Pages

মঙ্গলবার, ১৬ আগস্ট, ২০২২

২য় পর্ব “চোখে দেখা রাজনীতির” ২য় পর্বে ২৫শে মার্চের কাল রাত, বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষনায় চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগের তৎপরতা


 

প্রান্ত ও তার বন্ধুদের ২৫শে মার্চ পরবর্তী ভূমিকা:- পঁচিশে মার্চ প্রান্ত অনেক রাত পর্যন্ত তার খালাত ভাই হোসেন ও আরো কয়েকজন বন্ধু বান্ধব মিলে তাদের কাছাড়ি ঘরে আলাপ করছিল দেশের এই অনিশ্চিত পরিস্তিতি নিয়ে। আলাপ শেষ করে ঘুমোতো ঘুমোতে তাদের গভীর রাতে হয়ে যায়। তাই  সকলে উঠতে প্রান্তের  প্রায় দশটা বেজে যায়। সকলে ঘুম থেকে উঠে প্রান্ত দেখতে পায় বাড়ী উঠোনে সব জায়গায় জটলা পাকিয়ে সকলে কি যেন আলোচনা করছে, প্রান্তর বুঝতে বাকী রইল না দেশে অস্বাভাবিক কোন ঘটনা ঘটেছে নিশ্চয় তাই এ সব আলোচনা। প্রান্ত ঘটনা কি বুঝতে একটা জটলার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। জটলার আলোচনা থেকে সে বুঝতে পারল সারা দেশে  পাকিস্থানী সৈন্যরা কেন্টনমেন্ট, ইপি আর কেম্পে  অতর্কিতে হামলা চালিয়ে বাঙ্গালী পুলিশ, ইপিআর এবং সশস্ত্র বাহিনীর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তাদের অনেককে হত্যা করেছে অনেককে আহত করেছে। এর মধ্য যারা প্রাণে বেঁচে গেছে তারা পালিয়ে আশে পাশের বিভিন্ন লোকালয়ে আশ্রয় নিয়েছে।  প্রান্তুদের এলাকাতেও অনেক বাঙালী ইপিআর ও সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য আশ্রয় নিয়েছে। প্রান্তু আর দেরী না করে কয় বন্ধু মিলে পালিয়ে আসা সেনা সদস্যদের দেখতে গেল। তাদের কাছ থেকে শুনল কিভাবে এই পাকিস্থানী সৈন্যরা ঘুমন্ত অবস্তায় তাদের উপর আক্রমন চালিয়ে আহত এবং নিহত করেছে। এখন প্রান্ত বন্ধুদের নিয়ে চিন্তা করল আহত সৈন্যদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে আর প্রতিরোধ যুদ্ধের জন্য সুস্থ সৈন্যদের  খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে তাদের মনোবল চাঙ্গা করতে হবে। প্রান্তরা অন্যদের দিকে তাকিয়ে না থেকে তারা চার পাঁচ জন বন্ধু মিলে বাড়ীতে বাড়ীতে বেরিয়ে গেল এই ধেয়ে আসা সৈনিকদের জন্য চাল ডাল টাকা পয়সা সহ বিভিন্ন সাহায্য সংগ্রহ করতে। এভাবে সাহায্য সংগ্রহ করে প্রান্তুরা তাদের এলাকার আশ্রিত সেনা সদস্যদের সাহায্য করে যচ্ছিল। পরের দিন প্রান্তরা দেখতে পেল হাজার হাজার নারী পুরুষ পাকিস্থানী সৈন্য আর বিহারীদের অত্যাচারের ভয়ে শহর ছেড়ে গ্রামে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাচ্ছে। প্রান্তদের আর একটা দল নিয়োজিত হল তাদের চলার পথে চিড়া মুড়ি দিয়ে আর পানি পান করিয়ে সাহায্য করতে। অন্তুর বাবাসহ পাকিস্থান পন্তীরা এসকল বিষয় পর্যবেক্ষন করতে লাগল। কিন্তু তখনো তারা মুখ খুলছেনা।

        এদিকে ২৫ শে মার্চ চট্টগ্রামে আওয়ামী লীগ নেতারা রাতে শহরে তৎকালীন আওয়ামীলীগ নেতা ও গণ পরিষদ সদস্য এম আর সিদ্দিকীর বাসায় আশু করনীয় নিয়ে আলোচনা করছিলেন। আলোচনার এক পর্যায়ে তারা চলে যান আরেক আওয়ামীলীগ নেতা জহুর আহাম্মদ চৌধূরীর বাসায়। সেখানে তারা রাত বারটার পর জানতে পারেন বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা ঘোষনা করেছেন। পরে সেখান থেকে এসে আওয়ামীলীগ নেতা এম এ হান্নান বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষনা রাতেই সারা শহরে মাইক যোগে প্রচার করতে থাকেন। এবং ঘোষনার সাইকোষ্টাইল কপি বিভিন্ন আওয়ামী লীগ নেতাদের নিকটও পাঠিয়ে দেন ।

পরের দিন ছাব্বিশে মার্চ আওয়ামীলীগ নেতা আকতারুজ্জামান বাবুর বাসা জুপিটার হাউসে চট্টগ্রাম আওয়ামীলীগের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের উপস্তিতিতে সিদ্ধান্ত হয় বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষনা চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচার করার। ২৬শে মার্চ দূপুর দুইটায় বঙ্গবন্ধুর এ ঘোষনাটি তাঁর পক্ষে প্রথম পাঠ করেন সংগ্রাম পরিষদের অন্যতম নেতা এম এ হান্নান। ২৬শে মার্চ দূপুরে ও সন্ধ্যায় বেতারে এম এ হান্নানের ঘোষনা শুনে নেতা কর্মী ও জনসাধারনের মধ্যে প্রচন্ড উৎসাহ উদ্দীপনা ও মনোবল জেগে উঠে।

২৬শে মার্চ মেজর রফিক পরামর্শ দেন সেনাবাহিনীর সিনিয়র নেতা মেজর জিয়াকে দিয়ে বঙ্গবন্ধুর এ ঘোষনাটি পাঠ করাতে, এতে এদিক ওদিক ছত্রভঙ্গ হয়ে যাওয়া বাঙ্গালী সেনা সদস্যরা উৎসাহিত হয়ে প্রতিরোধের সাহস পাবে। তার এ পরামর্শ আওয়ামীলীগ নেতাদের মনপুতঃ হল,  তখন সংগ্রাম পরিষদের নেতারা মেজর জিয়াকে খুঁজতে থাকেন, তিনি তখন পাকিস্থানী সেনা কতৃপক্ষের সাথে বিদ্রোহের ঘোষনা দিয়ে বোয়ালখালীর করল ডাঙ্গা গ্রামে চলে আসেন। সেখানে গিয়ে এম এ হান্নান, এম এ মান্নান, আতাউর রহমান কায়ছার সহ একাধিক আওয়ামীলীগ নেতা বেতার কেন্দ্রে এসে বঙ্গ বন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষনা পত্রটি পাঠ করার জন্য তাকে অনুরোধ করেন।

এর প্রেক্ষিতে ২৭শে মার্চ সন্ধ্যা ৭.৩০ মিনিটে কালুর ঘাঠ বেতার কেন্দ্রে এসে শেখ মুজিবের পক্ষে তিনি প্রথম ঘোষনাটি পাঠ করেন।  এরপর ২৮ শে মার্চ তিনি আর একটি ঘোষনা দেন সেখানে "নিজেকে Provisonal head of the Swadhin bangla liberation Government. বলে উল্লেখ করেন। এর ফলে রাজনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবি এবং সচেতন মহলে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। কারন এ ঘোষনার মাধ্যমে বাঙালীর মুক্তিযুদ্ধকে পাকিস্থানী কতৃপক্ষ সেনা অভ্যূত্থান হিসাবে চালিয়ে দেওয়ার মোক্ষম সুযোগ পেয়ে যাবে। পাকিস্থানীরা যাতে সে সুযোগ না পায় সে জন্য আওয়ামীলীগ নেতারা এ ঘোষনার একটি সংশোধনী প্রচারে সচেষ্ট হলেন। সেসময় পাকিস্থানের এক সময়কার শিল্পমন্ত্রী ও বিশিষ্ট শিল্পপতি এ কে খান এবং আওয়ামীলীগ নেতারা মিলে জিয়ার ২৮শে মার্চের ঘোষনাটি সংশোধন করে ৩০শে মার্চ প্রভাতী অনুষ্টানে মেজর জিয়াকে এনে 'শেখ মুজিবর রহমানের নেতৃত্বে সরকার গঠন ও তার পক্ষে' স্বাধীনতার ঘোষনা দিয়ে পুনরায় তা পাঠ করান।

বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষনা পত্র পাঠ করার আগ পর্যন্ত জিয়ার কোন পরিচিতি ছিলনা। স্বাধীনতার ঘোষনা পত্র পাঠ করার পর তিনি কিছুটা পরিচিতি লাভ করেন। এখানে উল্লেখ্য যে স্বাধীনতার ঘোষনা থেকে নিয়ে প্রবাসী সরকার, পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ড সব কিছুতেই তিনি বিতর্কিত ভূমিকা পালন করেছেন। মুক্তিযুদ্ধে তার যোগ দেয়া নিয়েও  অনেক বিতর্ক রয়েছে। (নিম্নে জিয়ার মুক্তিয়ুদ্ধে অংশ গ্রহন নিয়ে একজন বিশ্লেষকের পর্যালোচনা হুবহু তুলে ধরছি। তিনি লিখেন, পাকিস্থানীরা চট্টগ্রাম সেনানিবাসে অতর্কিতে হামলা চালনোর খবর পেয়ে " তৎকালীন ইপি আর কেপ্টেন রফিক দাবী করেছেন তিনি চট্টগ্রাম কেন্টনমেন্ট আক্রমন করার জন্য লেঃ কর্ণেল এম এ চৌধূরী ও জিয়ার কাছে আওয়ামীলীগের দুজন নেতার মাধ্যমে খবর পাঠান। তার মতে এদুজন রাত নয়টার মধ্যে তাদের কাছে এ খবর পৌঁছেও দিয়েছিলেন। কিন্তু তারা পদক্ষেপ নেননি। ফল স্বরূপ উল্টো ২০তম বালুচ রজিমেন্ট রাত সাড়ে এগারটায় চট্টগ্রাম কেন্টনমেন্ট আক্রমন করে হাজার খানেক বাঙালী সৈন্যকে তাদের পরিবার সহ হত্যা করে। এ ঘটনায় লে কর্ণেল চৌধূরীও নিহত হন। এখন কথা হচ্ছে জিয়ার সোয়াত জাহাজে অস্ত্র খালাস করতে যাওয়া নিয়ে। এ বিষয়টাকে কাউন্টার দেওয়ার জন্য জিয়া স্বাধীনতা যুদ্ধের তিন বৎসর পর আত্মপক্ষ সমর্থন করে সাপ্তাহিক বিচিত্রায় একটি স্মৃতিচারনমূলক লেখা লেখেন, সেখানে তিনি লিখেছেন তিনি পাক সেনাদের নির্দেশ ও আদেশ অনুযায়ী রাত এগারটায় সোয়াত জাহাজ থেকে অস্ত্র খালাস কর্ম সম্পাদনের উদ্দেশ্যে নিজ ঘাঁটি ত্যাগ করেছিলেন। অর্থাৎ বেলুচ রেজিমেন্টের আক্রমনের আগেই তিনি ঘাঁটি পরিত্যাগ করেছিলেন। অর্থাৎ তিনি পাক বাহিনীর বাঙ্গালী সেনাদের উপর আক্রমনের কথা তিনি জানতেন না। কিন্তু তার এ দাবী নাকচ করে দিয়ে অলি আহম্মদ লিখেছেন জিয়া সোয়াত জাহাজের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছিলেন রাত পৌনে বারটায়। অর্থাৎ তিনি বুঝাতে চেয়েছেন বেলুচ রেজিমেন্ট দ্বারা চট্টগ্রাম কেন্টনমেন্ট আক্রান্ত হওয়ার পরই তিনি সোয়াত জাহাজ থেকে অস্ত্র খালাসের জন্য রওনা দেন। এখানে আমি প্রসঙ্গক্রমে কাদের সিদ্দিকীর লেখা 'স্বাধীনতা ৭১' থেকে উদ্ধৃতি দিচ্ছি। তিনি লিখেছেন 'জিয়া যাচ্ছিলেন কেন্টনমেন্টে আত্মসমর্পণ করতে, অলি আহাম্মদ বলতে গেলে তাকে গুলি করার হুমকী দিয়ে মুক্তি যুদ্ধের দিকে ফিরিয়ে আনেন'। "  (ডিক্টেটর মেজর জিয়াউর রহমান, ১৯৭১থেকে ৮১by knowledge.09/09/15))

যাই হউক এদিকে ওপারেশান সার্চ লাইটের মাধ্যমে ২৫শে মার্চের মধ্য রাতে ঘুমন্ত নিরস্ত্র বাঙালীর উপর পাকিস্থানীরা আধুনিক যুদ্ধাস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। বাঙালীর স্বাধীকার আন্দোলন, এমনকি জাতীয় নির্বাচনের ফলাফলে প্রাপ্ত তাদের ন্যায়সঙ্গত অধিকারকেও রক্তের বন্যায় ডুবিয়ে দিতে সারা দেশে তারা গণ হত্যা চলায় । পাকিস্থানী সামরিক জান্তা ঢাকায় অজস্র সাধারন নাগরিক, ছাত্র, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবি ও পুলিশকে হত্যা করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল, রোকেয়া হল, ইকবাল হল, শিক্ষকদের বাসা,  পিলখানা ই পি আর সদর দফতর, রাজারবাগ পুলিশ লেনে একযোগে হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে তারা হত্যা করে নিরস্ত্র দেশপ্রেমিক দেশের শ্রেষ্ট সন্তানদের। হত্যাকান্ডের খবর যাতে বিদেশে ছড়িয়ে পড়তে নাপারে সে জন্য যত বিদেশী সাংবাদিক ছিল সবাইকে দেশ থেকে বের করে দেয় । এরপরও একজন বৃটিস সাংবাদিক সাইমন ড্রিং জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পাকিস্থানী সৈন্যের চোখ ফাঁকি দিয়ে ঢাকায় অবস্থান করে এ নৃশংস গণ হত্যার খবর ও ছবি ওয়াশিংটন পোষ্টের মাধ্যমে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দেয়। দুঃখের বিষয় হল জামাতের মুখপত্র দৈনিক সংগ্রাম পত্রিকা এ সময়  প্রকাশিত হত্যাকান্ডের এ ছবিকে সত্তোরের ঘুর্নীঝড়ে নিহতদের ছবি বলে পত্রিকায় খবর প্রকাশ করে। যাই হউক তথন পাকিস্থানীদের আক্রমনের লক্ষ ছিল স্বাধীকার আন্দোলনের সূতিকাগার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হল গুলো। সেদিন শুধু জগন্নাথ হলেরই প্রায় ৬০০/৭০০ জন ছাত্রকে হত্যা করা হয়। ধরে নিয়ে যাওয়া হয় রোকেয়া হলের অনেক ছাত্রীকে,

হত্যা করা হয় অনেককে।



কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

২৬ তম পর্ব ২০০৬ সালে বি এন পি'র তত্ত্বাবধায়ক সরকার নাটক:

 . ২০০৬ সালে বি এন পি'র তত্ত্বাবধায়ক সরকার নাটক:-২০০৬ সলের জোট সরকার মেয়াদ শেষ হলে ক্ষমতা ছাড়ার সময় অাবার দেখা দেয় দুই প্রধান দল তথা জোট...