পরিনতির দিকে ধাবিত হচ্ছে মুক্তি যুদ্ধা ও গেরিলাযুদ্ধাদের আক্রমন পাল্টা আক্রমনে পাকিস্থানী সামরিক বাহিনীর অবস্থা এতটাই সূচনীয় হয়ে পড়ে যে উপায়আন্তর না দেখে পাকিস্থান ঘটনা ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার জন্য ভারতের উপর বিমান হামলা চালিয়ে যুদ্ধকে আন্তর্জাতিক রূপ দেয়ার চেষ্টা চালায়। সে লক্ষে পাকিস্থান ৩রা ডিসেম্বর আচমকা ১১টি ভারতীয় এয়ার বাসে হানা দিলে অপারেশান চেঙ্গিসখান নামে এই যুদ্ধের সূচনা ঘঠে। ভারত মুক্তি বাহিনীর পক্ষ নিয়ে এ যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়।

ভারত ও পাকিস্থান উভয় পক্ষ পূর্ব ও পশ্চিম রণাঙ্গনে সংর্ঘষে লিপ্ত হয়। পূর্ব রণাঙ্গনে মিত্র বাহিনী ও মুক্তি বাহিনীর যৌথ আক্রমনে এবং সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফুর্ত সহযোগিতায় সারা দেশে একের পর এক পাকিস্থানী ঘাটির পতন ঘটতে থাকে। যৌথ বাহিনী ধীরে ধীরে ঢাকার দিকে এগিয়ে যেতে থাকে। যুদ্ধ ঘোষনার মাত্র তের দিনের মাথায় ১৬ই ডিসেম্বর যৌথ বাহিনীর নিকট পর্যোদস্ত ও হতোদ্যম পাকিস্তানী বাহিনী ৯৩০০০হাজার সৈন্যসহ রেসকোর্স ময়দানে আত্মসমর্পন করতে বাধ্য হয়। এই আত্ম সমর্পনের মধ্য দিয়ে শেষ হল বাঙালীর নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের, পৃথিবীর বুকে জন্ম নিল আর একটি স্বাধীন দেশ। যার নাম বাংলাদেশ।

এদিকে চট্টগ্রামেও মক্তিযুদ্ধারা  শহরের দিকে এগুতে থাকে। ভারতীয় মিত্র বাহিনী ও মুক্তি বাহিনীর চারিদিক থেকে সাঁড়াসী আক্রমনে দিশেহারা হয়ে পাক বাহিনী শহরের দিকে পালাতে থাকে।  প্রান্তদের দলও ১৫ই ডিসেম্বর চট্টগ্রমের আশ পাশ হানাদার মুক্ত করে। চট্টগ্রাম শহরের প্রধান রক্ষাব্যূহে  আক্রমন চালায়। সারা রাত পাক বাহিনীর সাথে মুক্তি বাহিনী ও মিত্র বাহিনীর যুদ্ধ চলে। রাস্তায় রাস্তায় যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে। অবশেষে ১৬ই ডিসেম্বর প্রান্ত সহ হাজার হাজার মুক্তি যুদ্ধা বিজয় উল্লাসের মধ্য দিয়ে বিজয়ীর বেশে চট্টগ্রাম শহরে প্রবেশ করে। হাজার হাজার জনতা হর্ষধ্বনী দিয়ে তাদের স্বাগত জানায়। দেশ স্বাধীন হয়েছে আজ লক্ষ লক্ষ শহীদের রক্ত ও হাজার হাজার মা বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে। যারা মা হারিয়েছে, যারা বাবা হারিয়েছে, যাদের মা বোন ধর্ষিতা, তারা কি এআনন্দের ভাগীদার হতে পারছে? প্রান্তও সে রকম একজন ভাগ্যবিড়ম্বিত মুক্তিযুদ্ধা। এ স্বাধীনতা তার বাবা মা কেড়ে নিয়েছে। বোনকে করেছে কলঙ্কিত। তবু তার আক্ষেপ নাই, অন্ততঃ তারা  নতুন প্রজন্মের জন্য একটা স্বাধীন আবাস ভূমি  অর্জন করেছে।যেখানে তারা স্বাধীনভাবে বিচরন করতে পারবে। গলা ছেড়ে গাইতে পারবে "আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি"। আর নিজেদের ভাগ্য নিজেরা গড়তে পারবে। কোন বিদেশী আর তাদের উপর রাজা হয়ে আসবেনা।

  প্রান্ত তিনমাস আগে পাক হানাদার বাহিনীর কাছ থেকে উদ্ধার করে তার বোনকে যাদের জিম্মায় দিয়ে গিয়েছিল সেখান থেকে নিয়ে আসল নিজের কাছে। বিধ্বস্ত বিপর্যস্ত রুশনী আজ আর আগের মত নেই। বেঁচে থেকেও সে জীবমৃত। প্রান্ত লক্ষ করল রুশনী শুধু আজ একা নয়। রুশনীর ভিতর বাসা বেঁধেছে আরেক অস্তিত্ব। যে অস্তিত্বের ধমনীতে বইছে পাক হানাদারের রক্ত। প্রান্তু ভেবে অস্তির কি করবে সে। আমাদের যে সমাজ ব্যবস্থা মানুষ ত বুঝতে চাইবেনা কোন্ পরিস্থিতিতে আজ তার বোনের এ অবস্থা হয়েছে। প্রান্তু সিদ্ধান্ত নিল রুশনীর সাথে কথা বলে এ অনাগত সন্তানকে সে নষ্ট করে ফেলবে।

স্বাধীনতার মাস খানেক পর প্রান্ত একদিন সুযোগ বুঝে রুশনীকে কথাটা পাড়ল। প্রান্ত ভাবেনি রুশনী এভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে।  রুশনী কিছুতেই এ অনাগত যুদ্ধ শিশুকে নষ্ট করতে রাজি হল না। তার মধ্যে জেগে উঠল নারীর স্বাসতঃ মাতৃত্ব। একজন নারী হয়ে সে কিছুতেই তার পেটে ধারন করা সন্তানকে হত্যা করতে দিতে চাইছে না। হউকনা সে অবাঞ্চিত। সে ত কোন দোষ করেনি। প্রান্ত তার আদরের বোনের ইচ্ছার অবমূল্যায়ন করেনি। তবে সে একটা শর্ত দিয়েছে এ সন্তান সে রাখতে পারবেনা। এ সন্তানকে যাতে সুন্দরভাবে গড়ে তুলে এরকম একজন দম্পতিকে দত্তক দিয়ে দিতে হবে। রুশনীর সন্তানের প্রতি মমতা ভায়ের অনুরোধের কাছে হার মানতে হল। সে তার প্রস্তাবে রাজি হল।

আরো মাস দুয়েক কেটে গেছে, রুশনী জন্ম দিল তার সে

অবাঞ্চিত যুদ্ধ শিশুর। রুশনীকে ভায়ের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে গিয়ে সে শিশুকে দত্তক হিসাবে তুলে দিল এক বৃটিস দম্পতির নিকট। রুশনীর নাড়ী ছেড়া ধন অবাঞ্চিত বলে চলে গেল অন্যকে মা ডাকতে। অন্যের স্বপ্নিল জগৎকে আলোকিত করতে। রুশনী ভাবে পৃথিবীটা কত বিচিত্র! একজনের কামনার আখাঙ্খা মিটাতে কত নারীকে বলী হতে হয় সমাজ নামক খর্গের নীচে। আবার সে সুযোগ কাজে লাগিয়ে আর এক নিঃসন্তান দম্পতির স্বপ্ন রঙিন হয়। আর এক জনের বুক ভরে উঠে। দুনিয়াটা এ রকমই জোয়ার ভাটার খেলা।

নব জাতককে দত্তক দিয়ে রুশনীর মন খুবই বিষন্ন হয়ে গেল। জন্মের পর মাত্র মাস খানেক কাল দেখা শিশুটি তার চোখে সারাদিন ভাসছে, যেন তাকে মা মা করে ডাকছে। তার স্তন্য পান করতে কান্না করছে। সে কাছুতেই ভূলতে পরছেনা তার জঠরে বেড়ে উঠা সে যুদ্ধ শিশুটিকে।

আজ সকাল সকাল প্রান্তকে একটু বের হতে হচ্ছে জরুরী কাজে। রুশনীকে বলে গেছে তার জন্য অপেক্ষা না করে তার খাবার খেয়ে নিতে।

প্রান্ত সারা দিন তার কাজে ব্যস্ত, একটুও ফুরসত ছিলনা। রাত্রে বাসায় ফিরে বন্ধ দরজার সামনে  রুশনীকে ডাকল দরজা খুলতে। কিন্তু কোন সারা শব্দ নেই। ব্যপার কি! ভড়কে গেল প্রান্ত। শেষ মেষ দরজা ভাংতে হল তাকে, ঘরে ডুকে দেখে রুশনী তার ঘরে শাড়ী জড়িয়ে সিলিং ফ্যানে ঝুলে আছে। প্রান্ত তাকে জড়িয়ে ধরে বাঁচানোর চেষ্ট করলেন। কিন্তু তখন সে আর এ জগতে নাই। নিথর দেহ হিম শীতল হয়ে ঝুলে আছে সিলিং ফ্যানে।

      অনেক রক্ত, অনেক ত্যাগ, অনেক নারীর ইজ্জতের বিনিময়ে পাওয়া আমাদের এ বাংলাদেশ। প্রান্তদের মত  অনেক পরিবার ছারখার হয়ে, মা বাবা ভাই বোন আত্মীয় স্বজন হারিয়ে আমরা পেয়েছি বাংলার এই স্বাধীনতা।

 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

২৬ তম পর্ব ২০০৬ সালে বি এন পি'র তত্ত্বাবধায়ক সরকার নাটক:

 . ২০০৬ সালে বি এন পি'র তত্ত্বাবধায়ক সরকার নাটক:-২০০৬ সলের জোট সরকার মেয়াদ শেষ হলে ক্ষমতা ছাড়ার সময় অাবার দেখা দেয় দুই প্রধান দল তথা জোট...