Pages

শুক্রবার, ১৮ নভেম্বর, ২০২২

২৩তম পর্ব শেখ হাসিনার প্রথম শাসনকাল(৯৬-২০০১-১৯৯৬)



 

  শেখ হাসিনা :-বঙ্গবন্ধুর কনিষ্ঠ কন্যা শেখ হাসিনারও রাজনীতিতে আগমন কোন সুখকর বিষয় ছিল না। ১৯৭৫ সালে ১৫ই আগষ্ট বঙ্গবন্ধু স্বপরিবারে নিহত হলে তিনি ভারতে কিছুকাল স্বনির্বাসিত জীবন যাপন করেন। ১৯৮১ সালে ৬ বৎসর নির্বাসিত জীবন যাপনের পর বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হয়ে বাংলাদেশে ফিরে আসেন। শেখ হাসিনা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রী লাভ করেন। ছাত্র জীবনে তিনি রোকেয়া হল শাখা ছাত্র লীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। বরাবরই  ছাত্রাবস্থায় তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের পর বিধ্বস্ত আওয়ামী লীগকে নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও সুসংগঠিত করে দীর্ঘ ২১ বৎসর পর ১৯৯৬ সালে ক্ষমতার বন্দরে এনে ভিড়ান। (সহায়ক সূত্র-বাংলা পিডিয়া,শেখ হসিনা)

শেখ হাসিনার প্রথম শাসনকাল(৯৬-২০০১):-১৯৯৬ সালে ১২ জুন তত্বাবদায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্টিত নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ১৪৬টি আসন পেয়ে জয়লাভ করে। বি এন পি ১১৬টি আসন পেয়ে ২য় অবস্থান দখল করে বৃহত্তর বিরুধী দলের মর্যাদা লাভ করে। ২৩শে জুন শেখ হসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে।

ক্ষমতা গ্রহনের পরই তার সরকার আইনের শাসন, গণতন্ত্র, আর্থসামাজিক প্রগতিকে একটা ভিতের উপর দাঁড় করানোর প্রয়াস ছিল লক্ষনীয় । রাষ্টপতি ছিল দেশে একটি সর্বোচ্ছ সাংবিধানিক পদ। তিনি এপদকে সকল বিতর্কের উর্ধে রাখতে দলীয় ব্যক্তির পরিবর্তে নিরপেক্ষ ব্যক্তি বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহামদকে প্রসিডেন্ট হিসাবে মনোনয়ন দেন।

তিনি সরকারের সচ্ছতা এবং জবাবদীহিতা নিশ্চিত করতে ৩৫টি রেকর্ড সংখ্যক সংসদীয় কমিটিতে মন্ত্রীর পরিবর্তে সরকার ও বিরুধীদলের সাংসদের সভাপতি করেন। সুশাসন, আইনের সময়োপযুগী পরিবর্তনের জন্য প্রাশাসনিক ও আইন সংস্কার কমিটি গঠন করেন।

দারিদ্র বিমোচন, নারীর ক্ষমতায়ন, মানব সম্পদ উন্নয়নে নেয়া হয় বাস্তব পদক্ষেপ। সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী সম্পসারিত করা হয়। আগামী শতাব্দীর কথা বিবেচনায় রেখে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যনীতি প্রনয়ন করেন।

 সরকার কতৃক গৃহীত উদ্যোগের ফলে ১৯৯৯ সালের ১৭ই নভেম্বর ইউনেস্কো ভাষা দিবস ২১শে ফেব্রুয়ারীকে আন্তর্জাতিক মাতৃ ভাষা দিবস হিসাবে ঘোষনা করে। শেখ হাসিনা সরকারের আমলে গঙ্গার পানি চুক্তি, পার্বত্য শান্তি চুক্তি সাক্ষর ও বাস্তবায়ন প্র্রক্রিয়া শুরু হয়।

 বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবােরর হত্যাকারীদের আইনী সুরক্ষা দিতে যে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারী করা হয়েছিল তা বাতিল করে আইনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় বঙ্গবন্ধুর খুনীদের বিচারে সোপর্দ করে সত্য ও ন্যায়ের প্রতি তিনি তার অঙ্গীকার অক্ষুন্ন রাখেন। বিএনপি আমলে শুরু হওয়া যমুনা সেতুর কাজ ধারাবাহিকতা বজায় রেখে তাঁর আমলে সম্পন্ন হয়। তাঁর শাসন আমলে জিডিপির হার সাড়ে পাঁচ শতাংশে উন্নীত হয়। ২০০০সালে হাসিনা সরকার খাদ্যেও স্বয়ংসপূর্ণতা অর্জন করে। ২০০০-২০০১ সালে খাদ্য উৎপাদন দাঁড়ায় ২৬.৫মিলিয়ন মেট্রিক টনে। তিনি টেলি যোগাযোগ খাতকে ব্যক্তিখাতে উন্মুক্ত করে দিয়ে লেলুলার ফোনের মনোপুলি ব্যবসা ভেঙ্গে দিয়ে তা সাধারনের নাগালের মধ্যে নিয়ে আসেন।

  তিনি সামাজিক নিরাপ্ত্তা বেস্টনীর অংশ হিসাবে সারা দেশে বয়স্ক ভাতার ব্যবস্থা, গৃহহীনদের জন্য আশ্রয়ণ, বেকারদের জন্য কর্মসংস্থান ব্যঙ্ক, প্রতিবন্ধীদের প্রশিক্ষনের জন্য প্রতিবন্ধী ফাউন্ডেশান প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর আর একটি উল্লেখযোগ্য জনকল্যান মূলক প্রকল্প হল একটি বাড়ী একটি খামার।

তিনি নারীর কক্ষমতায়নের লক্ষে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে নারীদের জন্য তিনটি আসন সংরক্ষিত রাখার ব্যবস্থা রাখেন। তার প্রনীত জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি নারী পুরুষের সমতা আনয়ন, তাদের আর্ত সামাজিক উন্নয়নের মাধ্যমে, নারীদের উন্নয়নের মূল স্রোত ধারায় আনায়ন নিশ্চিত করার আর একটি শুভ উদ্যোগ।  শিশুদের সুষ্টভাবে বেড়ে উঠার লক্ষেও তিনি শিশুদের জন্য একটি কর্মপরিকল্পনা অনুমোদন করেন।

 শেখ হাসিনার এ সকল উদ্যোগ ও কর্ম পরিকল্পনা পরবর্তীতে জাতীয় উন্নয়নের স্রোতধারাকে অনেক বেগবান করেছে তা নিঃসন্দেহে বলা যায়।

সমালোচকরা বলেন শেখ হাসিনার সরকার ৯৬ সালে ক্ষমতা গ্রহনের পর প্রশাসনের সর্বস্তরে দূর্নীতি, স্বজন প্রীতি, আনুগত্য প্রীতির ভাইরাস আক্রমন করে। ফলে প্রশাসনে নেমে আসে স্থবিরতা । অনেকে অভিযোগ করে বলেন, দলীয় অনুগত কর্মচারী কর্মকর্তার অংশ 'আমরা রাজপথে নামার পর বিএনপি সরকার ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হয়েছে'। এরূপ আলোচনা সমালোচনায় ছয় মাস অতিবাহিত করে। গল্প গুজবের সাথে সাথে তারা আওয়ামী ঘনিষ্টতা বাড়ানোর জন্য প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়। ভাল লোভনীয় পোষ্ট ভাগিয়ে নেয়ার জন্য মন্ত্রীদের বা প্রধানমন্ত্রীর পূর্ব পরিচিত আপন জনদের বাড়ীতে যাতায়াত শুরু করেন। অনেকে সক্ষমও হন এপদ ভাগিয়ে নিতে।

১৯৯৬ সালে সচিবালয়ে কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে এক ভাষনদানকালে প্রধানমন্ত্রী ছয় মাসের মধ্যে নতুন বেতন কাঠামো দেয়ার কথা ঘোষনা করেন। কিন্তুু প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী তা বাস্তবায়িত হয়নি। সচিবালয় দেশের সকল প্রশাসনিক কাঠামোর প্রধান অঙ্গ। এই অঙ্গকে নিজের আয়ত্তে রাখতে শেখ হাসিনা সরকার অনুগতদের মধ্য থেকে পছন্দমত সচিব পর্যায়ে রদবদল করেন। বিগত (৯১-৯৬)সরকারের নিয়োগকৃত বা অপ্রকাশ্য দলীয় আনুগত্যদের খুঁজে বের করে আওয়ামী রাজত্ব প্রতিষ্টার জন্য তালিকা অনুশারে এগিয়ে যাওয়া হয়। সারা দেশের জেলা ও থানা পর্যায়ের ডিসি, এডিসি ও টিএনওদের দলীয় দৃষ্টিকোণ থেকে পোষ্টিং দিয়ে মাঠ পর্যায়ে প্রশাসনকে ঢেলে সাজানো হয়। এভাবে প্রশাসনকে তাঁর আমলে দলীয়করন করা হয় বলেও অভিযোগ আছে।

সিভিল প্রশাসনের মত পুলিশ প্রশাসনেও ব্যপক পরিবর্তন আনা হয়। বি এন পি আমলে পোস্টিং প্রাপ্ত অধিকাংশ পুলিশ সুপরকে প্রত্যাহরা করে কম গুরুত্বপূর্ণ ও ক্লারিকেল পদে বসানো হয়। ডিআইজি, এডিশনাল আইজি পদে ৭৩এর ব্যাচ খুঁজে খুঁজে পোষ্টিং দেয়া হয়।

  হাসিনা সরকারের আমলে সর্বাধিক চুক্তি ভিত্তিক নিয়োগ দেয়া হয়।  চুক্তি ভিত্তিক নিয়োগকে কেন্দ্র করে প্রশাসনে ব্যাপক ক্ষোভ দেখা দেয়। পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের অধিনস্ত বিদেশে বাংলাদেশ দূতাবাস সমূহের ৪৮টি মিশন প্রদানের মধ্যে ১৭টিই ছিল চুক্তি ভিত্তিক। এছাড়া অনেক আওয়ামীলীগ নেতাকেও চুক্তি ভিত্তিক রাষ্টদূত বা হাইকমিশনার পদে নিয়োগ দেয়া হয়। (সূত্র,দৈনিক দিনকাল,১৭ই আগষ্ট, ১৯৯৯)

একটি প্রগতিশীল, জবাবদীহি মূলক সংবেদনশীল সুউচ্ছ মানদন্ডের  প্রশাসনিক ব্যবস্থা সকল দেশের জন্য আশির্বাদ হিসাব গন্য হয়ে থাকে। কিন্তু আওয়ামীলীগ সরকারের আমলে এরূপ প্রশাসনিক কোন ব্যবস্থা দেশে ছিল না বলে অভিযোগ উঠে। 

আরো অভিযোগ উঠে যে আওয়ামী সরকারের তিন বছরের মাথায় সচিবালয়কে মেধাশূন্য করার পাঁয়তারা চলে। সচিবালয়ের ৯৭১টি পদের ৮১৫টি পদ অর্থাৎ ৮৪% পদ বিশেষ ক্যাডারের হাতে চলে যায়। উপ সচিবের ৭০ -৭৫টি পদ রিজার্ভ করে রাখা হয় এ ক্যাডারদের জন্য। (সূত্র, দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকা, ২রা ডিসেম্বর) 

 

 

সমালোচনাকারীরা অভিযোগ করেন এভাবে আওয়ামী প্রশাসনের রন্দ্রে রন্দ্রে দূর্নীতি ছড়িয়ে পড়ে। দূর্নীতির গ্রাস থেকে রক্ষা পাবার কোন উপায় ছিল না। একেবারে নিম্ন স্তর থেকে উচ্ছস্তর কোনখানে সহজ এবং স্বাভাবিকভাবে কোন কিছু করার উপায় ছিল না। সাধারন মানুষ দূর্নীতিগ্রস্ত প্রশাসনের নিকট জিম্মি ছিল। তথ্য মাধ্যমের উপরও ছিল সরকরের একাধিপত্য, তাছাড়া বিরুধী দলের উপর নির্যাতনও চলে সমান তালে। এসব কিছু পর্যবেক্ষন করে ২০০০ সালে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যশনাল বাংলাদেশকে বিশ্বের এক নম্বর দূর্নীতিগ্রস্ত দেশের তকমায় ভূষিত করে। (সূত্র,দৈনিক যুগান্তর, ৪ঠা ফেব্রুয়ারী,২০০০, জুন ২০০১,) (সহায়ক সূত্র-প্রশাসনের সর্বস্তরে দূর্নীতি, জিবলু রহমান face book,post)

আওয়ামীলীগের বিরুদ্ধে আর একটি চরম অভিযোগ হচ্ছে ১৯৯৬ সালের শেয়ার বাজার কেলেঙ্কারী। শেখ হাসিনা প্রথমবারের মত ক্ষমতায় আসার পর শেয়ার বাজারে নামে ধস। ফলে ঘটে মহা বিপর্যয়। সে কারনে  অনেক ছোট খাট বিনিয়োগকারী পুঁজি হারিয়ে পথে বসে। দূর্নীতির মাধ্যমে এ ধস নামিয়ে হাজার হাজার কৌটি টাকা লুট পাট করা হয়েছে বিশ্লেষকরা মনে করেন। 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

২৬ তম পর্ব ২০০৬ সালে বি এন পি'র তত্ত্বাবধায়ক সরকার নাটক:

 . ২০০৬ সালে বি এন পি'র তত্ত্বাবধায়ক সরকার নাটক:-২০০৬ সলের জোট সরকার মেয়াদ শেষ হলে ক্ষমতা ছাড়ার সময় অাবার দেখা দেয় দুই প্রধান দল তথা জোট...